Advertisement

কুলের আচার

কুলের আচার
 

বাস থেকে নেমে ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল তিয়াশা। বেশ কিছুটা এগিয়েই সেই বাড়িটা চোখে পড়ল ওর। কোন্ ছোটবেলায় এই বাড়িতে আসত ও মা বাবার সাথে, তারপর তো বাবার অন্য রাজ্যে পোস্টিং হয়ে গেল, মা ও সেই রাজ্যেই একটা চাকরি খুঁজে নিল, দেশের বাড়িতে আসাই বন্ধ হয়ে গেল ওর একরকম। ছোটবেলায় কাকু, জেঠুর ছেলেমেয়েরাও আসত, কত মজাই না হত সেই সময়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দিনগুলোকে শুধুই স্বপ্ন মনে হয় তিয়াশার, যেগুলোর অস্তিত্ব আছে কোনো এক কাল্পনিক রাজ্যে, বাস্তব জীবনে নেই। গত দু'বছর হল তিয়াশাও চাকরি পেয়ে পাড়ি দিয়েছে ভিন দেশে৷ মা বাবা বারবার করে আসতে বলেছে তিয়াশাকে, ঠাম্মির নাকি শরীরটা খুব খারাপ, আদৌ বাঁচবে কিনা ঠিক নেই। একা মানুষ, সারাদিন দেখাশুনার জন্য একজন ঠিকে ঝি ছাড়া আর কেউই থাকে না এই বাড়িতে। কিভাবেই বা থাকবে? জেঠু, কাকু সকলেরই বাইরে চাকরি, পিসিরাও বিয়ে করে কেউ রাজ্যের বাইরে, কেউ বা দেশের বাইরে। সবাই কত করে বলেছিল, 'মা, এই ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে আর কোন্ দুঃখে পড়ে থাকবে? তার চেয়ে আমাদের সাথে চলো, যত্নে রাখব তোমায়।' ঠিক হয়েছিল, চার মাস জেঠুর কাছে, চার মাস তিয়াশার বাবার কাছে আর বাকি চার মাস কাকুর কাছে থাকবে ঠাম্মি, কিন্তু ঠাম্মি রাজি হয়নি, বলেছিল, 'না রে বাপ, এ হল আমার শ্বশুরের ভিটে। সেই কোন্ ছেলেবেলায় বিয়ে করে আমায় নিয়ে এসেছিল তোদের বাবা এই বাড়িতে, তখন আমার বয়স বড়োজোর বারো হবে। শাশুড়িমার কাছে প্রায়ই শুনতাম, 'বুঝলি কণিকা, এ ভিটেতে এয়েচি পায়ে হেঁটে, কিন্তু এখেন থেকে ফিরব চারজনের কাঁধেতে।' 

হাজার বুঝিয়েও রাজি করা যায়নি ঠাম্মিকে, ঠাম্মি সেই এখানেই রয়ে গেল। বাধ্য হয়েই এক ঠিকে ঝিকে রাখা হল চব্বিশ ঘণ্টা দেখাশোনা করার জন্য। 
ছোটবেলায় ঠাম্মি বড্ড প্রশ্রয় দিত তিয়াশাকে। অবশ্য দেবে নাই বা কেন, সে যে বছরের অর্ধেক সময়েই সর্দিকাশিতে ভুগত, তাই অন্য নাতি নাতনীদের চেয়ে তিয়াশাকে বেশি আগলে রাখত ঠাম্মি, একেবারে কোলের কাছে নিয়ে ঘুম পাড়াত। 

সেই ঠাম্মি আজ নাকি ভীষণ অসুস্থ! 
বাবা সকালে ফোন করেছে তিয়াশাকে, 'মায়ের হাতে আর সময় নেই রে, তাড়াতাড়ি চলে আয়।' 

তিয়াশা কোনোরকমে ব্যাগ গুছিয়েই রওনা দিয়েছে এয়ারপোর্টের দিকে, ইচ্ছে ছিল সকাল দশটার ফ্লাইটটা ধরবে, তাহলেই দুপুরে পৌঁছবে কলকাতায়, সেখান থেকে বাসে সন্ধ্যের মধ্যে পৌঁছে যাবে গ্রামে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক, এয়ারপোর্টে পৌঁছেই তিয়াশা শুনল, দশটার ফ্লাইট নাকি ক্যান্সেল, পরবর্তী ফ্লাইট দুপুর দুটোয়। শুনেই প্রমাদ গুনেছিল তিয়াশা, দুটোর ফ্লাইটে ফিরলে গ্রামে যেতে যেতে রাত এগারোটা বেজে যাবে! গ্রামে রাত আটটা বাজলেও অনেক সুনসান হয়ে যায়, সেখানে রাত এগারোটা মানে তো! কিন্তু এখন তো আর পিছিয়ে আসার সময় নেই, বাবাকে কথা দিয়েছে ও, আজকেই ফিরবে, তাই যত রাতই হোক, আজকেই রওনা দিতে হবে ওকে। ভাবল, বাবাকে জানাবে ও কথাটা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে একবারও নেটওয়ার্কটা লাগল না, তাই কাউকেই দেরি হওয়ার খবরটা জানাতে পারল না ও। 

  তিয়াশা যখন শেষ বাসটায় চড়ে গ্রামে নামল, তখন মোবাইলে টাইম দেখল, এগারোটা বেজে দশ। চারিদিকে একটাও জনমানব নেই, মাঝে মধ্যে অন্ধকারের বুক বিদীর্ণ করে ডাকছে পেঁচা। দূর থেকে ভেসে আসছে কুকুরের কান্নার শব্দ। কেমন যেন গা ছমছম করতে লাগল তিয়াশার৷ একটু আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, এখনও মাটি ভেজা রয়েছে। কোনোরকমে মোবাইলের টর্চ জ্বেলে কাদা ডিঙিয়ে ও চলল দেশের বাড়ির পথে। প্রায় বছর আটেক পর আবার এখানে এল ও। সেভাবে কিছুই বদলায়নি গ্রামে, শুধু ইঁটের বাড়ির সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে মাত্র। রাস্তা আজও পাকেনি, মোরামের রাস্তা নিজের শরীরের এখানে ওখানে বহন করছে ভ্যানরিক্সার চাকার দাগ, মানুষের চটিজুতোর ছাপ। 

 প্রায় মিনিট পনেরো কুড়ি হাঁটার পর তিয়াশা এসে পৌঁছল সেই বাড়িটার সামনে। বাড়িটা আজও একইরকম আছে, শুধু কিছু জায়গায় রং চটে গেছে৷ তিয়াশা অবাক হল, বাড়ির ভেতরে আলো জ্বলছে না তো? কে জানে, লোডশেডিং হয়েছে হয়ত।  
তিয়াশা দরজায় কড়া নাড়তে গিয়ে দেখে, দরজাটা খুলে গেল। 
— 'দরজাটা কেউ বন্ধ করেনি কেন ভেতর থেকে?' আশ্চর্য হয়ে তিয়াশা ভেতর ঢুকতেই দেখে, উঠোনে তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বলছে।
— 'মা? বাবা? ঠাম্মি? জেঠু? কোথায় সবাই তোমরা?' 

একটু পরেই সেই চিরাচরিত হাসিটা শুনতে পেল তিয়াশা। এই হাসিটা শুনলেই মনের ভেতরটা এক অদ্ভুত খুশিতে ভরে ওঠে। 

— 'ঠাম্মি?' হাসিমুখে ফিরতেই তিয়াশা দেখে, হাতে মোমবাতি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঠাম্মি। 
— 'এত দেরি করে আসতে হয় দিদুন? কতক্ষণ অপেক্ষা করছি তোমায় জন্য, জানো?'
— 'ঠাম্মি, তুমি ভালো আছো? বাবা যে ফোনে বলল...'
— 'আমায় নিয়ে ভেবো না দিদি। তোমায় একবার আদর না করে আমি যে মরতেও পারতাম না গো। যাক গে, এই বুড়িটার কথা ছাড়ো দেখি, এসো, ভেতরে এসো।' 

  তিয়াশা ভেতরে এসে বসল। ঠাম্মি জল এনে দিল তিয়াশাকে। কুয়োর ঠান্ডা জলে এক আলাদাই তৃপ্তি আছে, ওয়াটার পিওরিফায়ারের জলে সেই টেস্ট কই? 
— 'দাঁড়াও দিদি, তোমার জন্য একটা জিনিস আছে, আমি নিজের হাতে বানিয়েছি তোমার জন্য। কি যেন বলো তোমরা ইংরিজিতে, কি সার...'
— 'সারপ্রাইজ?' 
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই ওই। একটু বোসো।' 
একটু পরেই ঠাম্মি এল, হাতে একটা কাচের বয়াম। 
— 'বয়ামে কি আছে ঠাম্মি?'
— 'চোখ বন্ধ করো।'
অগত্যা তিয়াশা চোখ বন্ধ করল। ঠাম্মি কি যেন একটা জিনিস খাইয়ে দিল তিয়াশাকে। 
— 'ভালো হয়েছে দিদি?'
চোখ খুলেই তিয়াশা উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল, 'কুলের আচার?' 
— 'হ্যাঁ দিদি, কত ভালোবাসো বলো তো তুমি? তোমার জন্য বানিয়েছি নিজের হাতে।' 
— 'যাস্ট ফাটাফাটি হয়েছে ঠাম্মি!' ঠাম্মিকে জড়িয়ে ধরল তিয়াশা। 
— 'দাঁড়াও, দিদি, আমার একটা ছোট্ট কাজ আছে বুঝলে। কাজটা সেরেই আসি।' 
— 'আচ্ছা ঠাম্মি, বাবা, মা, জেঠু, কাকু ওরা কই গো?' 

 কিন্তু ঠাম্মি ততক্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে, তাই তিয়াশা নিজের প্রশ্নের উত্তর পেল না। 

  প্রায় পনেরো কুড়ি মিনিট বসে রইল তিয়াশা, কিন্তু ঠাম্মি আর এল না। বাধ্য হয়েই তিয়াশা মোমবাতিটা হাতে নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল, ডাকাডাকি করতে লাগল, 'ঠাম্মি, ও ঠাম্মি? কোথায় গেলে বলো তো তুমি?' 

হঠাৎই অনেকগুলো পায়ের শব্দ পেল তিয়াশা। বেশ কিছু মানুষ সদলবলে বাড়ির দিকেই আসছে। তিয়াশা মোমবাতিটা হাতে নিয়ে উঠোনে যেতেই দরজা খুলে প্রবেশ করল মা, বাবা, কাকু, কাকীমা, জেঠু, জেঠিমা, এমনকি পিসি, পিসেমশাই, আর তাদের ছেলেমেয়েরাও। 
— 'এসে থেকে তোমাদের খুঁজছি, কোথায় ছিলে বলো তো তোমরা এতক্ষণ?' 
সবার মুখে কেমন থমথমে ভাব। মা পিসিরা আঁচলে চোখের জল মুছছে। 
— 'কি হয়েছে গো? কাঁদছ কেন সবাই?' 
তিয়াশার বাবাই নিস্তব্ধতা ভাঙলেন প্রথম, 'বড্ড দেরি করে ফেললি রে মা! তোর ঠাম্মি আজ সন্ধ্যে সাড়ে ছ'টা নাগাদ চলে গেছে রে আমাদের সবাইকে ছেড়ে। ডাক্তারবাবু চারঘন্টা অপেক্ষা করে দাহ করতে বলেছিলেন, এই সবে ওসব কাজ সেরে আমরা ফিরছি রে মা!' 

  বাকরুদ্ধ হয়ে গেল তিয়াশা। ওর জিভে আচারের স্বাদটা লেগে রয়েছে এখনো। তাড়াতাড়ি মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে তিয়াশা দেখে, এখন নেটওয়ার্ক দিব্যি কাজ করছে। অথচ একটু আগেও তো...

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ