আমার বেস্টফ্রেন্ড সুরঞ্জনা আমার হাতটা ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাসটার দিকে। ওর মামণির ডাক যে ও ফেরাতে পারে না। ওকে সুরো বলে ডাকি আমি। আজও ওর আর আমার প্রথম দিনের দেখা হওয়ার কথাটা মনে পড়ে। কলেজের প্রথম দিনে আমি যখন ক্যাম্পাসে ঢুকে ক্লাসরুম খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম, হঠাৎ পিছন থেকে মৃদু কন্ঠে ডাক, 'শুনছেন!'
ফিরে দেখি একটা মেয়ে, আমারই বয়সী হবে। একটু চিন্তান্বিত দেখাচ্ছে, আর ক্লান্তও। আমি বললাম, 'হ্যাঁ বলুন।'
— '৪২এ ঘরটা কোন্ ফ্লোরে বলতে পারবেন?'
আমি নিজেও ওই ঘরটাই খুঁজছিলাম, বুঝলাম এই মেয়েটিও ফার্স্ট ইয়ারেরই হবে, আর আমার মতোই বিরাট বড়ো কলেজ ক্যাম্পাসে ঘর খুঁজে বেরাচ্ছে খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতো। আমি বলতে যাচ্ছিলাম, আমিও ওই ঘরটা খুঁজছি কিন্তু পাচ্ছিনা, হঠাৎই একদিকের দেওয়ালে একটা ম্যাপ চোখে পড়ল, কলেজেরই ম্যাপ সেটা। মেয়েটি দেখলাম এতটাই চিন্তাগ্রস্ত হয়ে আছে যে ম্যাপটা খেয়াল করেনি। আমি মেয়েটার চোখ এড়িয়ে ম্যাপটা চোখ বুলিয়ে নিলাম ভালো করে,বুঝলাম ৪২এ ঘরটা থার্ড ফ্লোরের একদম শেষের আগের ঘর। মুখে একটা বিজ্ঞ ভাব এনে বললাম, 'হ্যাঁ কেন বলতে পারব না? চলুন আমিই নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে।'
যদিও লিফট ছিল আমাদের কলেজে, কিন্তু প্রথম দিনে এমনিই একটু টেনশন ছিল, তাই সিঁড়ির রাস্তাই ধরলাম। সিঁড়িতে উঠতে উঠতে অনেক কথাবার্তা হল আমাদের। জানলাম,মেয়েটার নাম সুরঞ্জনা মিশ্র, এসেছে বাঁকুড়ার এক অখ্যাত গ্রাম থেকে। এই নাকি তার প্রথম কলকাতা আসা। আমি ছোটো থেকে উত্তর কলকাতাতেই বেড়ে উঠেছি, যৌথ পরিবারে। দাদা দিদি ভাই বোনেদের সাথে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ি কলকাতার রাস্তায়, তাই উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার আনাচ কানাচ আমার চেনা। সেই শুনে নিশ্চিন্ত গলায় মেয়েটি বলল, 'কলকাতার রাস্তাঘাট তাহলে আপনার কাছ থেকেই চিনে নেব।'
— 'স্বচ্ছন্দে!' আমি হেসে বলেছিলাম।
তারপর কেটে গেছে বেশ কয়েক বছর। ক্রমে আমাদের মধ্যে সম্বোধনটা 'আপনি' থেকে 'তুমি', 'তুমি' থেকে 'তুই' হয়ে উঠল কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই। ক্রমে এমন হয়ে উঠল, যে দিনে একটিবার কথা না হলে যেন দিনটাই মনমরা মনে হত। বুঝলাম, বেস্টফ্রেন্ড পেয়ে গেছি। অন্যদিকে সেদিনের কলকাতার কিচ্ছুটি না চেনা সুরোও আমার দৌলতে কলকাতার অলিগলি ঠোঁটস্থ করে ফেলেছে।
অবশ্য কলেজে আমাদের এই বন্ধুত্বের সম্পর্ক নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। কারণ আজও সমাজের চোখে দুজন ছেলে মেয়ে কখনোই শুধুমাত্র বেস্টফ্রেন্ড হতে পারে না। আমার বন্ধুরা প্রায়ই আমায় উত্ত্যক্ত করত।কিন্তু একদিন বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। সেদিন কলেজে ছুটির পর আমি আর সুরো একসাথে কলেজ থেকে বেরোচ্ছিলাম। অধিকাংশ দিন আমরা একসাথেই বেরোতাম, সুরো কলেজের সামনের বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস ধরত ওর মেসে যাবে বলে, আর আমি আরও কিছুটা হেঁটে চৌমাথার মোড় থেকে বাস ধরতাম। কখনও কখনও কলেজের গেটের কাছে বসা ফুচকাওয়ালার কাছ থেকে ফুচকাও খেতাম। আমি ফুচকা খেতে তেমন ভালোবাসতাম না, সুরোই জোর করে টেনে নিয়ে যেত আমায়।
সেদিনও যথারীতি সুরোর মাথায় ফুচকার ভূত চাপল, হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ফুচকাওয়ালার কাছে।ও নিজে খেল তিরিশ টাকার, আর আমি দশ টাকার।তারপর ওর বাস এসে গেল, আমায় টাটা করে ও বাসে উঠে পড়ল। আমিও চৌমাথার দিকে হেঁটে যাব, হঠাৎ পিছন থেকে একটা হাসির শব্দ। পিছন ঘুরে দেখি বিকাশ, অবনী আর রাহুল আমার দিকে কেমনভাবে একটা তাকিয়ে আছে আর হাসছে। জিজ্ঞেস করলাম, 'কি হল টা কি তোদের? হাসছিস কেন হ্যা হ্যা করে?'
বিকাশ এগিয়ে এল, বলল, 'তা বস,কতদিন হল চলছে?'
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, 'কি?'
রাহুল আর অবনীরাও এগিয়ে এসেছে ততক্ষণে, 'আর ন্যাকা সাজিস না তো! আমরা কিছু বুঝিনা ভেবেছিস নাকি? সুরঞ্জনার সাথে প্রেমটা কতদিন হল চলছে?'
এমনিতেই সেদিন এ.বি স্যার এক্সট্রা ক্লাস নিয়েছেন, ছুটি হতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে, পেটে যে ছুঁচোটা দৌড়াচ্ছে সুরঞ্জনার দেওয়া ফুচকায় তার কিছুই হয়নি, তার ওপর এদের এরকম ব্যাঁকা ট্যারা কথা শুনে মাথা গরম হয়ে গেল। কোনোরকমে সামলে নিয়ে বললাম, 'আজেবাজে বকিস না, আমায় বাড়ি যেতে দে।'
ওরা তিনজন পথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বিকাশ বলল, 'তোকে আজ সত্যিটা বলতেই হবে। এইভাবে ডুবে ডুবে জল খেলে তো হবে না বস! আজ তোমায় স্বীকার করতেই হবে যে সুরঞ্জনা তোমার গার্লফ্রেন্ড।'
— 'ফালতু ইয়ার্কি আমার ভালো লাগে না। সবাই জানে, যে সুরো আর আমি বেস্টফ্রেন্ড, আর সেটাই সত্যি।'
— 'ও বাবা', রাহুল কপট গাম্ভীর্যের সুরে বলল, 'বেস্টফ্রেন্ড নাকি শুধু!'
অবনী টোন কাটল, 'হুঃ তাই না আরও কিছু! গোটা ক্লাস ওকে সুরঞ্জনা ডাকে, উনি একাই সুরো ডাকেন, সব ছবিতে পোস্টে লাভ রিয়্যাক্টের বন্যা, আর বলে নাকি শুধু বেস্টফ্রেন্ড!'
— 'তাই না তাই!' বিকাশ ফুট কাটল, 'আজ আবার দেখলাম সুরঞ্জনা ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ফুচকা খাওয়াতে! এরপরও বলবি তোরা শুধু বন্ধু!'
আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল এবার। মোবাইলের গ্যালারিটা খুলে একটা ছবি মেলে ধরলাম ওদের চোখের সামনে। ছবিটা দেখে ওরা স্তব্ধ হয়ে গেল, কোনো কথা সরল না ওদের মুখে। ছবিতে সুরো আমায় ভাইফোঁটা দিচ্ছে।
ওদেরকে নিরুত্তর করে দিয়ে আমি বলতে লাগলাম আমার জীবনের সেই ঘটনা, যা সুরো ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু বান্ধব জানে না।
'জানিস, ভেবেছিলাম আমার জীবনের এই ঘটনাটা কোনোদিনও সবার সামনে শেয়ার করব না, কারণ সবাই সবটা শোনার যোগ্য হয় না। কিন্তু আজ তোরা সবাই আমায় খাদের কিনারায় এসে দাঁড় করিয়েছিস, তাই আজ আমায় বলতেই হবে সবটা। জানিস, আমার এক দিদি ছিল, নাম সুলোচনা। বাড়ির সকলে সুলো বলতে ডাকত। আজও সেই দিদির কথা আমার মনে পড়ে। আমার মেজ জ্যেঠুর বড়ো মেয়ে, আমার চেয়ে ছয় সাত বছরের বড়ো ছিল। আমায় বড়ো ভালোবাসত, আজও তার স্নেহের ছোঁয়া আমি অনুভব করি। আমার সেই সুলো দিদি হঠাৎ একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়, আমার তখন বড়োজোর আট বছর বয়স। মনে আছে সবাই যখন খবরটা পেয়ে কপাল চাপড়ে কাঁদছিল, আমি তখন চলে গেলাম চিলেকোঠার ঘরে, কারণ সুলোদিদি মাঝে মাঝেই আমার সাথে লুকোচুরি খেলত, আর ওই ঘরে লুকোতো। আমি চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে সেদিন আনাচে কানাচে সুলোদিদিকে খুঁজেছিলাম, তারপর খুঁজে না পেয়ে চিৎকার করছিলাম পাগলের মতো, 'সুলোদিদি! সুলোদিদি! বেরিয়ে এসো তুমি যেখানেই লুকিয়ে থাকো না কেন! আমি জানি এসব তোমার দুষ্টুমি! বেরিয়ে এস সুলোদিদি, তুমি জানো না তোমার এই ভাইটা তোমায় ছেড়ে এক মুহূর্তও থাকতে পারে না!'
তখন মা এসে আমায় বুকে টেনে নিয়ে বলেছিল, 'তোর সুলোদিদি যেখানে গেছে, সেখান থেকে আর কেউ ফিরে আসে না বাবা!' বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।
মা কে ওইভাবে কাঁদতে আমি আগে কখনো দেখিনি।আমার মেজ জ্যেঠিমা এই ঘটনার পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। আমাদের আনন্দময় বাড়িটা কেমন যেন ফ্যাকাশে আনন্দহীন হয়ে পড়ল তারপর থেকে। সুলোদি চলে যাওয়ার পর থেকে ভাইফোঁটাও বন্ধ হয়ে গেল আমাদের বাড়িতে।'
গলার কাছে যেন কিছু একটা এসে সমানে বিঁধছিল আমার। অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে আমি আবার বলতে শুরু করলাম, 'আস্তে আস্তে আমি বড়ো হয়ে উঠলাম।সুলোদিদির কষ্টটা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে ততদিনে বাড়ির সকলে। শুধু মেজ জ্যেঠিমা আর আমি ছাড়া।এরপর কলেজে এসে ভর্তি হলাম। দেখা হল সুরঞ্জনার সাথে। ওকে প্রথমবার দেখেই এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল আমার। সেই সুলোদির মতো খিলখিলে হাসি, সেই চাহনি, এমনকি সুরঞ্জনা নামটাও অনেকটা সুলোচনার মতোই শুনতে লাগে। তারপর কথায় কথায় একদিন জানতে পারলাম সুরোর জন্মদিন বাইশে মার্চ, সুলোদির জন্মদিনও ছিল তাই। আমি সেদিন সুরোর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদেছিলাম, বলেছিলাম, 'সুলোদি তুই ফিরে এসেছিস!'
সুরো সেদিন কিছু বোঝেনি,ও একটু বিরক্ত হয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলেছিল, 'আঃ রোহিত, কি পাগলামো করছিস!'
সেদিন আমি সবটা বলেছিলাম সুরোকে। সবটা বলার পর আমি ওর হাতদুটো ধরে বলেছিলাম, 'সুরো, আমার সেই হারিয়ে যাওয়া দিদিটা হবি?'
সুরো সেদিন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বলেছিল, 'আচ্ছা বেশ রে পাগলটা, আজ থেকে আমি তোর দিদি কাম বেস্টফ্রেন্ড, ওকে?'
সুরোকে আমাদের বাড়িতেও নিয়ে গেছি অনেকবার।বাড়ির অনেকেই অবাক হয়েছেন ওকে দেখে, সুলোদির সাথে ওর অনেক মিল। দুটো আলাদা মানুষের মধ্যে এত মিল যে কিভাবে সম্ভব, সেটাই সবাই অবাক হয়ে ভাবত। আমার মানসিক ভারসাম্যহীন মেজজ্যেঠিমাও সুরোকে পেয়ে আস্তে আস্তে মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। উনি বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, যে সুরোর মধ্যেই ওঁর হারিয়ে যাওয়া সেই মেয়ে লুকিয়ে আছে। আজ আমার মেজ জ্যেঠিমা অনেকটাই সুস্থ। ভাইফোঁটাও আমাদের বাড়িতে শুরু হয়েছে আবার। সুরো প্রতিবছর আসে আমাদের বাড়িতে ভাইফোঁটা দিতে। আমাকে, আমার দাদাদের, ভাইদের ভাইফোঁটা দেয়।'
এই পর্যন্ত বলে চুপ করলাম আমি। কথা বলার সমস্ত শক্তি হারিয়েছি আমি।
অনেকক্ষণ নিরুত্তর থাকার পর মুখ খুলল বিকাশ, 'রোহিত,ভেরি সরি রে! আমরা না জেনে....'
— 'না রে, এতে তোদের দোষ নেই। সমাজই তোদের এভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। দুজন ছেলে আর মেয়ে রাস্তায় হাত ধরে হাঁটলে, খোশগল্প করলেই তারা প্রেমিক প্রেমিকা, এমনটাই ভাবতে শিখিয়েছে। আর অবনী, লাভ রিয়্যাক্টের কথা বলছিলি না তখন? অবনী তুই তোর বোনের সব ছবিতে পোস্টে লাভ রিয়্যাক্ট দিস না? বল্ দিস না?'
অবনী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ক্লান্ত অবসন্ন আমি আর দাঁড়াতে পারছিলাম না, এগোতে লাগলাম চৌমাথার দিকে। কিন্তু চৌমাথায় এগিয়েই আর এক দফা অবাক আমি। সুরো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
— 'কি রে, তুই বাসে উঠলি যে একটু আগেই, আবার এখানে এলি কিভাবে?'
— 'আরে বাসে উঠেছিলাম তো, তারপরেই হঠাৎ মামণি ফোন করল আমায়, বলল বড্ড মিস করছে আমায়, তাই বাস থেকে নেমে পড়লাম। ভাবলাম তোর সাথেই যাব একসাথে তোদের বাড়ি। মায়ের ডাক কি ফেরানো যায় বল্?'
আমার মেজ জ্যেঠিমাকে সুরো মামণি বলে ডাকে।আমার হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে সুরো বলল, 'কিন্তু তুই এত দেরি করবি জানলে আমি ওয়েট করতামই না তোর জন্য! এখন চল্ তো! ওই দেখ শ্যামবাজার যাওয়ার বাস এসে গেছে।'
আমাকে একরকম টেনে নিয়ে গেল সুরো। আমি অবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে চেয়ে রইলাম। সেই ছোট্টবেলায়, আমি পড়তে বসতে না চাইলে সুলোদিদিও ঠিক এমনিভাবে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত পড়ার ঘরে।
সামনের বটগাছে অন্যদিনের মতো আজও কোকিলটা ডাকছিল, কিন্তু অন্যদিনের চেয়ে আজকে তার কন্ঠস্বর একটু অন্যরকম লাগছিল, একটু বেশিই মিঠে সুর শোনা যাচ্ছিল ওর গলায়।
(সমাপ্ত)
0 মন্তব্যসমূহ