Advertisement

মাটি (ষষ্ঠ পর্ব)

মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 
ষষ্ঠ পর্ব


মৃত্তিকার বাঘিনীর গর্জন শুনে হুঁশ ফিরল নয়নার, আর বাকি ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্টদের সাথে ভেজিটেবল গ্যাঙের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও। 
— 'ব্যস, এবার তোরা শেষ।' মিনমিন করল দ্বিতীয় বর্ষের স্টুডেন্টরা। 

প্রথমেই একটা ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেকে ডাকল মৃত্তিকা, 'এই ছেলে, তোর নাম?' 
ছেলেটি কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, 'ঋষভ বিশ্বাস।' 
— 'আচ্ছা বেশ, ভালো। শোন ঋষভ, এই কাগজটা নে, দিয়ে আয় তোদের ক্লাসটিচারকে।' বলেই একটা কাগজ দিল ও ঋষভের হাতে। 
— 'ক-কি এটা?' 
— 'কি আবার? লাভ লেটার! মহিমা ম্যামকে তুই কত্তটা ভালোবাসিস, সেটাই এখানে লেখা আছে। যা যা নিয়ে যা।' 
— 'এরকম কোরো না দিদি, আমায় রাস্টিকেট করে দেবে!' 
— 'আহা রে আমার সোনা পুচু টা! আর না দিলে যে আমি তোমায় ক্লাসের দিকে যেতেই দেব না! ক্লাস না করলে বুঝি তুমি রাস্টিকেট হবে না?' 
এবার ঋষভ কেঁদে পড়ল মৃত্তিকার পায়ে, 'প্লিজ দিদি, এরকম কোরো না! আমার বাবা খুব গরিব, জমিজমা বন্ধক রেখে আমার পড়ার খরচ চালায় বাবা। আমায় যদি কলেজ থেকে তাড়িয়ে দেয়....'
— 'থাক থাক, আর ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করতে হবে না। শোন্, ওই যে দেখছিস বাইকের কাছে দাদা আর দিদি প্রেমালাপ, ইয়ে মানে গল্প করছে, ওই দিদিকে গিয়ে এই কাগজটা দিয়ে আয়, আর বল, আই লাভ ইউ সুজি!' 
— 'হেই মাটি, তুই তো ওকে সহজ টাস্ক দিয়ে দিলি! এবার তো সবাই বলবে আমার অমুক সমস্যা, তমুক সমস্যা, সবাইকেই কনসিডার করবি নাকি তুই?' পাশ থেকে ফুট কাটল যামিনী। 
— 'কে বলল সহজ টাস্ক? প্রথম টাস্ক ছিল আগুনে ঝাঁপ দেওয়া, আর দ্বিতীয় টাস্ক জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হাঁটা, এই যা তফাৎ। তা ও বাছাধন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা কি গিলছো? যাও, যেটা বললাম সেটা করো!' 
ঋষভ ইতস্তত করে এগিয়ে গেল গেটের দিকে। সুজাতা আর তার বয়ফ্রেন্ড রাজীব খোশগল্প করছিল, সেখানে কাঁপা কাঁপা পায়ে গিয়ে দাঁড়াল ঋষভ। ওকে দেখেই রাজীব ভ্রু কুঁচকে তাকাল, 'এখানে কি চাই?' 
মৃত্তিকাসহ গোটা ভেজিটেবল গ্যাং মজা দেখতে লাগল হাসি চেপে। 
— 'না মানে আমার দিদির সাথে একটু কথা ছিল।' ভীতকণ্ঠে বলল ঋষভ। 
— 'হুমম বল, আমি শুনছি।' সুজাতা বলল। 
মনে মনে সাহস সঞ্চয় করে ঋষভ চোখ বন্ধ করে কাগজটা সুজাতার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'সুজি, আই লাভ ইউ।'
মুহূর্তে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল রাজীব, ঋষভের জামার কলারটা চেপে ধরল সজোরে, 'শালা! তোর সাহস তো মন্দ না! তুই জানিস সুজি আমার গার্ল? ওর দিকে তাকালে না হৃদপিন্ড উপরে নেব জানোয়ার ছেলে!' 
— 'আহ রাজ, ছাড় ওকে, ছাড় বলছি!' কোনোক্রমে রাজীবকে ছাড়াল ও, 'জানিস না এসব কার কাজ? এ দুদিনের ছেলে, সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে, এখনও নাক টিপলে দুধ বেরোয়, এই ছেলে কিনা প্রপোজ করবে আমাকে? এসব ওই স্ল্যাটটার কাজ!' 
রাজীব রেগে চলে গেল সেখান থেকে। মৃত্তিকার দিকে কটমট করে তাকিয়ে সুজাতাও চলে গেল রাজীবের সাথে। 
ঋষভ তখন ঠকঠক করে কাঁপছিল ভয়ে। ওকে ডেকে মৃত্তিকা বলল, 'তোর টাস্ক কমপ্লিট। যা ক্লাসে যা।' 
— 'মানুষ যে কত বেইমান হয় তা এই সুজিকে না দেখলে জানতামই না রে মাটি।' পম্পা বলল, 'কোথায় তোর কাছে গ্রেটফুল থাকবে ও, তা না দিনরাত গালিগালাজ করছে!' 
— 'ছেড়ে দে পেঁপে, আমি যা করেছিলাম তোর জন্য করেছিলাম, ওই সুজি শালীর কাছে মহীয়সী সাজব বলে না।' মাটি বলল, 'কই রে, নেক্সট কে আছিস, সামনে আয়।'
এরপর ফার্স্ট ইয়ারের একটা মেয়ে মৃত্তিকার সামনে এসে দাঁড়াল। 
— 'নাম কি?' 
— 'দুহিতা রায়।'
— 'ডিপার্টমেন্ট?'
— 'মাইক্রোবায়োলজি।'
— 'অ, তা ভালো। তা দুহিতা, তোদের ডিপার্টমেন্টে একজন হেব্বি হ্যান্ডু স্যার আছেন বুঝলি, অগ্নি স্যার। ওই স্যারের ওপর এই শালী আম্রপালি বহুতকাল ধরে ক্রাশ খেয়ে আছে, ওরও সেম ডিপার্টমেন্ট কিনা! কিন্তু আজ অব্দি লজ্জার মাথা খেয়ে কিছুই বলতে পারল না গরুটা। তা সোনামণি, তুমি এট্টু ঘটকগিরিটা করে দিতে পারবে?' 
— 'মানে? কি বলব আমি স্যারকে?' 
— 'কি আবার বলবি? যা সত্যি তাই বলবি, বলবি আমাদের ডেপ্টে একটা ন্যাকা আনস্মার্ট দিদি আছে, আপনাকে দেখলেই যার গালদুটো এক্কেবারে পাকা টুসটুসে হিমসাগর আমের মতো লাল হয়ে যায়। তা আপনি যদি কৃপা করে আম্রমুকুল বিকশিত হওয়ার মাসে, আই মিন ফাগুন মাসে লাল আবিরের সাথে সিঁদুর মিশিয়ে ওই বোকাহাবা দিদিটার সিঁথিতে পরিয়ে দেন....'
— 'এই মাটি, এসব কি হচ্ছে কি? জুনিয়রদের সামনে আর আমার মানসম্মান রইল না সত্যি!' আম্রপালি বলে উঠল। 
— 'যা বাবা, তোর ভালোর জন্যই তো সবটা করছি নাকি! এই জন্য বলে লোকের ভালো করতে নেই!' 
গোটা গ্যাংটাই হেসে উঠল। কিছু প্রথম বর্ষের স্টুডেন্টও যোগ দিল হাসিতে। 
— 'এই ফার্স্ট ইয়ার, তোরা কেন হাসছিস বে? এমন টাস্ক দেব না, দেখবি কেঁদে কূল পাবি না!' দুহিতার দিকে ফিরে মাটি বলল, 'কি হল, তুই আবার ঠুঁটো জগন্নাথের মতো দাঁড়িয়ে রইলি কেন? অগ্নি স্যার আজ এসেছেন দেখেছি, এক্ষুনি গিয়ে ওনাকে সবটা বল!'
— 'আর শোন, তুই সত্যি স্যারকে বলছিস নাকি জাস্ট ডেপ্ট থেকে ঘুরে চলে আসছিস আমাদের বোকা বানানোর জন্য, তার জন্য আমি যাব তোর সাথে, চল।' বলল মালবিকা।
— 'সরি দিদি, বাট তোমাদের কথা আমি মানতে পারব না।' দৃঢ়কণ্ঠে বলল দুহিতা, 'র‍্যাগিং যে এখন নিষিদ্ধ সেটা বোধ হয় তোমরা জানো না। আর স্যারকে কিছু বলার হলে তোমরাই গিয়ে বলো।'
— 'কেন রে লজ্জাবতী লতা, তুইও ক্রাশ খেয়েছিস নাকি অগ্নি স্যারের ওপর? তাই যেতে লজ্জা পাচ্ছিস বুঝি?' টোন কাটল এলোকেশী।
— 'দেখো তোমরা যতই লেগপুল করো, কিন্তু তোমাদের খুশির জন্য আমার কেরিয়ার জলাঞ্জলি দিতে পারব না। আমি ক্লাসে চললাম, টা টা।' 

দুহিতা রাগ দেখিয়ে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু ওর পথ আটকে দাঁড়াল নৃত্যকলা, যামিনী, মালবিকা আর এলোকেশী। 
— 'বাব্বা মাটি, এ মেয়ের তো দেখছি খুব চোপা! তোর মুখের ওপর কথা বলছে!' দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল আদরিণী।
— 'কেন? মৃত্তিকাদিও তো আমার মতোই কলেজের একজন স্টুডেন্ট, ওকে কিছু বলা যাবে না কেন?' 

ফার্স্ট ইয়ারের অন্যান্য স্টুডেন্টরা ভড়কে গেল দুহিতাকে দেখে। বাব্বা, এ তো ডাকাত মেয়ে! মাটির মুখের ওপর না বলে! 

(ক্রমশ) 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ