Advertisement

প্রার্থনা

প্রার্থনা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


অরূপ আর নীলিমার মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই অর্থে ভালোবাসা, যত্ন, একে অপরের ইচ্ছেকে সম্মান করা এসব একদমই তাদের মাঝে ছিল না। তবু ওই যে, মা বাবা পছন্দ করে বিয়ে দিয়েছে, বহুদিন থাকতে থাকতে একটা অভ্যেস হয়ে গেছে একসাথে থাকার, তাই মনের টান তেমন না থাকলেও রয়ে গেছে এক ছাদের তলায়। 

ওদের প্রথম সন্তান ভূমিষ্ট হয়েই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সেই সন্তান ছিল পুত্রসন্তান। এরপর নীলিমার কোলে আসে এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। ওকে পরম আদরে বুকে জড়িয়ে ধরে নীলিমা। কন্যাশিশুর নাম রাখা হয় সুকন্যা। 

প্রথম প্রথম কয়েকদিন সুকন্যার প্রতি স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা অক্ষত ছিল, কারণ সুকন্যার জন্ম প্রথম সন্তান হারানোর কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছিল ওদের । 

কিন্তু যতই সময় গড়াতে থাকে, সমাজের পাঁচটা মানুষ খোঁটা দিতে থাকে 'ছেলে পাওয়া সবার ভাগ্যে থাকে না' বলে, ততই দিন দিন সুকন্যার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে দুজন। চেষ্টা করতে থাকে দ্বিতীয় সন্তান লাভের। কিন্তু নীলিমার কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে তা অসম্ভব জানিয়ে দেন শহরের সেরা গাইনোকোলজিস্টরা। 

 ফলত স্নেহের ভাগ কমতে থাকে, রাগের পারদ ক্রমশ বাড়তে থাকে দুজনের সুকন্যার প্রতি। ওকে স্নান করাতে করাতে, খাওয়াতে খাওয়াতে মনে মনে বিড়বিড় করত নীলিমা, 'কেন যে ছেলে হলি না!' 

 যতই বড় হতে লাগল সুকন্যা, ততই তার ওপর চাপ ক্রমশ বাড়তে লাগল। ওকে জীবনে সকলের থেকে এগিয়ে থাকতে হবে। ক্লাসে হতে হবে ফার্স্ট, আবৃত্তিতে, আঁকায়, নাচে, গানে হতে হবে ভীষণ পারদর্শী। যারা অরূপ আর নীলিমার ভাগ্যকে দুষেছিল ওদের পুত্রসন্তান নেই বলে, তাদের সকলের মুখে ঝামা যে সুকন্যাকেই ঘষে দিতে হবে! দিতেই হবে! 
যে বয়সে পাঁচজন বাচ্চা খেলাধুলা করতে ব্যস্ত, সেই বয়সে সুকন্যাকে হিড়হিড় করে নীলিমা টেনে নিয়ে যেত পড়ার টেবিলে। সুকন্যা আপত্তি করলেই জুটত বেদম মার। কেঁদে উঠলে মারের পরিমাণ আরও বাড়ত। অরূপ মেয়ের গায়ে হাত তুলত না ঠিকই, খুব বেশি বকাবকিও করত না, তবে যা করত তা বকাবকি মারধোরের চেয়েও ভয়ঙ্কর। শিশুকন্যার সাথে মাইন্ড গেম খেলত ও।
— 'তুই আমার মেয়ে হয়ে ম্যাথসে হান্ড্রেড পেলি না? নাইন্টি ফাইভটা কোনো মার্কস?' 
— 'তুই ঠিকমতো মানুষ না হলে আমার আর বেঁচে থেকে কি লাভ বল্‌ দেখি!' 
— 'এটা কি এঁকেছিস! হোঃ! আমি তোর বয়সে এর চেয়ে দ্বিগুণ ভালো আঁকতাম। তাও তো তুই আঁকা শিখিস। আমি আঁকা শেখা দূর, ড্রয়িংখাতা পর্যন্ত পাইনি। এত রঙের বাক্সও পাইনি। শুধু চক দিয়ে দেওয়ালে আঁকতাম, তাতেই লোকজন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখত!' 

যদি কখনও সুকন্যা ক্লাসে ফার্স্টও হত, তবু অ্যাপ্রিশিয়েট করেনি কখনও ওর মা বাবা। শুধু একটাই কথা বলেছে, 'পাস্ট ইজ পাস্ট। তা নিয়ে বেশি মাতামাতি করলে খুব তাড়াতাড়ি মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই যা হয়ে গেছে তা ভুলে গিয়ে সামনের পরীক্ষার জন্য পড়াশুনা করো।' 
হাসে সুকন্যা। ও জানে যদি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট না করত, তাহলে কেউ বলত না 'পাস্ট ইস পাস্ট।' তখন উঠতে বসতে ক্লাসের ভালো স্টুডেন্টদের সাথে তুলনা করা হত ওর। 
তবুও পরবর্তী পরীক্ষায় ভালো ফল করলে মা বাবার কাছে অ্যাপ্রিশিয়েশন পাবে এই আশাটুকু বুকে বাঁচিয়ে রেখে পড়তে বসত ও। 

মাধ্যমিকে দুর্দান্ত রেজাল্ট করল সুকন্যা। জেলার মধ্যে ফার্স্ট হল ও। অ্যাপ্রিশিয়েশন পেল সুকন্যা, কিন্তু তা শুধু পাঁচজনের সামনে। তবুও সম্পূর্ণ ক্রেডিট ওরা কখনই সুকন্যাকে দেয়নি, ওরা নিজেরাও সুকন্যার কিভাবে পাশে থেকেছে তা রসিয়ে রসিয়ে বলেছে সবাইকে। 

 মাধ্যমিকের রেজাল্টের পর অনেকের কাছে সুকন্যার ভূয়সী প্রশংসা শুনে ওর প্রতি মন গলল ঠিকই অরূপ আর নীলিমার, তবে তা সাময়িক। সুকন্যা যেই আর্টস নেওয়ার আর্জি জানাল, রাগে চোখমুখ লাল হয়ে গেল দুজনের। 
— 'সায়েন্সে এত ভালো রেজাল্ট করেও আর্টস? মধুদার ছেলে তোর চেয়ে দেড়শো নাম্বার কম পেয়েও সায়েন্স পড়বে, আর তুই এত ভালো মার্কস পেয়ে আর্টস নিবি? ছি ছি, লোককে মুখ দেখাব কি করে আমরা? এর চেয়ে মাধ্যমিকে ফেল করলেই তো ভালো করতিস! আর্টস নেওয়ার জাস্টিফিকেশানটা ঠিকমতো দেওয়া যেত সবাইকে!' 
বাধ্য হয়েই সায়েন্স পড়তে হল সুকন্যাকে। এবারেও দুর্দান্ত রেজাল্ট। অরূপ আর নীলিমার গর্বে বুক ফুলে উঠল, ওদের নেওয়া সিদ্ধান্ত কতটা ঠিক তা ভেবে। 

 শহরের নামী কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেল সুকন্যা। পড়াশুনার চাপে হারিয়ে গেল ওর প্রথম ভালোবাসা, ড্রয়িং। এইজন্যই তো আর্টস নিতে চেয়েছিল ও। স্কুল শেষ করে একটা ভালো আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছে ছিল ওর। মৃত স্বপ্নের ওপর দাঁড়িয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করল ও, এবারেও দুর্দান্ত নম্বর। তবু আজও মা বাবার কাছে সামান্যতম অ্যাপ্রিশিয়েশন পেল না ও। পাবেই বা কি করে? তারা তো তখন নিজেদের পিঠ চাপড়াতে ব্যস্ত। তাদের সিদ্ধান্ত কতটা ঠিক সেকথা ভেবে। 

এরপর সুকন্যা গেল এম.টেক করতে অন্য এক ইউনিভার্সিটিতে। সেখানেই আলাপ হল একটি ছেলের সাথে। ছেলেটি সুকন্যাদের ব্যাচের ফার্স্ট স্টুডেন্ট। ছেলেটির ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিমত্তা, কথাবার্তা প্রথমদিনই মন জিতে নিয়েছিল সুকন্যার। ছেলেটির মনেও লেখা ছিল সুকন্যার নাম। তাই প্রেমের সম্পর্কে বাধা পড়তে দেরি হল না বিশেষ। 

 নীলিমা কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিল ব্যাপারটা। কিন্তু মেয়ে আজ বড় হয়েছে, ছেলেবেলার মতো মারধোর করে তো আর পেটের কথা বের করা সম্ভব নয়! বকাঝকা করলেও তার একটা সীমা রাখতে হবে! তাই মেয়ের ওপর ঈগলের দৃষ্টি রাখতে শুরু করল ও। নানা অছিলায় মেয়ের কাছাকাছি থাকা শুরু করল ও। সুকন্যাও আর শিশু নেই, মায়ের মনের ভাব বুঝে নিতে এক মুহূর্তও দেরি হল না। এমনিতেই মা বাবার প্রতি ঘৃণার স্তূপ জমে গেছে মনে, এখন নীলিমার এই ব্যবহার সেই ঘৃণার আগুনে ঘি বর্ষণ করল। 
চেঁচিয়ে উঠল সুকন্যা। এই প্রথম মেয়ের এমন ব্যবহারে হতভম্ব হয়ে গেল দুজন। সম্বিৎ ফিরতেই শুরু হল ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল। কিন্তু আজ আর সুকন্যা সেসবে ভুলবার মতো ছোট নেই। ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে চলে গেল ও। 

 কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। সুকন্যা, আর সেই ছেলেটি আজ বড় কোম্পানিতে চাকরি করে। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে ওরা। 

আজ সুকন্যা তার স্বামীর সাথে গেছে কালীমন্দিরে পুজো দিতে। সুকন্যা এখন পাঁচ মাসের গর্ভবতী। এই মন্দিরে প্রায়ই আসে সুকন্যা। বৃদ্ধ পুরোহিত মশাই ওকে মেয়ের মতোই স্নেহ করেন। 
পুজো শেষে যখন সুকন্যা বেরোবো বেরোবো করছে, পুরোহিত মশাই হাসিমুখে প্রশ্ন করলেন, 'কি চাইলি মায়ের কাছে?' 
— 'একটা তো নয়, অনেককিছু চাইলাম। কোন্‌ টা আগে বলব তুমিই বলো।' 
— 'আগে বল্‌ ছেলে চাইলি না মেয়ে?'
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুকন্যা বলল, 'সুস্থ সন্তান। যে ই আসবে আমার কোলে, তাকে বড় যত্নে মানুষ করব কাকা। ঈশ্বরের দানকে কখনও পায়ে ঠেলতে নেই গো।' 
— 'আহা, কি সুন্দর বললি। তা আর কি কি চাইলি?'
— 'এই যে, আমার পাশে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, ইনি তো নিজের জন্য কিছু ভাবেনই না। যেদিন থেকে আমার সাথে সম্পর্কে এসেছে, সবসময় শুধু ভেবে গেছে কিভাবে আমাকে ভালো রাখবে। এই মানুষটার শরীরের সুস্থতা আর মনের আনন্দ সারাজীবন অটুট থাকুক, এটুকুই চেয়েছি।' 
— 'আর মা বাবার জন্য? তাদের জন্য কিছু চাসনি রে মা?' 
সুকন্যার দীর্ঘশ্বাস বদলে গেল বাঁকা হাসিতে। 
— 'কি যে বলো কাকা, ওদের জন্য প্রার্থনা করব না? ওদের কাছে কি ঋণের শেষ আছে আমার?' 
মনে মনে বলল সুকন্যা, 'ছেলেবেলায় হারানো সেল্ফ রেসপেক্ট, সেল্ফ এস্টিম ফিরে পাওয়ার জন্য আজও স্ট্রাগল করে চলেছি আমি। আমার পিপল প্লিজিং নেচারের জন্য লোকে কত সহজে আমাকে ইউজ করে, ম্যানিপুলেট করে। অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার থেকে আজও সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পারিনি আমি! ডিয়ার মা বাবা, কত ঋণ যে আছে আমার তোমাদের কাছে, তা কি গুণে শেষ করা যাবে?' 
— 'কি হল? কি ভাবছিস? বললি না তো মা বাবার জন্য কি চাইলি?'
— 'দীর্ঘায়ু।' 
— 'আমার লক্ষ্মী মেয়ে।'
— 'পুরোটা তো আগে শোনো কাকা। আমি চাই আমার প্রিয় মা বাবা এত লম্বা আয়ু পাক, যাতে আমার মৃত্যু তারা দেখে যেতে পারে। দেখে যেতে পারে আমার শরীরটা কিভাবে আগুনে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। সেদিন বড্ড আনন্দ পাব আমি, বড্ড!' 
— 'কি বলছিস মা?'
— 'না না কাকা, আমি আমার স্বল্পায়ু চাই না। আমি কেন চাইব আমার মনের মানুষ তার স্ত্রীকে তাড়াতাড়ি হারাক? আমার সন্তানই বা কম বয়সে কেন মা হারা হবে? এ যে তাদের প্রতি অবিচার হবে! শুধু আমার মা বাবার আয়ুটা লম্বা হোক। ভীষণ লম্বা। যতটা লম্বা হলে তারা দ্বিতীয়বার সন্তান হারানোর কষ্টটা উপলব্ধি করতে পারে।'

(সমাপ্ত)





 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ