Advertisement

আধার

আধার
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


 অনুপমা যেদিন প্রথম জেনেছিল, ওর শরীরে বড় হচ্ছে নতুন প্রাণ, সবার আগে রবিকে জানিয়েছিল। রবি আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল সেদিন, খুশির খবরটা কিভাবে সেলিব্রেট করবে ভেবেই পাচ্ছিল না ও। ওর শিশুসুলভ আচরণ দেখে ঠোঁটের কোণে হাসি এনে অনুপমা বলেছিল, 'এক কাজ করো। আমাকে একটা বেবি ডল এনে দাও। খোকা খুকু যে ই হোক, সে যতদিন আমার কোলে না আসছে, ততদিন পুতুলটাকেই না হয় সন্তানস্নেহে আদর করি। সময়টাও কেটে যাবে।' 
আপত্তি করেনি রবিও৷ এক ছুটে সামনের বড় দোকানটা থেকে সদ্যোজাত শিশুর সাইজেরই একটা সুন্দর পুতুল কিনে আনল ও। 
— 'এ যে একেবারে সত্যিকারের বাচ্চার মতো!' ভীষণ খুশিতে ডগমগ হয়ে পুতুলটাকে কোলে তুলে নিল অনুপমা। 

এরপর অনাগত শিশুর জন্য একে একে বাড়িতে আসতে লাগল দোলনা, ছোট্ট বালিশ, বিছানা। সেসবের সম্পূর্ণ অধিকার এখন পুতুলটারই। বেশ খুশিতে আছে গর্ভবতী অনুপমা। ওর খুশিতে খুশি রবিও। 

কিন্তু মানুষের জীবন কি আর সব সময় মসৃণভাবে চলে? কখনোই না। অনুপমা আর রবির জীবনেও নেমে এল চরম বিপর্যয়। 
তখন নয় মাস চলছে অনুপমার। রুটিন চেক আপ করিয়ে ট্যাক্সিতে ফিরছিল দুজন। হঠাৎ উলটো দিক থেকে ক্ষিপ্র গতিতে ধেয়ে আসা লরি জোরে ধাক্কা মারল ট্যাক্সিটাকে। ড্রাইভার স্পট ডেড হল। গুরুতর আহত অবস্থায় হসপিটালে ভর্তি করা হল অনুপমা আর রবিকে। 

কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসার পর দুজনেই সুস্থ হয়ে উঠল ঠিকই, কিন্তু হাজার চেষ্টাতেও বাঁচানো গেল না অনাগত শিশুকে। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই শেষ হয়ে গেল ছোট্ট প্রাণ। 
শুধু তাই নয়, এই অ্যাক্সিডেন্টে সারাজীবনের মতো গর্ভধারণ ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে অনুপমা। 

 ট্রমাটা কাটিয়ে উঠতে বহুদিন লেগেছিল অনুপমার। ভুলেই গিয়েছিল ঘরের এককোণে পড়ে থাকা পুতুলটার কথা। বহুদিনের অযত্নে তার সুন্দর অঙ্গে ততদিনে জমে গেছে ধুলো। 

সেদিন শুতে যাওয়ার আগে হঠাৎ কি যেন মনে হওয়ায় অনুপমা শাড়ির আঁচলে পুতুলটার গায়ের ধুলো মুছে দিল। 
হঠাৎ মাঝরাতে শিশুর কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল অনুপমার। চমকে উঠে বসল ও। না, আর তো কান্নার শব্দটা পাচ্ছে না ও। হঠাৎ ওর চোখ গেল ছোট্ট বিছানায় শোয়ানো পুতুলটার দিকে। কেমন যেন শিহরণ খেলে গেল সারা শরীর বেয়ে। ক্ষণিকের জন্য মনে হল, পুতুলটা যেন নড়ে উঠল। ভুল দেখেছে ভেবে আবার তাকিয়ে দেখে, সত্যিই নড়াচড়া করছে পুতুলটা, ঠিক কোনো মানবশিশুর মতো। দুপুর রাতে এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আর সহ্য করতে পারল না ও। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। 
ঘোরের মধ্যে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল ও। শুনতে পেল, আকাশ থেকে যেন ভেসে আসছে দৈববাণী। 
— 'মৃত্যুতে শরীর শেষ হয় রে, আত্মা নয়। সে যে অবিনশ্বর। তার প্রয়োজন শুধু একটা আধারের। সেই আধারকে যে খুঁজে নিতে হবে তোকেই।' 

 সেদিনের পর পুতুলটাকে সস্নেহে বুকে তুলে নিয়েছিল অনুপমা। মাঝেমধ্যেই সে চোখ পিটপিট করে, হাত পা নাড়ে, আর খিলখিলিয়ে হাসে। সবটা জানে রবিও। শুধু ওদের বাড়ির কাজের মেয়েটা বোঝে না, একটা পুতুলকে কোলে নিয়ে এমন হাসে কেন অনুপমা! মুখ বেঁকিয়ে বিড়বিড় করে, 'পাগলের পাগলামি!' 

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ