— 'এই কেকটা কেন এনেছো? এইটুকু কেক দিয়ে আমার বার্থডে সেলিব্রেট হবে? ক্লাসমেটদের সামনে আমার প্রেস্টিজ থাকবে? আর এই কেকের ডিজাইনটাও কি জঘন্য! ছি!' সুদৃশ্য থ্রি টায়ার কেকটার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল বছর দশেকের সুরজ।
— 'সে কি সুইটহার্ট? কেকটা তোমার পছন্দ হয়নি? ছোট মনে হচ্ছে?'
— 'হ্যাঁ হচ্ছে! আর গায়ে যে গোলাপফুলগুলো লাগানো রয়েছে, ওগুলো এত স্মল সাইজের কেন? আর এত কম কেন? এই কেক আমি কাটব না মাম্মা ড্যাডি! প্লিজ এটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এসো!'
— 'আচ্ছা সে নয় দেব, কিন্তু কেকটার ফ্লেভারও কি তোমার পছন্দ নয় সুইটহার্ট?'
— 'নো মাম্মা। আর পাঁচটা মিডল ক্লাস ফ্যামিলির ছেলেমেয়েদের মতো আমি বাজার চলতি পাতি চকলেট ফ্লেভার কেক ভালোবাসি না। ওরা তো আর আমার মতো ইম্পোর্টেড চকলেট খেতে পায় না, তাই বছরে একদিন চকলেট ফ্লেভারের নামে চিনির মতো মিষ্টি কেক খেয়ে সাধ মেটায়! কিন্তু আমি কি তেমন?'
— 'একদমই না! কি ফ্লেভার পছন্দ তোমার?'
— 'অবভিয়াসলি লোটাস বিসকফ!'
— 'ওকে মাই ডিয়ার! তাই হবে! এবার আমরা খেয়াল রাখব যাতে নতুন কেকে অনেকগুলো গোলাপ থাকে, আর অবশ্যই ফাইভ টায়ার হয়।'
— 'লাভ ইউ ড্যাডি!'
— 'লাভ ইউ টু বেটা!'
শহরের একটি নামী ব্যবসায়ী পরিবারের ড্রইংরুমের টুকরো ছবি এটা। আজ যে শুধু এই পরিবারের একমাত্র আদরের ছেলে সুরজের জন্মদিন তাই নয়, এই বাড়ির এক পরিচারিকা মালতীর ছেলে বসন্তেরও জন্মদিন। দুজনের বয়সও এক। বসন্তও এবার দশে পা দেবে।
বিধবা মালতী সবেধন নীলমনি বসন্তকে নিয়ে বস্তির একটা ছোট্ট ঘরে কোনোরকমে মাথা গুঁজে থাকে। এই বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে দিন গুজরান হয় ওর। এই মাইনেতেই সংসার খরচ, ছেলের স্কুলের মাসমাইনে, বই খাতা কেনার খরচ সবটা কোনোমতে চলে যায়।
ছেলের জন্মদিনে নিজের হাতে এক বাটি পায়েস বানিয়ে ওকে খাইয়ে দেয় মালতী। এছাড়া আর কিছু করার সামর্থ্য ওর নেই। বসন্তও ওর বয়সী আর পাঁচটা ছেলের তুলনায় খুব বোঝদার। মায়ের অবস্থাটা ও বোঝে, তাই কখনও কিছু নিয়ে বায়না করে না। কিন্তু মালতী তো মা, ছেলের ইচ্ছে অনিচ্ছে কি ওর চোখে ধরা পড়ে না? মালতী কি খেয়াল করে না, ঝাঁ চকচকে কেকের দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সুদৃশ্য রংবেরঙের কেকগুলো মুগ্ধচোখে দেখে বসন্ত? মায়ের মন সবটাই বোঝে। ছেলেকে জিজ্ঞেস করে, 'কেক খেতে ইচ্ছে করছে?'
বসন্তর জিভের ডগায় যেন উত্তর তৈরি থাকে। সে এক ঝটকায় বলে দেয়, 'না গো মা। এসব মিষ্টি খাবার আমার ভালো লাগে না। আমার ভালো লাগে পান্তা ভাত, পেঁয়াজ, একটু আলুভাতে আর একটা লঙ্কা।'
ছেলের মিথ্যে ঠিক ধরা পড়ে যায় মায়ের চোখে। মুখ ঘুরিয়ে শতচ্ছিন্ন আঁচলে ভেজা চোখ মুছে নেয় মালতী।
সুরজের ভাষায় 'পাতি কমদামী' থ্রি টায়ার চকলেট কেকটাকে একদৃষ্টে দেখছে মালতী। যদি একটা টুকরোও মালিক দয়া করে ওকে দিতেন! জন্মদিনের দিন যদি ছেলের মুখে একটুখানি কেক তুলে দিতে পারত মালতী!
অর্ডার দেওয়া নতুন কেক একটু পরেই এসে গেল বাড়িতে। নতুন কেক দেখে সুরজের খুশি আর ধরে না। এত বড় কেক দেখে মালতীর চোখ ছানাবড়া। মনে মনে বলল, 'এত বড় কেক খেয়ে শেষ করতে পারবে এরা? নাকি নষ্ট হওয়া বাকি কেক ফেলে দেবে ডাস্টবিনে?'
— 'এই মালতী, শোনো!' হাঁক দিলেন সুরজের মাম্মা।
— 'আজ্ঞে ম্যাডাম!'
— 'পুরোনো কেকটা এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও। আর ওটা তোমরা মেডরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিও, কেমন?'
— 'আচ্ছা ম্যাডাম।'
মালতীর ইচ্ছে করছিল ম্যাডামের রাঙা পায়ে প্রণাম ঠুকে বলে, 'আপনি মানুষ না ম্যাডাম, সাক্ষাৎ দেবী।'
দাঁতে দাঁত চেপে আনন্দাশ্রু নিবারণ করল মালতী। কেকটা নিয়ে রান্নাঘরে গেল। এই বাড়িতে যে কতশত মেড! সবার ভাগে পড়ল এক টুকরো চতুর্ভুজ আকারের কেক। কিন্তু নিজের জন্য সবচেয়ে বড় সাইজটা নিল মালতী। শুধু সাইজ বড় বলেই নয়, ওই টুকরোটায় দুটো গোলাপও ছিল যে!
কেকের টুকরোটা কাগজের ঠোঙায় মুড়ে বস্তির দিকে রওনা দিল মালতী। বসন্ত জানে না, আজ মা তার জন্য কি চমক আনছে। ভেবেই মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠল ওর। কি যেন বলে স্যার আর ম্যাডাম ইংরেজিতে? কি যেন সার...
(সমাপ্ত)
0 মন্তব্যসমূহ