Advertisement

সবজায়গায় আছি


এক বন্ধুর বিয়েতে গিয়েছিলাম, বিয়ে শেষ হতে হতে রাত ১ টা বেজে গিয়েছিল। ওদের বাড়ি থেকে আমার বাড়ি দু'মিনিটের হাঁটা রাস্তা, তাই আমি একাই হেঁটে ফিরছিলাম, রাত অনেক হওয়া সত্ত্বেও। পেটপুজোটা যে ভালোই হয়েছে সেটা হাঁটার সময় ভালোই টের পাচ্ছিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে একটা কাঁপা নারীকন্ঠ ভেসে এল, 'এই মেয়ে, এত রাতে রাস্তা দিয়ে একা হাঁটছ, ভয়ডর নেই?'
পাড়ায় ফ্রিতে জ্ঞান দেওয়া কাকিমা-জেঠিমার অভাব নেই, ভাবলাম তাদেরই কেউ হবে। কিন্তু এত রাতে তাদের কারোর এখানে আসাটা কেমন অসম্ভব মনে হল। আবার ডাক এল, 'কি ব্যাপার? আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না? এদেশের মেয়েদের এত সাহস ভালো নয়, শেখায়নি বাড়িতে?'
আর সহ্য হল না। ফিরে তাকালাম বিরক্ত হয়ে, 'কে আপনি?'
রাস্তায় আলোর হাল খুব যে ভালো তা নয়। তারই মধ্যে অনতিদূরে একটা রহস্যময়ী মূর্তি দেখলাম। অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, তাই মুখটা দেখতে পেলাম না ভালোভাবে। সে হেসে বলল, 'আমি কে তা দিয়ে তোমার কি হবে বাছা? তুমি যে, আমিও সে।'

উফ, মাঝরাতে আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেল।বললাম, 'ঠিক আছে, আপনি যেই হোন, আমি আপনাকে চিনি না। আর কোনো অচেনা লোকজনের সাথে কথা বলার সময় বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই। সরি।'
ছায়ামূর্তি হেসে বলল, 'মেয়েমানুষ, তাও এদেশের, অত গুমর আসে কোথা থেকে?'
মাথাটা এবার অসম্ভব গরম হয়ে গেল, 'যত্তসব পাগলের দল! আমার কপালেই জুটল?'
ছায়ামূর্তির হাসি থেমে গেল। গম্ভীর গলায় বলল, 'হ্যাঁ, আমার কোনো পরিচয় নেই। একটাই পরিচয়, আমি এদেশের মেয়ে।'
- 'বেশ, সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু নামধাম তো আছে নিশ্চয় কিছু?'
- 'বাড়ির পোষা পশুপাখিদের নাম থাকে, আর আমার থাকবে না? ভেবে নাও কিছু একটা নিজের ইচ্ছেমতো।'
- 'সে আবার কি? বলি আপনার মা-বাবার দেওয়া নামও কি নেই?'
- 'মা-বাবা? কই তাদের তো চিনি না আমি?' ব্যথিত স্বরে বলল সে।
হয়তো অনাথ, তাই আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, 'বাড়ি কোথায়?'
- 'বাড়ি? সেটা কি হয় গো?'

নাহ, আর সন্দেহ নেই, এ শুধু পাগল নয়, একেবারে গারদ পালানো বদ্ধ উন্মাদ। এর সাথে আর কথা বাড়ানো ঠিক নয় ভেবে আবার সামনের দিকে ফিরে চলতে শুরু করলাম। পিছন থেকে আশ্চর্য কন্ঠ বলে উঠল, 'এতক্ষণ ধরে যার সাথে এত কথা বলে সময় নষ্ট করলে, তার চেহারাটা একবার দেখে যাবে না?'
বিরক্ত হয়ে ঘুরে তাকালাম, যা দেখলাম তা আর সত্যিই বলা যায় না। এ কি দেখছি আমি? এটা কি স্বপ্ন? না বাস্তব?
একটা মেয়ে, তার শতচ্ছিন্ন নোংরা সাদা থান, ধুলোবালি-কাদা-রক্ত লেগে চিটচিট করছে, সাদা থান আর সাদা নেই, কে জানে এই কাদা আর রক্তের দাগ কতদিনের? চামড়া কেমন যেন অসম্ভব শুকনো কোঁচকানো ফ্যাকাশে, এতটুকুও রক্ত নেই যেন শরীরে, মুখের বাঁ পাশ ওই নোংরা ছেঁড়া আঁচল দিয়ে প্রাণপণ ঢাকার চেষ্টা করছে।
- 'কি হয়েছে আপনার?' ছুটে গেলাম আমি।
- 'খবরদার! একদম কাছে এসো না আমার, তাহলে তুমিও খারাপ হয়ে যাবে, কলঙ্কিনী হয়ে যাবে আমার মতো।'
- 'মানে? আপনি তো অসুস্থ, চিকিৎসার প্রয়োজন আপনার।'
হাসতে হাসতে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এত হাসিতে মগ্ন যে, ঘোমটা খসে পড়ল বাঁদিকের মুখ থেকে, আর যা দেখলাম আমি, আঁতকে উঠলাম। মুখটার এখানে ওখানে মাংস নেই, হাড় দেখা যাচ্ছে, আর বাঁ চোখের জায়গায় একটা ঝাপসা গর্ত। গালের চামড়া অদৃশ্য, তাই দাঁত-মাড়িও দেখা যাচ্ছে।
আর দাঁড়াতে পারলাম না, বসে পড়লাম রাস্তায়। হাসি তার তখনো থামেনি। হেসে বলল, 'ব্যস? এটুকুতেই এত ভয়? তাহলে সারা শরীর দেখলে কি বলবে?'
কথা বলার অবস্থায় ছিলাম না, তাও প্রাণপণ চেষ্টা করলাম কথা বলতে, 'এমন অবস্থা কি করে হল?'
- 'তাহলে বলি শোনো। ভেবো না গরীর বাপের মেয়ে ছিলাম, বেশ ভালো ঘরেই জন্ম নিয়েছিলাম। সোনার চামচ মুখে দিয়ে হয়তো নয়, কিন্তু বেশ স্বচ্ছল সংসারই ছিল। বাপ-মা খুব আশা করেছিল একটা ছেলে আসবে বংশের বাতি দিতে, কিন্তু হায়! জন্ম নিল এই অলক্ষীটা। ব্যস, রাতের অন্ধকারে অনেক দূরের এক মন্দিরে রেখে এল। ভালো বাড়ির মেয়ে হয়েও অনাথ আশ্রমে মানুষ হলাম। বাপ-মা ফেলে এসেছিল বলে কত ছোটোবড়ো কথাই না শুনতে হয়েছে আমাকে!তবে আশ্রমের স্কুলে একজন ম্যাম ছিলেন, একদম মায়ের মতো স্নেহ করতেন আমায়। ওনাকে দেখেই বুঝেছি, মা কেমন হয়। জানো, আশ্রমে মেয়েদের থেকে ছেলে বন্ধুই বেশি ছিল আমার, তাই নিয়েও মেয়েগুলো কি কানাকানি হাসাহাসিই না করেছে, আমার চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মনোজদা, আমার সিনিয়র, আমায় ভালোবাসত, কিন্তু বলতে পারেনি কখনো। কিন্তু একটা মেয়ের চোখ ফাঁকি দেওয়া কি এত সোজা? অসুস্থ হলেই ছুটে ওষুধ এনে দেওয়া সবার বলার আগেই, নোটস এনে দেওয়া, জন্মদিন মনে রাখা, সবই বুঝতাম। বৃষ্টিদিনে কবিতা লিখত আমার নামে, সেটাও জানতাম। ম্যামও চেয়েছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আমরা বিয়ে করি। কিন্তু অত সুখ ভগবানের আমার কপালে লিখতে বয়েই গেছে। একদম নারীসুলভ ফিগার যাকে বলে, সেটা ছিল আমার, তাই কম ইভটিজিং এর শিকার হইনি, তার ওপর পাড়ার এক মস্তানের চোখে পড়ে গেলাম, তার বাবার খুঁটির জোর আছে, তাই পুলিশও তাকে ছোঁয়না। কুপ্রস্তাব দিল আমায় মেসেজ করে, কার কাছ থেকে আমার ফোন নাম্বার পেল সেটাই ভেবে অবাক হয়েছিলাম, পরে জেনেছিলাম স্কুলেরই এক সহপাঠী বান্ধবীর কীর্তি এটা, মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু কথাটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। যাই হোক, ব্লক করে দিলাম জানয়ারটাকে।একদিন রাস্তায় একা পেয়ে আমার পথ আটকালো, গালে থুতু দিয়ে চলে আসছিলাম, কিন্তু সে আর হল কই? দলবল নিয়ে সে জোর করে টেনে নিয়ে গেল পরিত্যক্ত বাড়িতে। সারারাত ধরে চলল পাশবিক নির্যাতন।' কিছুক্ষণ থেমে আবার বলতে শুরু করল, 'মনোজদা রাত জেগে বসে থাকত হাসপাতালে আমার বেডের পাশে, বলেছিল, আমি আছি তো, তোর ভয় কি? আমরা কিছুতেই ওকে ছাড়ব না, জেল খাটিয়ে ছাড়ব সব কটাকে, দেখে নিস।' হাসল ও, 'বোকা ছিল মানুষটা, মামলা তুলতে চাইনি বলে আমার মুখে অ্যাসিড ছোড়া হল, শরীরের বাঁ দিকটা পুড়ে গেল।দেখতে দেখতে পুজো এসে গেল, শুনলাম ওই শয়তানটা নাকি বড্ড দুর্গা কালী ভক্ত। হাসি পায়, না?মনোজদা খাওয়া দাওয়া ঘুম ভুলে গেল, একটাই লক্ষ্য ওদের শাস্তি দেওয়া। জানো, একদিন মনোজদাও নিখোঁজ হয়ে গেল, আর ম্যাম পড়লেন মারণরোগে, ক্যান্সার। কে যে কাকে দেখে! আমি কিন্তু এতকিছুতেও হাল ছাড়িনি জানো, মামলা তুলিনি। আশ্রমের আরও শুভাকাঙ্ক্ষী যাঁরা ছিলেন আমার, বিয়ে দিতে চাইলেন আমার। হাসি পাচ্ছে, না? সত্যি, এরকম একটা মেয়েকে কে বিয়ে করবে বলো তো? আর আমি মনোজদাকে ভালোবাসি, আর কাউকে যে মানতে পারব না ওর জায়গায়। বছর ঘুরে গেল, মনোজদা ফিরলই না আর। হঠাৎ মর্গে ডাক এল আমাদের, দেহ শনাক্ত করতে হবে। মাথাটা থেঁতলানো, তবুও ডান গালের কাটা চিহ্নটা চোখ এড়ায়নি আমার, গলায় সেই লকেটটা ছিল, যাতে আমার নামের প্রথম অক্ষর লেখা ছিল, সেই এক ডিজাইন। প্রাণহীন দেহটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমি, প্রিয় মানুষটাকে সারাজীবনের মতো হারিয়েছি যে। কেটে গেল আরও অনেকগুলো বছর। মনোজদার মতো আরও একজন যে আমার জীবনে আসবে, কল্পনারও অতীত ছিল। মানুষ নয়, সে ছিল ভগবান আমার কাছে। আমার চিকিৎসার জন্য সে কোথায় না কোথায় ছুটে বেরিয়েছে, মনোজদার মুখটা ভেসে উঠত ওর মুখে। কিন্তু ওর বাবা-মা আর এক বিধবা দিদি ছিল, একদম অন্য মেরুর মানুষ, সহ্যই করতে পারত না আমায়। পাঁকের পদ্ম ছিল আমার স্বামী, কখনো কাছছাড়া করত না আমায়। কিন্তু কতদিন? একদিন অফিসেরই এক কাজে অনেক দূরে যেতে হল ওকে, আর তখনই ওর বাড়ির সবাই বাড়ি থেকে চলে যেতে বলল আমায়, তারা ছেলের আবার বিয়ে দেবে। যথারীতি রাজি হইনি আমি, তাই রাতে যখন আমি ঘুমে অচেতন, তখন ঘটল সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা। কেরোসিন দিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হল আমায়।'
- 'চুপ করো', কানদুটো চেপে ধরলাম আমি, 'আর শুনতে পারছি না!'
- 'দাঁড়াও, এখানেই শেষ নয়। মরে যাওয়ার পর দোষটা কিন্তু এসে পড়ল আমারই ঘাড়ে, হাসি পেল, মৃত মানুষের গায়েও কলঙ্কের দাগ পড়ে! তুমি জিজ্ঞেস করছিলে না আমি কে? আমি কোনো একজন কেউ নই, অনেক অসহায় মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা একত্রিত হয়ে আমার সৃষ্টি। আমি অবিনাশী, কারোর আর একটা আঁচড় কাটার ক্ষমতাও নেই আমার গায়ে। সমস্ত সহায়-সম্বলহীন মেয়ের জোটবদ্ধ রূপ আমি, কোনো একক ভেবে ভুল কোরো না আমায়। তাই তো আমার নির্দিষ্ট কোনো নাম নেই, পরিচয় নেই, পরিবার-পরিজন নেই, ঠিকানা নেই, কিচ্ছু নেই। আমার একটাই পরিচয়, আমি অপ্রতিরোধ্য, বেপরোয়া, সমাজে নিন্দিতা, অপমানিতা, কলঙ্কিনী। সেই প্রাণ সৃষ্টির সময় থেকে আমি আছি, এখনও আছি, ভবিষ্যতেও থাকব। ওহ, এই যা, একটা মস্ত বড়ো ভুল হয়ে গেল। যেখানে ওই 'আমি' বলেছি, ওগুলো সব আমরা হবে, যার মধ্যে অনেকে আছে, অন্তর্ভুক্ত তুমিও। আমার এই কথাগুলোর মধ্যে সমাজের সব মানুষ কমবেশি লুকিয়ে আছে। যাই হোক, আমার অনেক কাজ আছে, আরও তুমি চাই এসব বলার জন্য, আর সময় নেই, এবার যেতে হবে আমায়।'
হঠাৎ কোথায় যেন মিলিয়ে গেল ছায়ামূর্তি। চিৎকার করলাম, 'কোথায় গেলে?'
রাস্তার আবছা আলো, হাওয়া কাঁপিয়ে কোনো এক অস্পষ্ট অজানা জগত থেকে উত্তর ভেসে এল, 'আমি তো সব জায়গায় আছি গো, রাস্তার ধুলোয়, তোমার ক্ষণিকের বিরক্তিতে, সমাজের নিন্দায়, মনোজদের সারা হৃদয় জুড়ে, ডাস্টবিনে, শপিং মলে, বিদেশী মেডিকেল কলেজে, স্বার্থপর মেয়েদের দলে, কোথায় নেই বলোতো?'

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ