মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
পঞ্চদশ পর্ব
— 'আরে না রে, স্যার আমায় ওনার বাড়িতে ডেকেছেন!'
— 'বিয়ের পাকা কথা বলতে?' মুচকি হাসে মাটি।
— 'হ্যাট! সামনে একটা ক্লাসটেস্ট আছে আমাদের, তাই পড়ার ব্যাপারেই ডেকেছেন আর কি!'
— 'তা তোকে একা ডেকেছেন নাকি আর কাউকে ডেকেছেন?'
— 'আমাকে, আমাদের ব্যাচের সেকেন্ড স্টুডেন্ট পল্লবকে আর থার্ড স্টুডেন্ট মাসুমকে।'
— 'ওহো, দারুণ দারুণ! যা, হবু স্বশুরবাড়িটা ভালো ভাবে দেখে আয়, আফটার অল ওখানেই তো পার্মানেন্টলি থাকতে হবে কদিন পর!'
— 'ধুস! চল বাই, রাখলাম আমি।'
আম্রপালি ফোনটা রেখে দিল, আর এদিকে সবার মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল।
— 'একটা গান মনে পড়ছে জানিস মাটি এই আমের কথা শুনে।' তিতলি হেসে বলল, 'ছোটবেলায় খুব গাইতাম গানটা।'
— 'কি গান?'
— 'ডেকেছেন প্রিয়তম।' সুর করে গাইল তিতলি।
সবাই হাসল, নয়নাও যোগ দিল হাসিতে, কিন্তু ওর মনটা খচখচ করতে লাগল। ও ভেবেছিল আজই রক্তিম হালদারের ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করবে মৃত্তিকাকে, কিন্তু এই হাসি আনন্দের মাঝে আর বলা হল না কথাটা ওর।
পরেরদিন সকালে নয়নাসহ বাকি 'বারো মাসে তেরো পার্বণ'-এর মেম্বাররা এসে দেখে, মৃত্তিকা মুখ ভার করে বসে আছে।
— 'কি রে মাটি, তোর আবার হল কি?'
— 'আমার কিছুই হয়নি রে। বেচারা আমটার খুব মন খারাপ!'
— 'সে কি? কেন?'
— 'আরে গতকাল তো অগ্নিস্যার ওকে নিজের বাড়িতে ডেকেছিলেন, আমও খুব আনন্দের চোটে নাচতে নাচতে গেল ওনার বাড়ি। কিন্তু তারপরেই বেচারার মনটা ভেঙে যায় একদম। স্যার যখন পড়াচ্ছিলেন ওদের, ও দেখতে পায় স্যারের মোবাইলের ওয়ালপেপারটা। কি ছিল জানিস ওয়ালপেপারে? এক সুন্দরী অবিবাহিতা যুবতীর ছবি।'
— 'এ মা, সে কি রে? উনি কি...'
— 'হ্যাঁ রে, আম বেচারাও সেটাই বলল। ও এতদিন ভাবত স্যার সিঙ্গেল, কিন্তু না, ওনার তো গার্লফ্রেন্ড আছে!'
— 'কিন্তু মাটি, তোরা নেগেটিভটাই ভাবছিস কেন সবাই? হতেও তো পারে মেয়েটি স্যারের ভালো বন্ধু শুধু।'
— 'দেখছিস মাটি, আদাটা আবার কেমন আলফাল বকতে লেগেছে! এই গাধা আদা, ভালো বন্ধু হলে তার ছবি কেউ মোবাইলের ওয়ালপেপার বানায়? এরকম উদ্ভট কান্ড করতে দেখেছিস কখনো কাউকে?'
— 'এই কাঁচকলা, তোর মুখ বন্ধ রাখ তো!'
— 'হুম, তুইও তোর মুখ বন্ধ রাখ!'
— 'আমি একটা কথা বলব মাটি?' নয়না মুখ খুলল এতক্ষণে।
— 'হ্যাঁ বল না!'
— 'দেখ আমার মনে হয়, আম যখন অগ্নিস্যারকে ভালোবাসে, ওর এবার স্যারকে সবটা জানিয়ে দেওয়া উচিত, আর তার আগে এটাও খোলাখুলি আস্ক করা উচিত যে ছবির ওই মহিলা কে!'
— 'কি বলছিস নয়ন! খেপেছিস নাকি?' সুপ্রিয়া বলল।
— 'খেপবে কেন? ও তো ঠিকই বলছে! সারাজীবন মনে মনে চুপচাপ ভালোবেসে যাবে আম, পরে দেখবি অন্য কোনো চিল এসে ছোঁ মেরে নিয়ে চলে গেছে ওর অগ্নিস্যারকে! তাই জানাতে তো এবার হবেই!' মাটি বলল।
— 'তাহলে এখন উপায়?'
— 'উপায় আর কি! ওই ছবির মেয়েটা কে সেটাই জানতে হবে আমাদের আগে!'
— 'কিন্তু আম যা ভীতু, আস্ক করতে পারবে ও? সেই দম ওর আছে?'
— 'তা বললে তো হবে না বস, ভালো যখন বেসেছে তখন সাহসী তো হতেই হবে, নইলে চলবে কি করে?'
— 'তাও ঠিক!'
— 'ভাবিস না, ওই ভীতুটাকে ঠিক বুঝিয়ে সুঝিয়ে আমি রাজি করাবই, আর আমাদের আমের বিয়ে ওই অগ্নিস্যারের সাথেই হবে, যদি না হয় তো আমার নামও মৃত্তিকা বণিক নয়!'
— 'একদম বস! আমাদের এখন মিশন আম এবং অগ্নি স্যারের বিয়ে।'
ওই সময়েই দুহিতা সিঁড়ি দিয়ে তিনতলা থেকে দোতলায় নামছিল। সিঁড়িতে যে জল পড়ে ছিল সেটা ও খেয়াল করেনি, জলে পা দিয়েই স্লিপ খেয়ে ও পড়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ শশধর এসে ওকে ধরল, দুহিতা এসে পড়ল ওর বুকে।
— 'চোখ বন্ধ করে হাটঁছিলি নাকি তুই? ভাগ্যিস আমি এসে পড়েছিলাম, নইলে পড়ে গিয়ে তো হাত পা ভাঙতিস।'
দুহিতা নিজেকে সামলে নিল, তারপরেই রাগী গলায় উত্তর দিল, 'আমার যা হত হত, তাতে তোমার কি? তোমায় কে আগ বাড়িয়ে আমায় বাঁচাতে আসতে বলেছিল শুনি?'
— 'অদ্ভুত মেয়ে তো তুই! বাঁচালাম, কোথায় থ্যাঙ্কস বলবি তা না....'
— 'ও, এইবার বুঝেছি তোমার আসল মতলব। সুন্দরী মেয়েদের কাছে থ্যাঙ্কস পাওয়ার জন্যই এসব করে থাকো তুমি, তাই তো?'
বারো মাসে তেরো পার্বণ গ্যাং তখন আম্রপালি আর অগ্নি স্যারকে নিয়ে আলোচনা করছিল, হঠাৎ ওদের কানে এল দোতলার দিক থেকে একটা ঝগড়ার আওয়াজ।
— 'শশার গলা না?'
— 'হ্যাঁ রে, চল তো দেখি!'
আম্রপালিও তখন সেদিকেই আসছিল, ঝগড়ার শব্দ শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল ও।
— 'তোর মতো ঝগড়ুটের কাছ থেকে যে এসব ম্যানার্স আশা করা ভুল সেটা আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। এরপর যদি দেখি তুই পুকুরে পড়ে যাচ্ছিস তাও তোকে বাঁচাতে আসব না দেখে নিস্।' শশধর বলে উঠল।
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি তো সেই আশাতেই সবসময় বসে থাকি না যে কখন তুমি বডিগার্ড হয়ে আমায় বাঁচাতে আসবে! তোমাকে কে বলেছে আমার লাইফ জ্যাকেট হতে? আমি কোনো জন্মে বলেছি বলে তো মনে পড়ে না!'
— 'ওরে ব্বাবা, এ মেয়ে না চায়ের দোকানে ঝগড়া করা বুড়ো! মুখে তো কথার খই ফুটছে!' বলে উঠল এলোকেশী।
— 'তাই না তাই! শশাকে ভালো মানুষ পেয়ে খুব তড়পাচ্ছিস না?' আম্রপালি বলল, 'সিনিয়রদের রেস্পেক্টটুকুও করতে শিখিস নি!'
— 'কোত্থেকে আর শিখবে আম বল! ও হল আমাদের প্রতিবাদী দিদি, উনি কি আর কলেজ পড়তে এসেছেন? এসেছেন সমাজসংস্কারক হয়ে আমাদের মতো পাপীদের শুদ্ধিকরণ করতে!' বাঁকা হাসল মৃত্তিকা।
— 'আধুনিককালের মাদার টেরেসা!' ফুট কাটল তিতলি।
— 'ভগিনী নিবেদিতাও বলতে পারিস!' মালবিকা বলে উঠল।
— 'আগেরদিন শশাকে বলেছিলাম তোকে কোলে করে ক্লাসরুমে পৌঁছে দিতে, বেশি বেগরবাই করলে শশাকে বলব তোকে কোলে করে গোটা শহর ঘুরতে, সেটা ভালো হবে তো সোনা?' বাঁকা হাসল মৃত্তিকা।
একেই গোটা দলটাকে আসতে দেখে ভড়কে গিয়েছিল দুহিতা, এখন সবার সমবেত আক্রমণে কোনঠাসা হয়ে গেল ও। শশধরের দিকে কটমট করে তাকিয়ে চুপচাপ সরে পড়ল ও। ভাবখানা এই, তোমাকে দেখে নেব আমি!
(ক্রমশ)
0 মন্তব্যসমূহ