Advertisement

হ্যাপি এন্ডিং



 হড়বড়িয়ে স্টেশনে ঢুকল অবন্তিকা। তরুণের আজ কলকাতা থেকে জলপাইগুড়ি ফেরার কথা। কতদিন পর আবার দেখা হবে মনের মানুষটার সাথে! শুধু মোবাইলে কথা বলে কি আর মন ভরে? 

  ট্রেনটার এই একটু আগেই স্টেশনে ঢোকার কথা। তেমনটাই জানিয়েছে তরুণ কাল মেসেজে। অবন্তিকা শাড়িতে নিজেকে সাজিয়েছে আজ, প্রিয়তমর মনের মতন। 

 কিন্তু আজ সকাল থেকে একবারও ফোনে পাচ্ছেনা অবন্তিকা তরুণকে। কখনও বলছে সুইচড অফ, তো কখনও বলছে নাম্বারটির অস্তিত্ব নেই। চুটিয়ে গালিগালাজ করতে ইচ্ছে করছে সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানিকে। 

 স্টেশনে ঢুকেই অবন্তিকা দেখে, ওই তো, অনতিদূরেই দাঁড়িয়ে আছে তরুণ। অবন্তিকাকে দেখেই মুখে হাসি ফুটল ওর, দু'হাত প্রসারিত করে প্রিয়তমাকে ঈশারায় ডাকল আলিঙ্গনবদ্ধ হওয়ার জন্য। 
ফিরিয়ে দিল না অবন্তিকা। দৌড়ে যেতে লাগল তরুণের দিকে। হাওয়ায় ওর শাড়ির আঁচল উড়তে লাগল। 
ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল অবন্তিকা তরুণের বুকে। তরুণ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ওকে। 
— 'তোমাকে যে কত মিস করেছি এতদিন তরুণ!' 
— 'আমিও বিন্তি, আমিও। লাভ ইউ সো মাচ।' 
— 'লাভ ইউ টু।' 

 হঠাৎ অবন্তিকার কেমন যেন অস্বস্তি লাগল। চারিদিকের মানুষরা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। 
— 'এদেশের লোকেরা কেন যে এত ম্যানারলেস আর হ্যাংলা জানি না! দুজন একে অপরকে হাগ করছে, আর এরা সেটা হাঁ করে গিলছে! আপদ যত!' 
অবন্তিকা কথাটা মনে মনে বললেও তরুণ যেন শুনে ফেলল অন্তর্যামীর মতো। 
— 'লোকের কথা ছাড়ো না বিন্তি। লোকজনের মুখ কি কখনো বন্ধ করতে পেরেছে কেউ? তার চেয়ে চলো না, আজকের এই সুন্দর মুহূর্তটা আমরা নিজেদের মতো উপভোগ করি। কে কি বলবে, ভাববে, সেসব এক মিনিটের জন্য তুলে রাখতে পারিনা আমরা? বলো? কাল হো না হো...'
— 'ঠিক বলেছো তরুণ।' 

চোখ বন্ধ করল অবন্তিকা। তরুণ অনেক কথা বলছিল ওকে। কলকাতার মানুষজন, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এসব নিয়ে। অবন্তিকার যেন নেশা লাগছিল তরুণের মায়াজড়ানো কন্ঠস্বরে। তরুণ ওর এত কাছে, তবুও যেন মনে হচ্ছে কন্ঠস্বর ভেসে আসছে বহুদূর থেকে। এইভাবে কতক্ষণ কেটেছে খেয়াল নেই অবন্তিকার, হঠাৎ ঝাঁকুনিতে হুঁশ ফিরল ওর। 
— 'এই বিন্তি, কি করছিস তুই চোখ বন্ধ করে? গাঁজা টাজা ফুঁকেছিস নাকি সকাল সকাল?' 
ঝাঁঝালো নারীকন্ঠে বিরক্ত অবন্তিকা চোখ মেলে দেখে, সামনে দাঁড়িয়ে ওর বেস্টফ্রেন্ড সংহিতা। কিন্তু তরুণ কই? এই তো এতক্ষণ অবন্তিকাকে জড়িয়ে ছিল, কত কথা বলছিল, এক নিমেষে কর্পূরের মতো উবে গেল নাকি? পরক্ষণেই ওর মনে হল, তরুণ যা লাজুক, নিশ্চয়ই সংহিতাকে দূর থেকে আসতে দেখেই সরে গেছে। সব রাগ গিয়ে পড়ল সংহিতার ওপর।
— 'সব সময় রং টাইমে এন্ট্রি নেওয়ার বাজে অভ্যাসটা আজও গেল না তোর না? এইজন্যই তুই সিঙ্গেল জানিস তো! আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সিঙ্গেলই থাকবি! বেরসিক কোথাকার!' 
— 'মানে? আমি আবার কি করলাম? কি আলফাল বকছিস তুই ভাই?' 
— 'হতচ্ছাড়া সেই আমাকে দিয়ে স্বীকার করাবেই!' দাঁত কিড়মিড় করে বলল অবন্তিকা, 'যখন কোনো কাপল পার্সোনাল টাইম স্পেন্ড করে, তাদের যে ডিস্টার্ব করতে নেই এটাও জানিস না শয়তান?' 
— 'কাপল মানে? তরুণের কথা বলছিস? ও ফিরেছে নাকি? কই দেখলাম না তো!' 
— 'হ্যাঁ ফিরেছে! এতক্ষণ আমার সাথেই ছিল! কিন্তু শাঁকচুন্নীকে দেখেই সরে পড়েছে।' 
— 'অসভ্য মেয়ে! তুই আমাকে শাঁকচুন্নী বললি?' 
— 'হুম, যেটা সত্যি সেটাই বললাম!' 
— 'এই শোন্‌ না, তুই সত্যি বলছিস? তরুণ সত্যিই আজ ফিরেছে?' 
— 'আরে বাবা হ্যাঁ! এই তো কত গল্প...'
— 'সাধে কি বললাম তুই গাঁজা ফুঁকেছিস? বিশ্বাস কর আমি এখন স্টেশনে আসিনি। পাক্কা পনেরো কুড়ি মিনিট আগে এসেছি। তখন থেকে দেখছি তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস দু'হাত বাড়িয়ে, ঠিক যেন মনে হচ্ছে হাওয়াকে জড়িয়ে ধরে হাওয়ার সাথে কথা বলছিস!'
— 'যাহ, ফালতু বকিস না!' 
— 'আমি জানতাম, তুই এটাই বলবি, আর তাই তোর ওই অবস্থার ছবিও নিয়ে রেখেছি। এই দেখ।' 

মোবাইলের গ্যালারি খুলে একটা ছবি দেখাল ও অবন্তিকাকে। ছবিটা দেখে ভীষণ অবাক হল অবন্তিকা। তরুণ তবে আসেনি? সবটাই ওর কল্পনা? মনের ভুল? কিন্তু তরুণের কন্ঠস্বর তো ও নিজের কানে শুনেছে। এতটা ভুল হল ওর? 

— 'হয় হয়, প্রেমে পড়লে এমনটা হয় সিনেমাতে দেখেছি বটে, কিন্তু বাস্তবেও যে হয় আপনাকে না দেখলে জানতেই পারতাম না! সত্যি ম্যাডাম, আপনাকে খুরে খুরে নমস্কার!' 
— 'কিন্তু তরুণ সত্যিই এসেছিল।' 
— 'ধ্যাৎ গাঁজাখোর! কেউ আসেনি। ও এলে কি ছবিতে ধরা পড়ত না? তোর হবু বর কি ইনভিসিবল?' 

অন্যমনস্ক অবন্তিকাকে একরকম টানতে টানতে স্টেশন থেকে নিয়ে এল সংহিতা। 

ও বাড়ি ফিরতেই ওর মা বাবা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, 'এত সকাল সকাল কোথায় গিয়েছিলি বিন্তি?' 
— 'কোথায় আবার কাকিমা? যার সাথে সামনের মাসে ওনার বিয়ে, তেনার সাথে দেখা করতে!' 
— 'তরুণ?' মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন অবন্তিকার মা বাবা। 
— 'হুম, সেই ভদ্রলোক। তিনি সত্যি সত্যি আসেননি, উনি তেনাকে ইমাজিন...'
সংহিতা কথা শেষ করার আগেই ওর কোমরে কনুইয়ের গুঁতো মারল অবন্তিকা। 
— 'আউচ!' 
— 'কি হল সংহিতা? কি বলছিলে যেন?' 
— 'ক-কিছু না কাকিমা। আমি তো এটাই বলতে এলাম, একমাসটা বড্ড বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে কাকিমা! পারলে কালকের মধ্যেই তোমার মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করো! আমি যাই!' 
সংহিতা কোনোরকমে পালিয়ে বাঁচল। 
— 'তরুণ এসেছিল রে বিন্তি? কি বলে গেল সংহিতা?' 
— 'ওর কথা ছাড়ো তো! পাগলি একটা!' 
— 'কিন্তু ওর তো আজকেই ফেরার কথা!' 
— 'হুম, কিন্তু ট্রেন এখনো আসেনি স্টেশনে। এদিকে ফোনেও পাচ্ছি না সকাল থেকে।' 
— 'বোধহয় নেটওয়ার্ক প্রবলেম। তুই আর দেরি করিস না বিন্তি, শাড়ি টাড়ি ছেড়ে স্নানে যা। তোর তো আজ ইন্সটিটিউট যাওয়ার আছে।' 
— 'হ্যাঁ মা। আজ কয়েকটা ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাসও আছে।' 

 মাস্টার্সের পর অবন্তিকা কাছাকাছি একটা ইন্সটিটিউটে এম.বি.এ কোর্সে ভর্তি হয়েছে। আইটি সেক্টরে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে প্রবল ওর। তরুণও আইটি সেক্টরেই চাকরি করে, কলকাতায় একটা ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে। অবন্তিকা আর ওর একই পাড়ায় বাড়ি। তরুণ আর অবন্তিকা স্কুলও ছিল একই। সেখান থেকেই মনের দেওয়া নেওয়া শুরু দুজনের৷ 

 সেই সম্পর্ক এবার পরিণতির দিকে এগোচ্ছে ক্রমশ। সামনের মাসেই ওদের বিয়ে। অবন্তিকার এম.বি.এ কোর্স শেষ হতে আর বেশি বাকি নেই। এই সপ্তাহের পরের সপ্তাহেই ফাইনাল এক্সাম। 

 তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল অবন্তিকা। কিন্তু বেরিয়েই ও বেশ অবাক হয়ে গেল। পাড়ার মানুষেরা ওর দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। প্রথমে অবাক হলেও পরে লজ্জা পেল অবন্তিকা। নিশ্চয়ই সকালে স্টেশনের ঘটনাটা চাউর হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি একটা অটোয় উঠে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল ও। 

 সারাদিন তরুণকে ফোনে পেল না ও। ইন্সটিটিউটে অবন্তিকার ক্লাসমেটরা সবাই গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করছে, কিন্তু ওকে দেখেই সবাই চুপ করে যাচ্ছে। ওদের এহেন ব্যবহারে অবাক অবন্তিকা প্রশ্নও করেছে ওদের, কিন্তু কেউ উত্তর দেয়নি। কেউ নীরব থেকেছে, কেউ বা 'কই তেমন কিছু না তো' টাইপের দায়সারা উত্তর দিয়ে সরে পড়েছে। 

 বাড়ি ফিরে ও অবাক। মা বাবা কেমন যেন থম মেরে আছে। সংহিতা এসেছে, প্রাণোচ্ছল মেয়েটাও কেমন যেন মুষড়ে পড়েছে। অবন্তিকাকে দেখেও যেন দেখল না কেউ। অদ্ভুত লাগছে অবন্তিকার। 
হঠাৎ ওর ফোনে আননোন নাম্বার থেকে কল এল। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপার থেকে ভেসে এল তরুণের গলা, 'হ্যালো বিন্তি!' 
চমকে উঠল অবন্তিকা।
— 'তরুণ এটা কার নাম্বার? আর তোমাকে ফোনে পাচ্ছি না কেন সকাল থেকে?' 
— 'আমার ফোনটা যে আমার কাছে নেই বিন্তি! তাই একটা বুথ থেকে ফোন করছি তোমায়। তুমি কল ব্যাক কোরো না প্লিজ!' 
— 'কিন্তু তুমি এখন আছো কোথায়? ট্রেনটা এত লেট করছে কেন?'
— 'ঠিক বলেছো বিন্তি। ট্রেনটা সত্যিই লেট।' 
— 'জলপাইগুড়ি ঢুকবে কখন?' 
— 'জানি না বিন্তি। তুমি সাবধানে থেকো। নিজের খেয়াল রেখো। আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না...' 
— 'হ্যালো! হ্যালো!' 

ফোনটা কেটে গেছে। তরুণের বারণ না শুনে কল ব্যাক করল অবন্তিকা, কিন্তু কেউ রিসিভ করল না, কেবল ভেসে এল যান্ত্রিক মহিলা কন্ঠস্বর, 'নম্বরটির অস্তিত্ব নেই।' 
বিরক্ত, চিন্তিত অবন্তিকা মোবাইলটা ছুড়ে ফেলল বিছানায়। 

 গোটা বাড়ি, পাড়া কেমন যেন থম মেরে গেছে। মানুষগুলো হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কারোর যেন প্রাণ নেই। নিষ্প্রাণ একেকটা রোবট যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে রিমোট সঞ্চালনে। অবন্তিকার হঠাৎ মনে হল, ও যেন কোনো এক মৃত্যু উপত্যকায় এসে পৌঁছেছে ভুল করে। দমবন্ধ হয়ে এল ওর। ভীষণ খিদে পেয়েছিল ওর। পিঠের ব্যাগ বিছানায় রেখে বাড়ির সামনের রেস্টুরেন্টে ঢুকল ও। 

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে সামনের পার্কটায় গেল ও। শূন্য পার্কে একা একাই দোলনায় দুলছিল ও, হঠাৎ মনে হল, কে যেন ডাকল ওকে পিছন থেকে। চমকে দোলনা থেকে নেমে পিছন ফিরে কাউকেই দেখতে পেল না ও। একবার মনে হল, কেউ বুঝি হাত ধরল, কেউ বুঝি কাঁধে হাত রাখল, কিন্তু ওর পঞ্চইন্দ্রিয় ওকে জানান দিল, সবটাই ওর মনের ভুল।
— 'অবন্তিকা, তুই খুব ক্লান্ত। তোর রেস্টের ভীষণ দরকার।' নিজেই নিজেকে বলল ও। 

বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে বেডরুমে গা এলিয়ে দিল ও। মা বাবা, সংহিতার দিকে ফিরেও তাকাল না ও। ওরা এখন একেকটা পাথরের মূর্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। কথার জবাব দেয় না। দিলেও তাতে হেঁয়ালি মিশে থাকে। 

 বেডরুমে গা এলাতেই চোখ দুটো বুজে এল ওর। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল ওর মনে নেই, হঠাৎ চাপা কান্নার শব্দে ওর ঘুম ভাঙল। মোবাইলে সময় দেখল, রাত ন'টা। এই সময় কে কাঁদছে? একজন নয়, দু'তিনজনের সম্মিলিত কান্নার শব্দ যেন কানে আসছে, আর শব্দটা আসছে অবন্তিকার ঘরের ঠিক বাইরে থেকে। 
অবন্তিকা ঝেড়েমেড়ে উঠে বসল। ঘরের দরজা খুলতেই দেখে, কিচ্ছু ভুল শোনেনি ও। মা আর বাবা এতক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল, আর সংহিতা সান্ত্বনা দিচ্ছিল ওদের। ওরও চোখ ছলছল করছে। 
— 'তোমরা কাঁদছো কেন? কি হয়েছে?' 
ওকে দেখেই যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠল তিন জন। 
— 'বি-বিন্তি! তুই তো ঘুমোচ্ছিলি!' 
— 'ঘুম ভেঙে গেছে আমার। তোমাদের কি হয়েছে একটু ক্লিয়ারলি বলবে প্লিজ? ফিরে থেকে দেখছি অস্বাভাবিক চুপচাপ রয়েছো তোমরা! সংহিতা, তুই তো অ্যাটলিস্ট মুখটা খোল্‌! খুব টেনশন হচ্ছে আমার!' 
— 'আসলে বিন্তি, আজ সকালে...'
— 'আজ সকালে? কি? থামলি কেন? কি হয়েছে আজ সকালে?' 
— 'তুই জানিস না বিন্তি আজ কি? সবটা জেনেও কেন প্রশ্ন করছিস?' 
— 'বুঝতে তো পারছি না বাবা! জানিও না! তুমি যখন জানো, প্লিজ বলো না!' 
— 'আজ তোর দিম্মার মৃত্যুবার্ষিকী রে বিন্তি! প্রত্যেক বছর এই দিনটায় তোর মায়ের কতটা মন খারাপ থাকে, তুই জানিস না?' 

সত্যিই তো! কি করে ভুলে গেল অবন্তিকা? প্রত্যেক বছর এইদিনটায় মা চুপচাপ থাকে একটু। কিন্তু এবারের শোক, দুঃখের তীব্রতা একটু বেশি নয়? এতটাই শোকতপ্ত মা যে সংহিতাকে আসতে হল মাকে সামলাতে? কেমন যেন খটকা লাগল মনে, কিন্তু সেই খটকা প্রকাশ করল না ও। 

 পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাবার মুখোমুখি হল অবন্তিকা। বাবা নিজের হাতদুটো পিছন দিকে রেখেছিল। ওর মনে হল, বাবা যেন কিছু লুকোচ্ছে, কিন্তু কি লুকোচ্ছে, সেটা বুঝতে পারল না। অন্যদিকে তরুণেরও কোনো খোঁজ খবর পাচ্ছে না ও। ওর হঠাৎ মনে হল এই দুটো ঘটনার মধ্যে কোনো একটা যোগাযোগ নিশ্চয়ই আছে। ও আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করল না। 
টিভিটা চালাল ও, কিন্তু ছবি এল না। 

— 'ছবি আসছে না কেন বলো তো বাবা? কিছু প্রবলেম হয়েছে নাকি গো?' 
— 'সে কি রে? ছবি আসছে না? কই দেখি!' 

তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হাতের কাগজটা বিছানায় রেখে বাবা এগিয়ে এলেন টিভিটার দিকে। মানে বাবার হাতে খবরের কাগজ ছিল। কিন্তু সেটা লুকোচ্ছিল কেন? 

টিভিতে কোনো সমস্যা না পেয়ে বাবা আর অবন্তিকা ছাদে গেল। অবন্তিকা অবাক হয়ে বলে উঠল, 'এ কি!' 

কেবলের তারটা কেউ যেন ইচ্ছে করে কেটে রেখেছে। বাবা রাগত স্বরে বলে উঠল, 'পাড়ার বখাটে ছেলেগুলোর অন্যদের সমস্যায় ফেলা ছাড়া আর কাজ আছে কোনো?' 

দুজনেই হতাশ হয়ে নীচে নেমে গেল। 

আজ আবারও অবন্তিকার ইনস্টিটিউট যাওয়ার পালা। স্নান করে খেয়েদেয়ে অবন্তিকা বেরিয়ে গেল গন্তব্যের পথে। 

কিন্তু ও বেরিয়ে পড়ার কিছুক্ষণ পরেই প্রমাদ গুণলেন ওর মা বাবা। যে খবরের কাগজটা লুকিয়ে রেখেছিলেন বাবা, সেই কাগজটা কই? গোটা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোত্থাও পাওয়া গেল না সেই কাগজ। 

— 'বিন্তির হাতে পড়ে যায়নি তো কাগজটা?' শিউরে উঠল মা বাবা। 

অবন্তিকার ঘরে একখানা চিঠি পাওয়া গেল। মেয়ের হাতের লেখা চিনতে অসুবিধা হল না তাঁদের। কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল অবন্তিকার বাবা। চিঠিতে লেখা — 

'তোমাদের অস্বাভাবিক আচরণের কারণটা আমি জেনে গেছি মা, বাবা। খবরের কাগজটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলে, ভেবেছিলে জানতে পারব না কিছু। সংহিতা আমার বেস্টফ্রেন্ড হয়েও সবটা লুকিয়েছে আমাকে, কিচ্ছুটি বলেনি আমাকে। তোমরা ভালো করেই জানতে আমার মোবাইল অ্যাডিকশন নেই, অনলাইন নিউজও তেমন পড়ি না আমি, খবর জানার জন্য আমি টিভি আর খবরের কাগজটাই প্রেফার করি, আর তাই আজকের খবরের কাগজ লুকিয়ে রাখলে, কেবলের তার কেটে দিলে। নিজের মেয়েকে এতটা বোকা ভাবলে বাবা? ভুলে গেলে আমি তোমার মেয়ে? দুইয়ে দুইয়ে চার করে নিতে আমার অসুবিধা হয়নি বাবা। ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক, আজকের খবরের কাগজটা পড়তেই হবে আমাকে। তোমার অলক্ষ্যে ঠিক খুঁজে বের করলাম কাগজটা। হেড লাইনটা পড়েই বুঝে গেলাম তোমাদের গোপনীয়তার কারণ। তরুণ যে ট্রেনটায় ফিরছিল, সেই ট্রেনে একটা ভয়ঙ্কর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে কাল সকালে। ওর কোচে আগুন ধরে গিয়েছিল। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে কোচটা। একটা মানুষও বেঁচে নেই ওই কোচে। বুঝতে পারলাম, কেন তরুণকে ফোনে পাচ্ছি না। জানো বাবা, তোমরা হয়ত বিশ্বাস করবে না, কাল সকাল ঠিক সাড়ে ন'টার সময় তরুণ এসেছিল, আমাকে বুকে টেনে নিয়েছিল, কত কথাও বলল। খবরে পড়লাম, ওই ন'টা থেকে সাড়ে ন'টার মধ্যেই নাকি ঘটেছিল অ্যাক্সিডেন্টটা। যে মানুষটা আমার সবকিছু, যার পাশে থাকব আজীবন প্রমিস করেছিলাম, আজ তার ঠিকানাই যে আমারও ঠিকানা বাবা। ও যেখানে গেছে, আমিও যে সেখানে যাব বাবা। আমাকে যেতেই হবে। তরুণকে একা রেখে আমি তো এই দুনিয়ার বুকে আনন্দে বেঁচে থাকতে পারব না বাবা। তোমরা ভালো থেকো। নিজেদের যত্নে রেখো। সংহিতা, তোকেও বলছি শোন্‌, মা বাবার খেয়াল রাখবি। মনে রাখবি, আমার অবর্তমানে তুইই ওদের মেয়ে। কখনো মানুষদুটোকে আমার অভাব বুঝতে দিবি না। চললাম আমি। টা টা।
                                — বিন্তি' 

তাড়াতাড়ি ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপালকে ফোন করলেন অবন্তিকার বাবা। ওপাশ থেকে ভেসে এল প্রিন্সিপালের ভরাট গলা। 
— 'হ্যালো! কে বলছেন!' 
— 'স্যার আমি একজন ছাত্রীর বাবা বলছি। আমার মেয়ের নাম অবন্তিকা দাশ। এম.বি.এ ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট। ও সুইসাইড অ্যাটেম্প করবে স্যার! প্লিজ ওকে বাঁচান! আমরাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাচ্ছি।' 

এগারো তলা বিল্ডিংয়ের ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে অবন্তিকা। নিচে দাঁড়িয়ে সবাই চিৎকার করছে, 'পাগল হয়ে গেছো? কি করছো? নেমে এসো তুমি!' 
অবন্তিকার সেসবে কোনো হুঁশ নেই। হঠাৎ ও দেখে ভিড়ের মধ্যে তরুণ দাঁড়িয়ে আছে। ও চেঁচিয়ে বলছে, 'পাগলামো কোরো না বিন্তি। তোমাকে বাঁচতে হবে।' 
অবন্তিকা মৃদু হাসল, 'তা তো হবেই মিস্টার। আমি তোমার সাথে বাঁচব তো, তবে সেটা অন্য কোনো জগতে, এই দুনিয়ায় নয়।' 
চোখ বন্ধ করে ঝাঁপ দিল অবন্তিকা। সবাই চেঁচিয়ে উঠল। কেউ কেউ জ্ঞান হারাল এই দৃশ্য দেখে, কেউ বা চোখ বন্ধ করে নিল। 

সবাই দেখল, অবন্তিকার রক্তমাখা দলা পাকানো শরীরটা পড়ে আছে ক্যাম্পাসের সাদা মেঝেয়। কিন্তু কেউ দেখতে পেল না, দুটো আবছা শরীর একে অপরের হাত ধরে হেঁটে চলেছে। দুজনের মুখেই লেগে আছে হাসি। হোক না সে অন্য জগত, তবু মিলন তো হল দুই আত্মার! একে হ্যাপি এন্ডিং ছাড়া আর কিই বা বলা চলে? 

(সমাপ্ত) 




 

 

 







একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ