Advertisement

অসমাপ্ত প্রেম

অসমাপ্ত প্রেম


— 'কি হয়েছে তোর বল তো? সারাদিন ধরে এতবার ফোন করলাম, ফোন তুলছিলি না কেন?'
— 'দেখ অর্চিকা, আমার একটা পরিবার আছে যারা আমার ওপর নির্ভরশীল। তোর মতো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাইনি যে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বিন্দাস ঘুরে বেড়াব!'
— 'আরে অভি, তোর হয়েছেটা কি ইয়ার! নেশা টেশা করছিস নাকি আজকাল! কি যা তা বকছিস!'
— 'দেখ অর্চিকা, তুই রাজবাড়ির একমাত্র রাজকন্যার মতো বড়ো হয়েছিস, তাই তোর কাছে আমার কথাগুলো যা তা হতেই পারে, কিন্তু আমার কাছে এগুলো বাস্তব। তুই যদি পড়াশুনা না করে ঘুরে বেড়াস, চাকরি বাকরি না পাস, কোনো রাজপুত্রকে পেয়ে যাবি বিয়ের জন্য, কারণ তোর রূপ সম্পত্তি সব আছে। কিন্তু আমি যদি চাকরি না পাই তাহলে আমার মধ্যবিত্ত পরিবারটাকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াব বলতে পারিস?'
— 'যাস্ট শাট আপ অভি! তুই কিন্তু ইচ্ছাকৃত অপমান করছিস আমায়, যেটা আমি ডিসার্ভ করিনা!'
— 'বেশ তো, সেটা যখন বুঝেই গেছিস তো ফোন করিস কেন আমায়? করিস না, সম্পর্ক রাখিস না আমার সাথে!'
— 'তুই সাইক্রিয়াট্রিস্টের কাছে যা বুঝলি তো! তুই যে কথাগুলো বললি এতক্ষণ, কোনো মানসিকভাবে সুস্থ মানুষ বলতে পারে না, যাস্ট পারে না!'
— 'হুম, এখন আমায় মানসিক ভারসাম্যহীন, পাগল, আরও অনেক কিছুই মনে হবে, আমি জানি! যাই হোক, সামনেই আমার চাকরির পরীক্ষা, অনেক পড়াশোনা করতে হবে। বেকার ডিস্টার্ব করিস না ফোন করে! রাখছি এখন!' 
— 'হ্যালো, হ্যালো অভি!' 

কিন্তু অভিমন্যু ততক্ষণে ফোনটা কেটে দিয়েছে।অভিমন্যুর সাথে অর্চিকার সম্পর্ক আজকের নয়। সেই ক্লাস ইলেভেন থেকে ওদের সম্পর্কের শুরু। অর্চিকা কলকাতার অন্যতম নামী বস্ত্র ব্যবসায়ী রঞ্জিত ভৌমিকের একমাত্র মেয়ে। অন্যদিকে অভিমন্যু তার মা কে হারিয়েছে অনেক ছোটবেলায়, বাবা আর বোনকে নিয়েই সংসার তার। এতদিন তার বাবা অশোক রায় একটি বেসরকারি অফিসে কর্মরত ছিলেন, কিন্তু হঠাৎই অফিসে কর্মী ছাঁটাই শুরু হল, এর ফলে কোম্পানিতে কর্মরত বহু মানুষ জীবিকা হারালেন, অশোকও। অনেকটা বেশি বয়সে চাকরি হারানোর ফলে নতুন করে কোথাও চাকরিও জোগাড় করতে পারলেন না তিনি। অভিমন্যু তখন ইউনিভার্সিটিতে লাস্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট। ইউনিভার্সিটি পাস করেই টিউশন খুঁজতে লাগল সে। সে আর অশোকবাবু দুজনেই টিউশন করে সংসারের খরচ চালান, সেই সাথে অভিমন্যুর বোন অনিমার পড়াশুনার খরচ জোগাতে হয়। মেয়েটা সবে কলেজে উঠেছে, বইপত্র টিউশন কলেজের ফিজ সব মিলিয়ে তার পড়ার খরচের অঙ্কটা কিছু কম নয়। আর জীবনের ময়দানে এই কঠিন লড়াইয়ে অর্চিকা সবসময় পাশে থেকেছে অভিমন্যুর, সাহস যুগিয়েছে সবসময়। অর্চিকা অভিমন্যুর মতো পড়াশুনায় অতটা ভালো স্টুডেন্ট না হলেও নৃত্যশিল্পে সে যথেষ্ট পারদর্শী। যদিও অর্চিকার পরিবার সবসময় নাচের থেকে তার পড়াশুনাতেই মনোযোগ দিয়েছেন বেশি, তাঁরা চান, নাচে নয়, পড়াশুনাতেই সে মন দিক বেশি, কেরিয়ার বানাক লেখাপড়া দিয়েই। কিন্তু ছোট থেকেই অর্চিকার বড়ো নৃত্যশিল্পী হওয়ার ইচ্ছা। অভিমন্যু অর্চিকার এই স্বপ্নকে প্রাধান্য দিয়েছে অনেকখানি। কখনও কখনও এমনও হয়েছে, যে টিউশনের নাম করে অর্চিকা চলে গেছে কোনো ডান্স ইন্সটিটিউটে নাচ শেখার জন্য, অভিমন্যুই সেসব ইন্সটিটিউটের খোঁজ এনে দিত তার কাছে, ভর্তি করার ব্যবস্থা করত গোপনে। এইভাবেই দিব্যি কাটছিল অর্চিকা আর অভির দিনগুলো হেসেখেলে, আর খুনসুটিতে। মান অভিমানও ছিল, তবে সেসব তাৎক্ষণিক।
কিন্তু এই এক সপ্তাহ হল অভিমন্যু এক অদ্ভুত আচরণ করছে অর্চিকার সাথে। তার ফোন ধরছে না, মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছে না, আর যদিও বা ফোন ধরে, কেবলই নানা অছিলায় অপমান করছে। এ যেন এক অচেনা অভিমন্যু! যে অর্চিকার কাছে চির অপরিচিত।
শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে অর্চিকা একদিন সকালে অভিমন্যুর বাড়িতে এসে হাজির হয়। অভিমন্যু তখন বাড়িতে ছিল না, ছিলেন অশোকবাবু, আর অভিমন্যুর বোন অনিমা। অর্চিকাকে ও বাড়ির দুজনেই চেনেন খুব ভালোভাবে, অশোকবাবু অর্চিকাকে মা বলে ডাকেন, আর অনিমা ডাকে অর্চিদি বলে। অর্চিকা ও বাড়িতে যেতেই অনিমা এসে বলল, 'দাদা তো এখন বাড়ি নেই অর্চিদি, একটু বেরিয়েছে।'
— 'কোথায় গেছে? বাজারে?'
— ' না রে মা, বাজারে তো যায়নি, বলল কোন্ এক দরকারে বেরিয়েছে, কি দরকারে বেরিয়েছে সেটাও বলে গেল না!'
— 'কি বলছ আঙ্কেল!'
— 'হ্যাঁ রে মা, ছেলেটা আজকাল কেমন যেন পালটে যাচ্ছে, চিনতেই পারি না আজকাল। মাঝে মাঝেই কোথায় যেন বেরিয়ে যায়, বলেও যায় না!'
— 'হুম, ও যে বদলে গেছে অনেকটা সেটা আমিও বেশ বুঝতে পেরেছি গো আঙ্কেল, কিন্তু এই যে যখন তখন বেরিয়ে যায় কিছু না বলে এটা তো জানতাম না!'
— 'হ্যাঁ গো অর্চিদি, দাদার আচরণ আমার আজকাল একদম স্বাভাবিক লাগে না। আমার আগের দাদা আর এই দাদার মধ্যে যেন আকাশপাতাল তফাত!'
— 'হ্যাঁ রে অর্চি মা, অনু ঠিক কথা বলছে একদম।আমার সেই প্রাণোচ্ছল ছেলেটা কেমন যেন খিটখিটে রাশভারী হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। আমরা কতবার ওকে জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু আমাদের ও কিচ্ছুটি বলেনি', অশোকবাবু হতাশার সুরে বললেন, 'এখন তুই ই আমাদের ভরসা রে মা! ওর মনে কি চলছে সেটা হয়ত ও তোকেই বলবে!'
— 'তুমি এত টেনশন কোরো না তো আঙ্কেল, এই আমি গ্যাঁট হয়ে বসলাম এখানে, অভি না আসা পর্যন্ত আমি উঠবই না।'
হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ হল। অশোকবাবু গিয়ে দরজাটা খুললেন। অভিমন্যু এসেছে।
— 'বাবু এসেছিস? দেখ কে এসেছে!'
— 'কে এল আবার সকাল সকাল? আবার পুজোর জন্য চাঁদা চাইতে এসেছে বুঝি ক্লাব থেকে? সোজা না বলে দাও, আজ এই পুজো, কাল ওই পুজো করবেন ওনারা, আর তার জন্য আমাদের গন্ডা গন্ডা চাঁদা দিতে হবে! যত্তসব!'
— 'আহা চাঁদা নিতে আসেনি। তুই আয় তো আগে ভেতরে!'
অভিমন্যু ব্যাজার মুখে ভেতরে এসে দেখল, অর্চিকা বসে আছে চেয়ারে।
— 'তুই? তোর কি কাজ এখানে?'
— 'অভি, কিভাবে কথা বলছিস তুই অর্চি মা র সাথে?মেয়েটা বাড়িতে এসেছে তোর সাথে দুটো কথা বলবে বলে, আর তুই...'
— 'কথা? কিসের কথা বাবা? আমি তো সেদিন ফোনে ওকে যা বলার বলেই দিয়েছি। এরপর আর কি বলার থাকতে পারে ওর?'
— 'দেখ অভি, এনাফ ইজ এনাফ, ওকে! আমি কোনো বাচ্চা মেয়ে নই যে তুই যা বলবি সবটা বিশ্বাস করব বোকার মতো! কি হয়েছে তোর অভি? বল্ না প্লিজ!'
— 'আরে আজব তো! আমার কি হবে! কিচ্ছু হয়নি আমার! আমি তোর সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে রাজি নই, ব্যস! এটাই শেষ কথা!'
— 'দাদা, কাকে কি বলছিস ভেবে বলছিস তো!'
— 'এই অনু, তুই ছোট আছিস ছোটর মতো থাক!বড়োদের ব্যাপারে এত কথা বলার সাহস কিভাবে হয় তোর?'
— 'ওকে কেন বকছিস শুধু শুধু অভি? ও ভুলটা কি বলেছে? আঙ্কেল, তোমার ছেলের মাথাটা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে বিশ্বাস করো!'
— 'হ্যাঁ তাই! আমি পাগল হয়ে গেছি, উন্মাদ হয়ে গেছি আমি! এবার খুশি!' চেঁচিয়ে উঠল অভিমন্যু।
— 'অভি!' গলাটা ভারী হয়ে এল অর্চিকার, চোখের কোণটা ভিজে গেল, অভিমন্যুর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, 'বল্ না অভি তোর কি হয়েছে! আর কাউকে না বলিস, অন্তত আমায় বল!'
অশোকবাবু আর অনিমা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, আর যাওয়ার আগে ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে ভেজিয়ে দিয়ে গেলেন তাঁরা।
— 'তুই ঠিকই ধরেছিস, আমি ভালো নেই, একদম ভালো নেই। আর কেন ভালো নেই জানিস? কারণ তুই আমার পিছু ছাড়ছিস না একদম! আমি বারবার তোর থেকে মুক্তি চাইছি, বলছি তোর সাথে সম্পর্ক রাখতে চাইছি না, তাও বারবার ডিস্টার্ব করছিস আমায়!আমার জীবনটা তুই কেন নরক করে দিচ্ছিস অর্চিকা?'
— 'আমি? তোর জীবন আমি নরক করছি?'
— 'হ্যাঁ করছিস!' বলেই অর্চিকার হাতটা ধরে টেনে এনে তাকে ঘরের বাইরে নিয়ে এল অভিমন্যু। ঘরের বাইরে অশোকবাবু আর অনিমা অপেক্ষা করছিল।অভিমন্যুর এই আচরণ দেখে রীতিমতো হতভম্ব হয়ে পড়লেন তাঁরা। অভিমন্যু বাইরে এসেই গর্জন করতে লাগল, 'কেন? কেন এই মেয়েটাকে বাড়িতে অ্যালাও করো তোমরা? আমি তো বলেছি আমি ওর থেকে মুক্তি চাই, মুক্তি!'
— 'বাবু, এবার কিন্তু সীমা ছাড়াচ্ছিস তুই! সভ্যতা, ভদ্রতা সবকিছু কি বিসর্জন দিয়ে এসেছিস?'
— 'শোনো বাবা, তুমি, বোন অর্চিকাকে ভালোবাসো খুব ভালো কথা। তোমরা দুজনেই অ্যাডাল্ট, কাজেই তোমরা কাকে ভালোবাসবে না বাসবে সেটা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই! কিন্তু প্লিজ ওকে আমার জীবনের সাথে জড়িয়ো না, আমি ওকে একটা মিনিটও সহ্য করতে পারছি না আমার জীবনে, যাস্ট একটা মিনিটও না!'
অর্চিকা কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। তার চোখের সামনে ঘটে চলা সমস্ত ঘটনা সে দর্শকের মতো হাঁ করে গিলছিল। এতদিন যে অভিকে সে চিনত, আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার সাথে তার কোনো মিল নেই, মনে হচ্ছে যেন অভির মুখোশ পরে অন্য কোনো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। অভিমন্যু বলে যেতে লাগল, 'শোনো বাবা, ও হল বড়োঘরের একমাত্র মেয়ে।জীবনে স্ট্রাগল কাকে বলে ও জানেনা। কোনোদিনও বাসে ট্রামে চড়েনি। ও যদি আমার স্ত্রী হয়ে এই বাড়িতে আসে তাহলে ও আমাদের এই মধ্যবিত্ত পরিবারে মানিয়ে নিতে পারবে না কোনোদিন! কেন বুঝতে পারছ না!'
— 'অভি!' একবুক হতাশা নিয়ে অর্চিকা বলল, 'যা মুখে আসছে তাই বলে যাচ্ছিস বল? এতদিনের সম্পর্ক আমাদের, আর তুই আমায় এতটুকুও চিনিস না জেনে আমি আজ খুব খুশি হলাম রে, খুব! আসছি আমি, আর কোনোদিনও তোকে বিরক্ত করব না দেখিস!' চোখ মুছে অর্চিকা বেরিয়ে গেল অভিমন্যুদের বাড়ি থেকে। অশোকবাবু, অনিমা বারবার ডাকাডাকি করলেন, কিন্তু অর্চিকা শুনল না। চলে গেল সে।

  মাস আটেক কেটে গেল। এই কয়েকমাসে অনেক ঝড় ঝাপটা বয়ে গেছে অর্চিকার জীবনে। অভিমন্যু ওর জীবন থেকে সরে যাওয়ার পর মাস দুয়েক অসম্ভব ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিল অর্চিকা। খাওয়াদাওয়া, ঘুম প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল, এমনকি সুইসাইডের চেষ্টাও করেছে বেশ কয়েকবার। সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের পর এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে সে।এখন তার জীবনে নতুন মানুষ এসেছে, তার নাম সুপ্রতীক। বর্তমানে অর্চিকা যে ইনস্টিটিউশন থেকে নাচের তালিম নিচ্ছে, সেই ইনস্টিটিউশনের মালিক জয়জিৎ সমাদ্দারের একমাত্র সন্তান। জয়জিৎ নিজে একজন নামী নৃত্যশিল্পী। দেশজুড়ে তাঁর নামডাক, বিদেশেও যান মাঝে মাঝে শোয়ের জন্য। জয়জিৎ নিজেও সপ্তাহে দুদিন করে আসেন অর্চিকাদের নাচ শেখাতে। অর্চিকার নাচের প্রতি ডেডিকেশন দেখে মুগ্ধ হয়েছেন জয়জিৎ, তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্রী হয়ে উঠেছে অর্চিকা, মাঝে মাঝে নিজের বাড়িতে ডেকেও তাকে তালিম দেন জয়জিৎ, আর সেখানেই সুপ্রতীকের সাথে আলাপ হয় অর্চিকার। প্রথম দেখাতেই বেশ পছন্দ হয়েছিল সুপ্রতীকের অর্চিকাকে, কিন্তু অর্চিকার জীবনে তখন অভিমন্যু ছিল বলে তাকে প্রত্যাখ্যান করে অর্চিকা। পরে যখন অভিমন্যু ছেড়ে চলে যায় অর্চিকাকে, তখন সেই হতাশা-কষ্টের দিনগুলোতে সুপ্রতীকই পাশে থেকেছে অর্চিকার, সাহস যুগিয়েছে।একটা সময় অর্চিকা জীবনের প্রতি এতটাই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল যে তার প্যাশন ডান্সকেও নিজের জীবন থেকে পুরোপুরি বিসর্জন দেওয়ার কথা ভেবেছিল।সুপ্রতীকের উৎসাহে আবার নাচের জগতে পা রাখে অর্চিকা। এখন ও অনেকটাই সুখী। অভিমন্যুকে ভুলে সুপ্রতীককে মনে স্থান দিয়েছে ও। মাস তিনেক পরেই ওদের বিয়ে। মেয়ের খুশি দেখে অর্চিকার মা বাবাও যথেষ্ট আনন্দিত, মেয়েকে নাচের ব্যাপারে তাঁরা এখন বাধা তো দেনই না, উলটে উৎসাহ যোগান।
   তিনটে মাসও দেখতে দেখতে কেটে গেল। আসলে জীবনের আলোকোজ্জ্বল সময়গুলো ভীষণই তাড়াতাড়ি কাটে। এসে গেল সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন।সুপ্রতীক অভিমন্যু ও তার পরিবারকেও তার বিয়েতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। যদিও অর্চিকা আপত্তি করেছিল এ ব্যাপারে, বলেছিল, 'অতীতকে পিছনে ফেলে আসাই ভালো। বর্তমানে তাকে টেনে এনে কি লাভ?'
— 'অর্চি, আজ হয়ত অভিমন্যু তোমার অতীত, কিন্তু এক সময় তো সে তোমার সবটা ছিল, তাই এ বিয়েতে ওকে ইনভাইট করা উচিত আমাদের।'
অর্চিকার আপত্তি সত্ত্বেও অভিমন্যুদের বাড়িতে নিমন্ত্রণপত্র নিয়ে হাজির হয়েছিল সুপ্রতীক, আর ওর বাবা জয়জিৎ স্বয়ং।
  ধুমধাম করে বিয়েটা হয়ে গেল সুপ্রতীক আর অর্চিকার। বিয়েতে অভিমন্যু বা তার পরিবারের কেউই আসেনি, তবে উপহার পাঠিয়ে দিয়েছিল। 
   এরপর বিয়ের রাতে সবাই যখন বাসরঘরে নতুন বর কনেকে নিয়ে হাসি ঠাট্টায় মগ্ন, অর্চিকা একবার সে ঘর থেকে বাইরে গেল জল খাবার জন্য। আর তখনই এক অচেনা ভদ্রলোক ওদের বাড়ি এসে সুপ্রতীককে খুঁজতে লাগলেন।
— 'সুপ্রতীকবাবু আছেন?'
সুপ্রতীক তখন বাসরঘরে ছিল। তাই অর্চিকা বলল, 'আমি ওনার স্ত্রী, যা বলার আমায় বলুন, আমি জানিয়ে দেব ওনাকে।'
— 'আচ্ছা ম্যাডাম, এই চিঠিটা ওনাকে দিয়ে দেবেন।' বলেই মুখবন্ধ খামে ভরা একটি চিঠি অর্চিকার হাতে দিলেন ভদ্রলোক।
খামের ওপর কারোর নাম লেখা ছিল না। খামের মুখটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে অর্চিকা জিজ্ঞেস করল, 'কে দিয়ে গেল চিঠিটা? নাম বলেছে কিছু?'
— 'না ম্যাডাম, নাম তো কিছু বলেনি, শুধু বলল, ওই বাড়িতে সুপ্রতীক সমাদ্দার বলে একজন রয়েছেন, ওনার হাতে চিঠিটা পৌঁছে দেবেন। বলেই চলে গেল সে।'
— 'আচ্ছা, অনেক ধন্যবাদ।'
— 'আমি তাহলে আসি ম্যাডাম?'
— 'হুম, আসুন।'
চিঠিটা খুলল অর্চিকা। কিন্তু খুলেই সে চমকে উঠল।হাতের লেখাটা ভীষণ পরিচিত। তাড়াতাড়ি চিঠিটা পড়তে লাগল ও। তাতে লেখা আছে,
  'প্রিয় সুপ্রতীক,
           আজ তোমাদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। তুমি আমাকেও আসার জন্য অনুরোধ করেছিলে, কিন্তু আমি আসতে পারলাম না, বাবা আর বোনও আসতে চাইল না। কিভাবে আসতাম আমরা বলো?আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছি যে! আজ আমি পুরোপুরি নিঃস্ব, দেউলিয়া। তোমার বাবা আমাদের টাকা দিতে চেয়েছেন বারবার, আমাদের আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে। কিন্তু সুপ্রতীক, মরা গাছের গোড়ায় যতই জল-সার দেওয়া হোক, সে কি আর বাঁচে? একটা অন্তঃসারশূন্য মানুষকে কি ই বা দেবে তুমি? মনে পড়ে সুপ্রতীক সেদিনের সন্ধ্যার কথা? তুমি আর তোমার বাবা আমাকে তোমাদের বাড়িতে ডেকে পাঠালে, একটা অমূল্য সম্পদ চেয়ে বসলে। আমার অর্চিকে তুমি ভালোবাসো, তার জীবন থেকে যেন আমি সরে যাই সেজন্য কয়েক কোটি টাকাও অফার করলে। আমি সেদিন হেসে বলেছিলাম, 'টাকা দিয়ে প্রেমের উপহার কেনা যায়, প্রেমের অনুভূতি কেন যায়না। এটুকু সাধারণ কথাও তুমি জানোনা সুপ্রতীক?'
এরপরই তোমার বাবা ব্রহ্মাস্ত্রটা হানলেন আমার ওপর, উনি বললেন, 'অর্চি মা আমার পুত্রবধূ হলে ওকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেব আমি। কিন্তু তা যদি না হয়, তবে অর্চিকাকে আর আমার ইনস্টিটিউটে আসতে দেব না কোনোদিন!'
  আমার অর্চির চোখে নাচ নিয়ে আমি অনেকটা স্বপ্ন দেখেছি, আমি ওর জীবন থেকে চিরতরে সরে গেলে যদি ওর স্বপ্নপূরণের পথ মসৃণ হয়, তবে আমি হাসিমুখে বেরিয়ে যাব ওর জীবন থেকে, ওর সাফল্যের রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াব। তারপরের দিন থেকেই কি দুর্ব্যবহারটাই না করেছি আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় মানুষটার সাথে।bবাড়ি থেকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছি, ঠেলে দিয়েছি ডিপ্রেশনের দিকে। বাবা আর বোন প্রথমদিকে কিচ্ছুটি জানত না, আমায় ভুল বুঝত, পরে সবটা শুনেছেন ওনারা।
  এরপর অর্চির অসহায় অবস্থার সুযোগে আপনি ওর পাশে এসে দাঁড়ালেন অবলম্বন হিসেবে, তারপর আজ আপনাদের পরম সুখের দিনটি আগত।
এত কথা লেখার একটাই কারণ সুপ্রতীক। অর্চি আমার কাছে কি সেটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারিনি কোনোদিন, সে বৃথা চেষ্টা করতে পারবও না কোনোদিন। আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদকে আপনার হাতে তুলে দিলাম, যত্নে রাখবেন আমার আদরের ফুলটিকে।
              — ইতি অভিমন্যু।'
  চিঠিটা পড়েই মাথাটা কেমন ঘুরে উঠল অর্চিকার, টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে বসে পড়ল ও। অস্ফুটে বলে উঠল, 'যাকে এতটা ভালোবাসলি, তার যোগ্যতার ওপর এটুকু ভরসা রাখতে পারলি না? যে প্রেমটাকে তিলে তিলে গড়েছি দুজনে, সেটাকে অসমাপ্ত রেখেই হেরে গেলি? কেন এমনটা করলি অভি! কেন?'
সারাদিন উপোস থাকা মেয়েটা আর বসে থাকতে পারল না, অজ্ঞান হয়ে গেল, মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।হাতের মুঠোয় তখনও চিঠিটা আলগোছে ধরা।

(সমাপ্ত)


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ