কিন্তু সুখের দিনগুলো বেশি দিন স্থায়ী হলো না। বিয়ের পর যখন মাস পেরোতে লাগল, আর ত্রিপর্ণার কোলে সন্তান এলো না, তখন থেকেই ঐশিকের মা অবন্তীর মুখের হাসি উধাও হতে লাগল।
— “এমন অলুক্ষুণে বউ ঘরে আনলাম রে বাবা! বংশের বাতি জ্বলবে কবে?”
প্রথম দিকে ঐশিক মাকে বোঝাতো,
— “মা, সবই তো সময়ের ব্যাপার। এত প্রেসার দিও না তো ওকে।”
ত্রিপর্ণা স্বামীর সেই পাশে দাঁড়ানো দেখে ভরসা পেত। মনে হতো, যতক্ষণ ঐশিক আছে, ততক্ষণ সব ঠিক আছে।
কিন্তু সময় যত গড়াল, প্রতি মাসে ত্রিপর্ণার রক্তস্রাবের খবর যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে যেত সংসারে। অবন্তী মুখ টিপে হাসতেন,
— “হায় হায়! আবার! কী সর্বনাশ!”
ঐশিকও ধীরে ধীরে বিরক্ত হয়ে উঠল। একদিন রাতে বিরক্তির সুরে বলেই ফেলল ঐশিক,
— “এভাবে ক’দিন চলবে ত্রিপর্ণা? আমার ফ্রেন্ড কলিগরা তো দুই তিনটে বাচ্চা নিয়ে সংসার করছে।”
ত্রিপর্ণার বুকের ভেতরটা তখন হুহু করে উঠেছিল। চোখে জল এলেও সে কিছু বলেনি।
অবশেষে বহু ডাক্তার দেখানো, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল, ত্রিপর্ণার শরীর স্বাভাবিকভাবে সন্তান ধারণে অক্ষম। ডাক্তার স্পষ্ট জানালেন— “আই ভি এফ ছাড়া আর উপায় নেই।”
ঐশিকের অনেক টাকা খরচ হলো। কাগজপত্র, ডাক্তার, ওষুধ—সব কিছু মিলিয়ে সংসারে যেন এক ঝড় বয়ে গেল। অবন্তী প্রায়ই ত্রিপর্ণাকে খোঁচা দিয়ে বলতেন,
— “ঘরে অলক্ষ্মীকে বউ করে আনলে এমন ভাবেই মা লক্ষ্মী বিদেয় নেন।”
অবশেষে আশ্চর্যজনকভাবে একদিন সুখবর এল। ত্রিপর্ণা গর্ভবতী। কিন্তু গর্ভধারণের পরও তাকে এতটুকু ভালোবাসা বা যত্ন কেউ দিল না। যেন ঐশিক বা তার বাড়ির লোকের সব দায়িত্ব শেষ—শুধু সন্তান জন্মালেই হলো।
অন্যদিকে বাপেরবাড়ির অবস্থাও আলাদা ছিল না। ত্রিপর্ণার বাবা-মা বহু আগেই চলে গেছেন। দাদা সুজিত ও বৌদি সুমেধা নিজেদের সংসারে ব্যস্ত।
— “শুনে খারাপ লাগল বোন, কিন্তু এতবার তো ডাক্তার আর ওষুধের খরচের টাকা পাঠালাম তোর শ্বশুরবাড়িতে। আর কতটা পারব বল? আমাদের ছেলেটা বড় হচ্ছে, ওরও তো খরচাপাতি আছে বল!”
সুজিতের সোজাসাপ্টা কথায় ত্রিপর্ণা নীরব হয়ে গিয়েছিল।
একা হাতে রিস্ক প্রেগন্যান্সি নিয়ে যুদ্ধ করছিল সে। ডাক্তারের কণ্ঠস্বর কানে বাজত বারবার—
— “আপনার শরীরে সমস্যা আছে। সাবধানে না চললে ঝুঁকি হতে পারে।”
কিন্তু ত্রিপর্ণা অভিমানেই কাউকে এই কথা জানায়নি। মনে হয়েছিল, যাদের কাছে তার অস্তিত্বের চেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাদের কাছে নিজের দুঃখ জানিয়ে কী হবে?
দিন গড়িয়ে চলে এলো প্রসবের তারিখ। ব্যথায় কাতর ত্রিপর্ণা হাসপাতালের বেডে শুয়ে ভেবেছিল— “হয়তো এইবার তারা আমাকে মানুষ হিসেবে দেখবে, শুধু সন্তান জন্মদাত্রী হিসেবে নয়।”
ডেলিভারির সময়, অপারেশন থিয়েটার থেকে কান্নার শব্দ ভেসে এলো। একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান পৃথিবীর আলো দেখল।
ঐশিকের মুখে তখন খুশির ঢেউ। অবন্তীও কন্যাশিশুকে বুকে তুলে নিলেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে।
— “দেখো বিনয়! দেখ ঐশিক। আমাদের ঘরে স্বয়ং মা লক্ষ্মী এলেন যে!”
সকলেই শিশুকন্যাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ফুল, হাসি, উল্লাস—সবই ভরে গেল চারিদিকে। কিন্তু ত্রিপর্ণার খোঁজ নেওয়ার সময় কেউ পেল না।
অনেকক্ষণ পর ঐশিকের হঠাৎ মনে পড়ল।
— “ত্রিপর্ণা কেমন আছে?”
ডাক্তারের মুখে তখন নীরবতা। তারপর ধীরে ধীরে ভাঙা গলায় বললেন,
— “সরি, মাকে আর বাঁচানো যায়নি। প্রসবের ঝুঁকি ছিল শুরু থেকেই। আমরা সব রকম চেষ্টা করেছি।”
ঐশিকের মাথার ভেতর ঝনঝন করে উঠল। তার চোখের সামনে ঝলসে উঠল ত্রিপর্ণার সেই চুপচাপ অভিমানী মুখ। যে এই রিস্কের কথা একদিনও বলেনি, শুধু সহ্য করে গিয়েছিল।
বাইরে কাঁদছে নবজাতক কন্যা। ঐশিক ছুটে গিয়ে তাকে বুকে তুলে নিল। বুক ভরে এল অনুতাপে। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু।
— “ক্ষমা করো ত্রিপর্ণা… তুমি থাকতে ভালোবাসতে পারিনি তোমায়। আজ মেয়ের মুখে তোমার ছায়া দেখছি। ও-ই তোমার উত্তরাধিকার।”
অবন্তী তখনো কন্যাকে নিয়ে মাতোয়ারা। কিন্তু ঐশিক জানত, এই ছোট্ট শিশুকন্যার ভেতরেই বেঁচে আছে তার প্রিয় ত্রিপর্ণা—তার সমস্ত অভিমান, সমস্ত ভালোবাসা।
ত্রিপর্ণা নেই, কিন্তু তার শেষ নিঃশ্বাসে জন্ম নেওয়া কন্যা ঐশিকের জীবনের নতুন সূচনা হয়ে উঠল।
(সমাপ্ত)
0 মন্তব্যসমূহ