সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ষোড়শ পর্ব
সেদিন কলেজ ছুটির পর কলেজের সামনের কফিশপে বসে আড্ডা দিচ্ছিল বারো মাসে তেরো পার্বণ। সাহসে ভর করে নয়না প্রশ্নটা করেই ফেলল, 'ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড মাটি, একটা কথা আস্ক করব?'
— 'না করবি না!' কপট রাগের সুরে মাটি বলল, 'তুই না আমার বন্ধু? এত ফর্মালিটির কি আছে? যা আস্ক করার কর তো!'
— 'আসলে মাটি তোকে আমি অবিশ্বাস করছি না, কিন্তু....'
— 'আবার ভণিতা? তোকে কিছু আস্ক করতেই হবে না ছাড় তো!'
— 'না না মাটি শোন, আমি বলছি। ওই যে রক্তিম হালদার, তোদের ব্যাচমেট ছিল, সুইসাইড করেছিল....'
— 'ওহো ওই কেস?' মাটি হেসে উঠল, 'এই কথাটা আস্ক করতে এত হেজিজেট করছিলি পাগলি?'
মাটি হাসল ঠিকই, কিন্তু বাকিদের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল নয়নার প্রশ্নে।
— 'হ্যাঁ মানে ওরা বলাবলি করছিল...' আমতা আমতা করতে লাগল নয়না।
— 'জানি। ওরা এটাই বলছিল তো, যে মৃত্তিকা বণিক কালাযাদু জানে, আর সেই যাদুতেই ভোলাভালা রক্তিম হালদারকে এমন ফাঁসান ফাঁসাল যে বেচারা একদম! ওহো, অনেকে তো আবার এটাও বলে যে, রক্তিম হালদার নাকি সুইসাইড করেনি, মৃত্তিকা হালদারই নাকি ওকে খুন করে ঝুলিয়ে দিয়েছে, বাট মাটির মাসি এম.এল.এ, তাই পুলিশ ওকে ছুঁতেও পারেনি! এসবই শুনেছিস তো?'
— 'কিন্তু আমি ওদের কারোর কথাতেই কান দিইনি রে। আমি তোর কাছ থেকে জানতে চাই, কি হয়েছিল রে?'
— 'অদ্ভুত মেয়ে তো তুই!' টেবিল চাপড়ে বলে উঠল লাবণ্য, 'যতই হোক মাটি তো একটা মেয়ে, নিজের অসম্মানের কথা ও নিজে বলতে পারে কখনো? তুই কি বান্ধবী, নাকি কোর্টের ল-ইয়ার যে এত ডিটেলে সবটা আস্ক করছিস?'
— 'সত্যিই! তুইও তো একটা মেয়ে, একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েকে এটা জিজ্ঞেস করছিস যে কিভাবে সে হ্যারাসড হয়েছিল? আশ্চর্য!' বলে উঠল যামিনী।
— 'জাম, লেবু, তোরা আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকিস না বুঝলি!' মৃত্তিকা বলে উঠল, 'এমনভাবে বলছিস যেন তোদের মাটি খুব লজ্জাবতী লতা! তোরা কি ভাবছিস নয়ন এটাও শোনেনি যে আমার আর রক্তিমের ছবিগুলো আমিই কলেজের দেওয়ালে দেওয়ালে টাঙিয়েছিলাম? ও এটাও জানে যে ভয়েস রেকর্ডিংটাও আমিই ভাইরাল করেছিলাম। আর তাছাড়া,' একটু থেমে মৃত্তিকা বলতে লাগল, 'নয়ন এখন আমাদের গ্যাঙেরই অংশ, ওর সবটা জানার রাইট আছে, তাই নেক্সট টাইম ওর সাথে কেউ এরকম বিহেভ করবি না, গট ইট?'
— 'সরি বস।'
— 'শোন্ নয়ন, আমি বলছি সবটা যে কি হয়েছিল। আমরা তখন পড়ি সেকেন্ড ইয়ারে, রক্তিম পড়ত ইংলিশে অনার্স। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টটা যে আমাদের ফিলোসোফি ডিপার্টমেন্টের পাশেই, তা তো তুই জানিসই। তো ওই রক্তিম হালদার শালাটা ওপরে দেখাত ও সুজিকে ভালোবাসে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ছিল পাক্কা নচ্ছার, লম্পট। আমার পেছনে পড়েছিল জানোয়ারটা, প্রত্যেকদিন আজেবাজে মেসেজ, আমার দিকে নোংরা চোখে তাকানো, সবটা মেনে নিয়ে মাথা ঠান্ডা করে ছিলাম আমি, কিন্তু একদিন ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল আমার। একদিন মেসেজে কুপ্রস্তাব দিল আমায়। তখন আমি ঠিক করলাম, এই বিষগাছটা এক্ষুণি না ওপড়ালে এর বিষ আরও অনেককে শেষ করবে।'
— 'সুজাতাদিকে সবটা জানিয়েছিলি?'
— 'না রে, ওকে কিচ্ছু বলিনি আমি, কেন জানিস? ও এতটাই অন্ধের মতো বিশ্বাস করত রক্তিমকে, ওকে যদি মেসেজটা দেখতামও, তাও ও বিশ্বাস করত না আমার কথা, উল্টে রক্তিমকে সবটা বলে দিত, তাতে জানোয়ারটা সাবধান হয়ে যেত। তাই আমরা সবাই বসে একটা প্ল্যান আঁটলাম। সেই মতো ওকে মেসেজে বললাম, আমি ওর কুপ্রস্তাবে রাজি। মেসেজটা দেখেই সাথে সাথে আমায় ফোন করল শালাটা, বলল ফেস্টের দিন রাতে তিনতলার কমন রুমে চলে আসতে।'
— 'কিন্তু মাটি, আমি যেটা ভাবছি, প্লিজ তুই অন্যভাবে নিস্ না কথাটা', মৃত্তিকার হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল নয়না, 'রক্তিম তো কোনো নির্জন জায়গাতেও তোকে ডাকতে পারত, কারণ সেখানে ওর ধরা পড়ার কোনো ভয় ছিল না, তা না করে ও তোকে কলেজের একটা রুমে কেন আসতে বলল, তাও আবার ফেস্টের রাতে যেদিন কলেজ ভর্তি স্টুডেন্ট? এতে তো ওর ধরা পড়ার রিস্ক বেশি ছিল, তাই না?'
— 'ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট!' গর্জে উঠল যামিনী, 'তোর এত বড় সাহস যে মাটির মুখের কথা অবিশ্বাস করছিস? সেদিন যখন তুই ওর কানের দুলটা ফেরত দিতে এলি, আমরা ভাবলাম বাহ্, কি ভালো মেয়ে, এমন মেয়ে তো আজকাল বিরল! কিন্তু না, এখন দেখছি উলুবনে মুক্ত ছড়িয়েছে মাটি!'
— 'একদমই তাই', সুপ্রিয়া বলে উঠল, 'তোর যখন মাটিকে এতই খারাপ মনে হয়, যোগ দিলি কেন আমাদের গ্রুপে? যা না, ওই সুজির চামচে হয়েই থাকগে না!'
— 'থামবি তোরা? আমি না বললাম এইভাবে কেউ ওর সাথে বিহেভ করবি না, মগজে ঢোকেনি কথাটা?' মৃত্তিকা চেঁচিয়ে উঠল, 'আর তাছাড়া ও যদি আমায় সন্দেহই করে থাকে, ভুল কি করেছে? আমি কি সত্যিই খুব বিশ্বাসযোগ্য, ভরসাযোগ্য মানুষ?'
— 'মাটি তুই ভুল বুঝিস না রে, আমি কিন্তু ওইভাবে বলতে চাইনি....'
— 'আরে বাবা, এতো হেজিটেট কেন করছিস তুই? আমি নিজেও জানি, যে আমি একজন নষ্ট মেয়েছেলে, যার না আছে চরিত্রের ঠিক আর না আছে কোনো যোগ্যতা। একমাত্র ওই শশা ছাড়া কলেজে বাকি যত ছেলে আছে, তারা আমায় কি বলে ডাকে জানিস? বারোভাতারি। এরকম একজন মেয়েকে সন্দেহ না করাটাই বরং অস্বাভাবিক, তাই আমি কিচ্ছু মাইন্ড করিনি রে, ইটস ওকে।'
— 'এনাফ ইস এনাফ!' এতক্ষণে মুখ খুলল পম্পা, 'অন্যের গায়ের ময়লা কালি আর কতদিন নিজের গায়ে মেখে ঘুরবি মাটি? আর কেনই বা ঘুরবি?'
— 'পেঁপে, আর কোনো কথা নয়। আমি সব সত্যিটা নয়নকে জানিয়ে দিয়েছি, এরপর আর কোনো কথাই বাকি থাকে না।'
— 'না মাটি, তুই আজ কোনো সত্যি বলিসনি, ডাহা মিথ্যে বলেছিস তুই, সত্যিটা আমি তোকে বলছি নয়ন, শোন্।'
— 'পেঁপে, তুই যদি মুখে কুলুপ না আঁটিস তাহলে কিন্তু তোর মুখটা সেলাই করে দেব আমি।'
— 'না মাটি, এতদিন বকে ধমকে চুপ করিয়ে দিয়েছিস অনেক, আজ নয়, আজ তোর কোনো বারণই আমি আর শুনব না। শোন নয়ন, সত্যিটা শোন।'
টেবিল জুড়ে নিস্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল। পম্পা বলতে লাগল, 'আমি আর ওই রক্তিম সেম ডেপ্টে পড়তাম। এমন শান্তশিষ্ট ভালোমানুষির মুখোশ পরে থাকত ও যে বাইরে থেকে দেখে যে কেউ ভাববে আহা এ ছেলে তো ভাজা মাছটাই উল্টে খেতে জানে না। আমিও ওকে এরকমটাই ভাবতাম, ওর সাথে ভালো বন্ধুত্ব ছিল আমার। একদিন ও আমায় মেসেজে বলল আমি যেন ওর বাড়ি চলে যাই, কারণ আস্ক করলে বলে সামনেই মিড্ টার্ম, তাই গ্রুপস্টাডির জন্য ডাকছে, বলল আমি ছাড়াও নাকি আমাদের আরও কিছু ক্লাসমেটকে ও ডেকেছে। আমি এককথায় রাজি হয়ে গেলাম ওর বাড়িতে যেতে।'
(ক্রমশ)
0 মন্তব্যসমূহ