সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
বিউটিপার্লার থেকে সেজেগুজে ফিরছি আমি,
এক বান্ধবীর বিয়েতে যাব কিনা,
তাই তো পুরোনো আমিটাকে ঝেড়ে ফেলে ঝাঁ চকচকে করে তুলেছি নিজেকে,
আয়নায় দেখেই চমকে উঠেছিলাম,
ওমা! এ যে নতুন আমি!
ফেসিয়াল, স্পা এর মোড়কে নিজেকে যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম আজ!
গায়ের রঙ আমার বরাবরই তামাটে,
সেজন্য চেনা অচেনা প্রায় সকলেই কথায় কথায় খোঁচা মারতে ভোলে না,
আজ তাদের সবাইকে তাক লাগিয়ে দেব আমি।
মেক আপের এমন যাদু!
রাস্তায় নিজের মনেই হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম বিয়েবাড়ি।
কিন্তু এ কি! আমায় দেখে সকলের চোখেমুখে এমন আতঙ্কের ছাপ কেন?
মেক আপটা কি বড্ড বেশি চড়া হয়ে গেছে?
যদি তাই হত, তাহলে লোকে বড়জোর দুটো ইয়ার্কি মারত আমায় নিয়ে!
কিন্তু তা তো করছে না কেউ! সবাই যে ভয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিয়েছে রীতিমতো!
এতটাই কি ভয়ানক দেখাচ্ছে আমায় মেক আপে?
ওই তো! অদূরে কনের সাজে দাঁড়িয়ে আছে আমার ছোট্টবেলার বান্ধবী।
কি অপূর্ব লাগছে ওকে দেখতে!
যাই, মন্ডপে বসার আগে একটু মনোবল যুগিয়ে আসি।
কিন্তু এ কি! ও ও তো আর পাঁচজনের মতো আমাকে দেখে সরে গেল,
এমনকি আমার মা বাবাও আমাকে দেখে কেমন যেন ঘামতে শুরু করল!
বিয়ের মন্ডপ মুহূর্তের মধ্যে শূন্য হয়ে গেল,
সবটাই কি আমার মেক আপের দোষ?
কিন্তু মেক আপের জন্য কখনও এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, শুনিনি তো!
হঠাৎ করেই মাথার যন্ত্রণাটা কেমন যেন বেড়ে গেল,
রগদুটো চেপে বসে পড়তেই কি একটা চটচটে তরল হাতে লেগে গেল,
চমকে হাতদুটো চোখের সামনে ধরতেই চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
এ যে রক্ত!
তাড়াতাড়ি বিয়েবাড়ির ভেতরে থাকা একটা আয়নার সামনে ছুটে গেলাম আমি,
কিন্তু আয়নাতে ফুটে উঠল না আমার অবয়ব।
আর সহ্য করতে পারলাম না আমি। জ্ঞান হারালাম এক মুহূর্তে।
জ্ঞান ফিরে দেখি, নিজের বাড়ির ছাদে শুয়ে আছি আমি।
আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলাম আমি।
গোটা বাড়ি জুড়ে কেমন যেন মনখারাপি বাতাস বইছে। থেকে থেকে উঠছে গুমরে কান্নার শব্দ।
আস্তে আস্তে নেমে একতলার ডাইনিংয়ে এসে দাঁড়ালাম আমি।
রজনীগন্ধা আর ধূপের গন্ধে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার, কানে আসছে সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ।
কৌতূহলী আমি আরও কিছুটা এগোতেই থমকে দাঁড়ালাম।
আমার ছবিতে মালা পরিয়ে চলছে শ্রাদ্ধের কাজকর্ম।
মা আর বাবা রোবটের মতো পালন করে চলেছে যাবতীয় নিয়ম।
শুনলাম, কয়েকজন পাড়া প্রতিবেশী ঘনঘন নাক টানছে,
আর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে,
'দেখতে ভালো না হোক, মেয়েটার মনটা বড় ভালো ছিল গো!
সেদিন পার্লার থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় একটা লরি এসে এমন ধাক্কা মারলে যে সব শেষ!'
অদূরেই মেঝেতে পড়ে আছে একটা দৈনিক সংবাদপত্র।
প্রথম পাতাটা দেখে নিজেকে চিনতে খানিকটা বেগ পেতে হল বই কি!
অজান্তেই চোখে জল এল।
মৃত মানুষের চোখেও কি জল আসে? কি জানি!
জানার অবকাশও আর নেই।
পুরোহিতের উচ্চারিত প্রত্যেকটা মন্ত্র আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে,
আর উদ্বায়ী তরলের মতোই আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছি আমি।
রওনা হচ্ছি অনেক, অনেক দূরের কোনো নাম না জানা দেশের পথে।
চলেছি, চলেইছি, চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে কখন যে চোখদুটো বুজে গেছে, খেয়ালই করিনি৷
হাজার চেষ্টা করেও আর খুলতে পারলাম না চোখ।
মুদিত চক্ষেই অনুভব করলাম, শরীরটা ক্ষুদ্র হয়ে গেছে বড্ড।
আমাকে ঘিরে রয়েছে জলের আস্তরণ।
তবু এই অতি ক্ষুদ্র দেহেও রয়েছে প্রাণ।
0 মন্তব্যসমূহ