পৃথ্বীশের ফোনটা বেজে বেজে কেটে যায়, কিন্তু ফোনটা আর কেউ রিসিভ করে না। নীলিমা হতাশ হয়ে বসে পড়ে বিছানায়।
পাশের ঘর থেকে চিৎকার করে ওঠেন বিমলা, 'পেলি না তো ফোনে ব্যাটাচ্ছেলেকে? দেখ নীলু দেখ শুধু, কাকে ভালোবেসেছিস এতদিন দেখ এইবার!'
— 'মা আমি কি করে জানব বলো তো যে পৃথ্বীশের ঘরে বৌ আছে? বৌ রেখে যে সে আমায় প্রেম নিবেদন করতে এসেছে সেটা কলকাতায় বসে আমি কিভাবে বুঝব? তাছাড়া ওর এখানকার কোনো বন্ধুবান্ধবও জানত না যে ও ম্যারেড!'
— 'আমি শুরুতেই বলেছিলুম, ছেলেটাকে দেখে ঠিক যেন সুবিধের মনে হচ্ছে না, শুনলি না তখন মায়ের কথা!'
— 'তুমি ভেবোনা মা, পৃথ্বীশকে এত সহজে তো আমি ছাড়ব না! নীলিমা মজুমদারকে ঠকিয়ে ও পার পেয়ে যাবে তা তো হবেনা! আমি আজই ওর ফ্ল্যাটে যাব!'
কিন্তু পৃথ্বীশের কলকাতার ফ্ল্যাটটায় গিয়ে নীলিমা দেখে, তালা ঝুলছে ফ্ল্যাটে। পাশের ফ্ল্যাট থেকে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে বললেন, 'কাকে খুঁজছ মা?পৃথ্বীশকে? কিন্তু ও তো নেই, শুনলাম চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।'
পৃথ্বীশের বাড়ি নদীয়ার এক মফস্বলে। চাকরির জন্য ও বছর দুয়েক আগে এসেছিল কলকাতায়। ফ্ল্যাটে ও একাই থাকত। নীলিমাসহ পৃথ্বীশের কোনো অফিস কলিগই জানত না যে পৃথ্বীশ বিবাহিত। অফিসেই নীলিমার সাথে পরিচয় পৃথ্বীশের, তারপর বন্ধুত্ব, আর বন্ধুত্ব থেকে প্রেম। প্রেমটা এতটাই অন্তরঙ্গতায় পৌঁছেছে যে আজ নীলিমা সন্তানসম্ভবা। কিন্তু এই ঘটনাটা পৃথ্বীশকে জানাতেই সে নীলিমাকে সব সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্লক করেছে, এমনকি তার ফোনকলও রিসিভ করে না আর। বিমলা বলেছিলেন, 'তুই তো চাকরি করিস নীলু, সন্তানকে একাই মানুষ করবি, ওই অমানুষটাকে আর কিসের দরকার তোর জীবনে? আর সমাজ কি বলবে সেটা আমি পরে বুঝে নেব!'
কিন্তু নীলিমা বলেছিল, 'হ্যাঁ আমারও ওকে দরকার নেই জীবনে, কিন্তু একবার আমি ওর বাড়িতে তো যাবই, ওর বাড়ির লোকেরও জানাটা দরকার যে ওদের ছেলেটি আসলে কেমন চরিত্রের!'
এরপরেই হঠাৎ সেই খবরটা পায় নীলিমা। পৃথ্বীশের বাড়ি যে মফস্বলে, সেই মফস্বলেই একটা স্কুলে চাকরি করে নীলিমার ছোটবেলার বান্ধবী পিউ। পিউয়ের মারফতই খবর পায় নীলিমা, যে ঘরে জলজ্যান্ত বউ রেখে এসে সে নীলিমার সাথে নির্দ্বিধায় প্রেম করে গেছে, এই কলকাতার ফ্ল্যাটেই কাটিয়েছে অনেক মুহূর্ত। এই ব্যাপারটা জানার পর নীলিমা আরও উদগ্রীব হয়ে পড়েছে, সে তো প্রতারিত হয়েছেই, কিন্তু আরও একটা নির্দোষ মেয়ে এভাবে প্রতারিত হোক তা নীলিমা কিছুতেই চায় না। তাই সে ঠিক করেছে, পৃথ্বীশের মফস্বলের বাড়িতে গিয়ে সে পৃথ্বীশের মা বাবা সহ তার স্ত্রী দোলনকে সবটা জানাবে।
অন্যদিকে পৃথ্বীশের এক বন্ধু রজত তার কথামতো নীলিমাকে ফলো করছিল, কারণ পৃথ্বীশ জানত, সে বিবাহিত একথা জানার পর নীলিমা কিছুতেই বাড়িতে বসে থাকবে না, তার প্রেগন্যান্সির কথা সে পৃথ্বীশের মা বাবা কে, বিশেষ করে দোলনকে জানাবেই। রজত মারফতই পৃথ্বীশ খবর পায়, যে নীলিমা আসছে তাদের বাড়িতে সবটা জানাতে। তখনই মনে মনে সব প্ল্যান ছকে ফেলে পৃথ্বীশ। যেদিন নীলিমার পৃথ্বীশের মফস্বলের বাড়িতে আসার কথা, সেদিন সকালেই অনেক দূরের এক মন্দিরে দোলনসহ মা-বাবাকে পুজো দিতে পাঠিয়ে দেয় পৃথ্বীশ। ফলে নীলিমা বাড়ি এসে দেখে পৃথ্বীশ ছাড়া বাড়িতে কেউ নেই, আর দেখেই চিৎকার করতে শুরু করে সে, 'কাপুরুষ কোথাকার!কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস সবাইকে? ডাক সবাইকে, তোর বউ জানুক যে সে কার সাথে ঘর করে!'
— 'আহ নীলিমা, দেখো যা হওয়ার তো হয়েই গেছে, তুমি শান্ত হও না, এত সিনক্রিয়েট কোরো না!' শান্ত গলায় নীলিমাকে বোঝানোর চেষ্টা করল পৃথ্বীশ।
— 'দিনের পর দিন দু'দুটো মেয়েকে ঠকিয়ে এখন শান্ত হতে বলছিস হতচ্ছাড়া জানোয়ার? তোর কোনো কথা আমি শুনব না, ভালো চাস তো বউকে ডাক, নইলে পাড়ার লোক জড়ো করব বলে দিলাম।'
— 'নীলিমা এই অবস্থায় এত উত্তেজিত হতে নেই, তুমি শান্ত হও! দেখো তোমার মাসে মাসে যা টাকাপয়সা লাগবে আমি দিয়ে দেব, বাট প্লিজ দোলনকে কিছু বোলোনা!'
— 'শয়তান! এখন ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ করবি ভাবছিস নীলিমা মজুমদারের? আজ তোরই একদিন কি আমারই! দাঁড়া এখনই লোক জড়ো করছি আমি!'
নীলিমা ছুটে বাইরে যেতে গেল, আর তখনই পৃথ্বীশ এসে নীলিমার হাত দুটো ধরল। রজত লুকিয়ে ছিল পাশেই, ও এসে নীলিমার মুখ বাঁধল শক্ত করে, তারপর ওর হাতদুটোও বাঁধল ওরা। এরপর ওকে পাঁজাকোলা করে ওরা বাড়ির ছাদে নিয়ে গেল। পৃথ্বীশ বাঁকা হেসে বলল, 'তোমায় ভালোভাবে অনেক বোঝালাম, টাকাও অফার করলাম, কিন্তু কি আর করা! সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল যে বাঁকাতেই হয়!'
নীলিমা প্রাণপণ চেষ্টা করল ওদের বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে, কিন্তু ব্যর্থ হল সে। ওরা তিনতলার ছাদ থেকে ফেলে দিল নীলিমাকে, তারপর রক্তাক্ত নীলিমাকে পুঁতে দিল বাড়ির বাগানেই। এতটাই গভীরে পুঁতে দিল ওর বডিটা ওরা যাতে মাটি খুঁড়লেও ওর শরীরটা কেউ খুঁজে না পায়।
— 'শুধু শুধু মরতে হল বেচারিকে! বেশি প্রতিবাদী সাজতে এসেছিল কিনা! বউ আমার, অথচ তার প্রতি ওনার দরদ বেশি!'
অন্যদিকে মন্দিরে পুজো দিয়ে দোলনদের ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। দোলনসহ পৃথ্বীশের মা বাবা তমাদেবী আর বিজয়বাবু বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিন্দুবিসর্গও জানেন না।
কিছুদিন পরেই হঠাৎ দোলনের শরীরটা কেমন খারাপ হতে লাগল। জানা গেল, সন্তানসম্ভবা হয়েছে সে। এই খবর শুনে পৃথ্বীশ যেন আকাশ থেকে পড়ল, কারণ ডাক্তারবাবু বলে দিয়েছিলেন, দোলনের শারীরিক কিছু ত্রুটির জন্য ও কোনোদিন মা হতে পারবে না। তমাদেবী আর বিজয়বাবু যদিও খবরটা শুনে বেজায় খুশি, কারণ তাঁরা মনে করেন, সবটাই ঈশ্বরের করুণাবর্ষণ।যে ডাক্তারবাবু দোলনকে দেখতেন, তিনিও এই খবরে বেশ হকচকিয়ে গিয়েছিলেন প্রথমে, কিন্তু পরে পৃথ্বীশকে হেসে বলেছিলেন, 'অনেক সময় চিকিৎসা শাস্ত্রেও মিরাকেল ঘটে, জানেন তো? এটাও সেরকমই একটা মিরাকেল। আপনার মা-বাবাই ঠিক বলেছেন, হয়ত সবটাই ওপরওয়ালার ইচ্ছা!'
তবুও পুরো ব্যাপারটা পৃথ্বীশের অস্বাভাবিক লাগছিল কিছুটা হলেও, মনে মনে খুঁতখুঁতানি ছিলই তার।অন্যদিকে নীলিমার বিধবা মা বারবার খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন নীলিমাকে, কিন্তু পৃথ্বীশ আর রজত হুমকি দিয়েছে ওঁদের, যে নীলিমার ব্যাপারে থানাপুলিশ করলে নীলিমার একমাত্র ভাই, অর্থাৎ বিমলার স্কুল পড়ুয়া ছেলেকে খুন করে দেবে, তাই অসহায়া বাধ্য হয়েই হজম করে নিয়েছেন এত বড়ো অন্যায়।
অন্যদিকে দোলন প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকেই সবসময় কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। দিনে, রাতে, সকাল, সন্ধ্যায় ও বাড়ির বাগানে ঘুরে বেড়ায়, বিশেষ করে বাগানের যে জায়গায় নীলিমাকে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ চুপচাপ। আবার অনেক সময় ছাদেও ঘুরে বেড়ায় দোলন, অন্যমনস্কভাবে ছাদ থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর আচার আচরণে বেশ অবাক হয়ে যায় পৃথ্বীশ। দোলন কোনোদিনই বাগানে বা ছাদে যেতে বিশেষ পছন্দ করত না আগে। তমাদেবী অবশ্য বলেন, 'ও নিয়ে আবার এত ভাবার কি আছে? এই সময় মেয়েরা এরকম অনেককিছুই করে যেগুলো তারা আগে করত না কখনোই।' তবুও পৃথ্বীশ ব্যাপারটা এত সহজে মানতে পারেনি, একটা অজানা আতঙ্ক কাজ করত ওর মনে।
ওর আতঙ্কটা চরমে পৌঁছয় যখন একদিন রাতে তমাদেবী দোলনকে সস্নেহে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'বাচ্চার নাম কি রাখবে ভেবেছ নাকি মা?'
দোলন অন্যমনস্কভাবে জবাব দিয়েছিল, 'নীলাক্ষী।'
— 'ওমা এ তো মেয়ের নাম! তুমি কি করে জানলে তোমার মেয়ে হবে?'
— 'কি করে জানলাম তা তো জানিনা!' দোলন অন্যমনস্কভাবে জবাব দিল, 'আমি শুধু জানি আমার মেয়ে হবে, তার চোখের মণি নীল হবে, ঠিক ওর মায়ের মতো, আর নাম হবে নীলাক্ষী!'
এই কথাটা শুনেই অসম্ভব চমকে উঠেছিল পৃথ্বীশ। এই একই কথা তাকে নীলিমাও বলেছিল, যে তার কন্যাসন্তান হবে, যার চোখের মণি হবে একদম নীলিমারই মতো নীল, আর তার নাম হবে নীলাক্ষী।
— 'কিন্তু তোমার চোখের মণি তো নীল নয় মা!' তমাদেবীর প্রশ্নে চটক ভাঙল পৃথ্বীশের।
এই প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না দোলন। শুধু বলল, 'আমি বড়ো ক্লান্ত মা, ঘুমোতে চাই!'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই মা, তুমি ঘুমোও না!' তমাদেবী দোলনের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন, আর যাওয়ার আগে বলে গেলেন শুয়ে পড়তে।
দোলন শুয়ে পড়ল। পৃথ্বীশ এসে ওর মাথার কাছটায় বসল। দোলন তখন ঘুমে অচেতন। পৃথ্বীশ অবাক চোখে দেখতে লাগল দোলনকে। এই দোলনকে সে চেনে না। সে যে দোলনকে চিনত সে নিতান্তই প্রাণোচ্ছল, হাসিখুশি, আর ভীষণ সরল সাধাসিধে একটা মেয়ে। শাশুড়ি তমাদেবী তাই মাঝেমধ্যেই তাকে বলতেন, 'এত ভোলাভালা মানুষ হতে নেই মা এযুগে! যা দিনকাল, লোকজন ঠকিয়ে মাড়িয়ে চলে যাবে!'
সেই দোলন আজকাল যেন হাসতে ভুলে গেছে, সবসময় কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। যে পৃথ্বীশকে সে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসত, বিশ্বাস করত অন্ধের মতো, সেই পৃথ্বীশকে সে আজকাল এড়িয়ে চলে, কথাও প্রায় বলে না বললেই চলে।
পৃথ্বীশ দোলনের কপালে হাত রাখতে গেল যেই, অমনি দোলন হঠাৎ চোখ মেলে তাকাল। পৃথ্বীশ খুব চমকে গেল। দোলন বলল, 'তোমার নিশ্বাসে বিষ আছে!আমার বাচ্চাটাকে তুমি বাঁচতে দেবে না আমি জানি!এক্ষুণি চলে যাও, চলে যাও এক্ষুণি এই ঘর থেকে নইলে আমি কিন্তু চিৎকার করব!'
দোলনের হাবেভাবে এমনিতেই বেশ অবাক হয়ে আছে পৃথ্বীশ, বলা যায় একটু ভয়েও আছে সব মিলিয়ে। তাই ও ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে দ্বিরুক্তি না করে।
কেটে গেল ন-দশ মাস। জন্ম নিল দোলনের কন্যাসন্তান। অদ্ভুতভাবে মেয়েটির চোখের মণি হল নীল, যেমনটা দোলন বলেছিল। তমাদেবী আর বিজয়বাবু বেশ অবাক হলেন এই ঘটনায়, আর পৃথ্বীশের তো মনে হচ্ছিল বুঝি পায়ের তলার মাটিই সরে যাবে। মেয়েটির নাম রাখা হল নীলাক্ষী। নীলিমার জন্মতারিখ ছিল ১০ ই অক্টোবর, অর্থাৎ ১০/১০, নীলাক্ষীর জন্মতারিখও এটাই।
আস্তে আস্তে দোলনের কোলে হেসেখেলে বেড়ে উঠতে লাগল নীলাক্ষী। দোলনের মতো সেও পৃথ্বীশের ধারেকাছেও ঘেঁষে না, পৃথ্বীশ তাকে আদর করতে গেলেই সে ছুটে চলে যায় দূরে। নীলাক্ষী দোলনকে মা বলে ডাকে না, বলে মামণি। তমাদেবী আর বিজয়বাবু বারবার শেখানো সত্ত্বেও সে দোলনকে মা বলে ডাকেনি কখনো, সে কেবলই বলে, 'ও তো আমার মামণি, মা নয়।' সকলে খুব অবাক হন এতে। এমনকি দোলনও কেমন অন্যমনস্কভাবে সায় দিয়ে বলে, 'ও ঠিকই বলছে মা, বাবা, আমি সত্যিই ওর মা নই। যেদিন তিনটে দশ একসাথে মিলিত হবে, সেদিনই ও ওর মায়ের খোঁজ দেবে।'
কেটে যায় দশটা বছর। আজ নীলাক্ষীর দশ বছরের জন্মদিন, বাড়িতে অনুষ্ঠানের তোড়জোড় হচ্ছে সকাল থেকেই। তমাদেবী, দোলন ভীষণ ব্যস্ত আজ, নিশ্বাস নেওয়ার সময়টুকুও নেই ওদের।
হঠাৎ করেই পৃথ্বীশের ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনটা ধরেই হঠাৎ মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে যেন ওর। রজতের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, ও হসপিটালে ভর্তি। পৃথ্বীশ তাড়াতাড়ি ছোটে হসপিটালে। ডাক্তার বললেন বাঁচার আশা খুবই কম। পৃথ্বীশ গেল রজতের সাথে দেখা করতে। সারা গায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা রজত ক্ষীণকন্ঠে বলল, 'আজ যখন পাঁচটা দশ একসাথে হবে, আর চাঁদের বুকে মেঘ জমবে, তখন তোকে কয়েকটা প্রশ্ন করা হবে। প্রশ্নগুলোর উত্তরে সত্যিটাই বলিস রে, তবেই আমি বাঁচব, নইলে আজকের দিনটাই দুনিয়ায় আমার শেষ দিন হবে। প্লিজ ভাই, প্লিজ আমায় প্রাণে বাঁচা! তোর জন্য তো আমি কত কি করেছি, আর তুই এইটুকু পারবি না!'
রজতের কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না পৃথ্বীশ। হতভম্ব হয়ে বাড়ি আসছিল ও, হঠাৎই ওদের প্রতিবেশী মিনুবৌদি এসে পৃথ্বীশকে বলল, 'আজ তো মেয়ের জন্মদিন, এই পায়েসটা ওর জন্য বানিয়েছি আমি, দিও ওকে!' বলেই পায়েসের বাটিটা পৃথ্বীশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, 'সন্ধ্যের অনুষ্ঠানেও যাব, চিন্তা কোরো না, ১০/১০ তারিখে ১০তম জন্মদিন তোমার মেয়ের, একদম হ্যাট্রিক যাকে বলে, না গেলে হয়!'
হঠাৎই মাথাটা কেমন ঘুরে গেল পৃথ্বীশের। দোলন বলে, যেদিন তিনটে দশ একসাথে মিলিত হবে, সেদিনই নাকি নীলাক্ষী তার মায়ের খোঁজ দেবে। আজই তবে সেই দিন!
ভীষণ ভয়ে ভয়ে পৃথ্বীশের সারাদিনটা কাটল, ভাবছিল এই বুঝি কিছু ভয়ানক ঘটনা ঘটবে। দিনটা ভালোভাবেই কেটে গেল, এরপর বিকেল গড়িয়ে নামল সন্ধ্যে। গেস্টরা এলেন, কেক কাটা হল জমিয়ে, তারপর গানের অনুষ্ঠান হল। নীলাক্ষী গান গাইল 'তুমি রবে নীরবে।' এটা ওর প্রিয় গান। অদ্ভুতভাবে নীলিমারও এটা প্রিয় গান ছিল। সন্ধ্যেটা নির্বিঘ্নেই কাটল। এরপর এল রাত, সকলের ডিনার করার পালা। কিন্তু হঠাৎ করেই নীলাক্ষী কাঁদতে শুরু করল সকলের মাঝে।সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
— 'কি হয়েছে মা, কাঁদছ কেন?'
— 'আমার পুতুলটা কাদায় পড়ে গেছে, তুলে দাও না!' ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল নীলাক্ষী।
— 'কোথায় পড়েছে মা?'
— 'বাগানে!'
সকলে মিলে গেলেন বাড়ির বাগানে। নীলাক্ষী সকলকে নিয়ে এল সেই জায়গায়, যেখানে নীলিমার মৃতদেহ পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। সকলে এসে দেখলেন, ওখানে একটা পুতুল পড়ে আছে, পুতুলটারও চোখ দুটো নীল।নীলাক্ষীকে অনেক পুতুল নিয়েই খেলতে দেখেছে পৃথ্বীশ, কিন্তু এই পুতুলটা আগে ও এই বাড়িতে দেখেছে বলে মনে পড়ল না। পুতুলটার কোমর থেকে নীচের অংশটা বাগানের কাদায় ডুবে গেছে, আর সেইজন্যই নীলাক্ষী কাঁদছে। পৃথ্বীশ সবটা দেখে বড্ড ভয় পেয়ে গেল, আর নীলাক্ষী ছুটে এসে পৃথ্বীশের হাত ধরে টানাটানি করতে লাগল, 'ও বাবা, বাবা, পুতুলটাকে তুলে দাও না! ও পুতুল আর কেউ তুলতে পারবে না, শুধু তুমিই পারবে!'
পৃথ্বীশ ভাবল, এখানেই যে নীলিমার মৃতদেহ পুঁতে রাখা আছে সেকথা তো ও ছাড়া এখানে উপস্থিত আর কেউ জানে না, তাই অন্য কেউ পুতুলটাকে বের করতে গেলে যদি কিছু অঘটন ঘটে সব সত্যিটা বেরিয়ে আসে, তার চেয়ে এই কাজটা ওর করাই নিরাপদের। তাই পৃথ্বীশ তাড়াতাড়ি গেল পুতুলটাকে সাবধানে তুলতে, কিন্তু পুতুলটাকে স্পর্শ করতেই যেন শক লাগার মতো একটা অনুভূতি হল পৃথ্বীশের, কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল ও, আর তখনই বাড়ির বড়ো ঘড়িটায় ঢং ঢং শব্দ করে দশটা বাজল। ঘোরের মধ্যেও পৃথ্বীশ বুঝতে পারল, চারটে দশ একত্রিত হয়েছে, শুধু আর একটা দশ আসার অপেক্ষা। হঠাৎই লোডশেডিং হয়ে গেল, কিন্তু রাতটা ছিল পূর্ণিমার রাত, তাই জ্যোৎস্নার আলোয় সব দেখা যাচ্ছিল। পৃথ্বীশ পুতুলটাকে বারবার তোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল, মনে হচ্ছে যেন পুতুল নয়,একটা বৃক্ষকে সে শিকড় সমেত উপড়ে ফেলার বৃথা চেষ্টা করছে। তবুও এক অজানা শক্তির বশে পৃথ্বীশ হাল না ছেড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে।হঠাৎই চাঁদের বুকে মেঘ জমল, চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ক্ষীণ আলোতেই পৃথ্বীশ হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে, দশটা বেজে দশ বাজে, অর্থাৎ পাঁচটা দশ একত্রিত হয়েছে। অন্যদিকে দশটা মিনিট চেষ্টা করার পর অবশেষে পুতুলটাকে মাটি থেকে তুলতে সক্ষম হল পৃথ্বীশ। কারেন্ট এসে গেছে ততক্ষণে। সকলে অবাক হয়ে দেখেন, পুতুলটার সাথে জড়িয়ে আছে একটা লতানে গাছ, যার শিকড় অনেকটা গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত, পুতুলটার সাথে সাথে উঠে এসেছে শিকড়ও, কিন্তু এ কি! শিকড়ের সাথে জড়িয়ে উঠে এসেছে একটা কঙ্কালও! সকলে দেখেই চমকে উঠলেন। তমাদেবী আর বিজয়বাবু বললেন, 'এ কি?আমাদের বাগানে কঙ্কাল কিভাবে এল? কে পুঁতেছিল এটা এখানে?'
— 'ওটা তো আমার মা!' বলে উঠল নীলাক্ষী।
সকলকে অবাক করে দিয়ে দোলনও সে কথার সমর্থন জানাল।
— 'মাকে কে আনল এখানে বাবা, বলো না গো!'
— 'কি হল পৃথ্বীশ, মেয়ের কথার জবাব দাও!' হঠাৎই সেখানে চলে এলেন নীলিমার মা বিমলাদেবী, 'সত্যিটা বলো!'
পৃথ্বীশের হঠাৎ মনে পড়ল রজতের কথা। কিন্তু পৃথ্বীশ মনে মনে রজতকে বলল, 'সরি বস! আপনি বাঁচলে বাপের নাম, তোর কথা আমি রাখতে পারলাম না!'
পৃথ্বীশ কোনো কথাই স্বীকার করল না, শুধু বলল, 'আমি কিভাবে জানব এটা এখানে কিভাবে এল?আমার জানা নেই! আর নীলাক্ষীর মা দোলন, এটা কার না কার কঙ্কাল, এটা ওর মা কেন হতে যাবে?যত্তসব!'
তখনই পুলিশ এল হঠাৎ বাড়িতে, বিমলাদেবীই ডেকেছিলেন। বিমলাদেবী সব কথা খুলে বললেন, নীলিমা আর পৃথ্বীশের অনেক ছবি ছিল তাঁর কাছে, সেসবও দেখালেন তিনি, তারপর একটা ডিএনএ রিপোর্ট তুলে দিলেন বিজয়বাবুর হাতে, যেখান থেকে এটা স্পষ্ট যে নীলিমার সন্তানের বাবা ছিল পৃথ্বীশই!বিমলাদেবী বললেন, 'আমার মেয়ে তো বুদ্ধিমতী ছিল, তাই এই রিপোর্টটা রেখেছিল ওর কাছে, ভেবেছিল পৃথ্বীশ অস্বীকার করলে এটা প্রকাশ করবে সকলের সামনে, কিন্তু ওই জানোয়ারটা আমার মেয়েকে ততদিন বাঁচতেই দিল না, আমার পোয়াতী মেয়েটাকে শেষ করে দিল!' কাঁদতে লাগলেন বিমলা।
পুলিশ অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেল পৃথ্বীশকে। অন্যদিকে রজতের হসপিটালে মৃত্যুর ঘটনাটাও কানে এল ওর।তমাদেবী আর বিজয়বাবু বললেন, এমন ছেলের মুখ আর দেখবেন না তাঁরা, জীবনের শেষ দিনগুলো বৌমা আর নাতনীকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচবেন তাঁরা।
কোর্টে পৃথ্বীশকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হল।অদ্ভুতভাবে, পৃথ্বীশ জেলে যাওয়ার পরই সবটা ভুলে গেল নীলাক্ষী। দোলনকেই সে মা বলে জড়িয়ে ধরল, আর দোলনও সকলের কাছে নীলাক্ষীকে নিজের সন্তান হিসেবেই পরিচয় দিতে লাগল, সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর থেকে সবসময় যে অন্যমনস্কতা কাজ করত তার ভেতরে, সবটা মুছে গিয়ে সেই আগের দোলন ফিরে এল যেন আবার, তবে এই দোলন আর পৃথ্বীশকে ভালোবাসে না, বরং ঘৃণা করে।
(সমাপ্ত)
0 মন্তব্যসমূহ