সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
পঞ্চম পর্ব
— 'চ বড়দি, আমার ঘরে বসবি চ। তোর ফেভারিট আইসক্রিমটাও আনিয়ে রেখেছি।'
ওদের কথোপকথন শুনে ইন্দিরা রাগী গলায় বললেন, 'ওই এলেন দিদির ন্যাওটা ভাই! বাইরে থেকে এল, সে ফ্রেশ হবে তা না, আইসক্রিম খাবে আর গালগপ্পো বলবে! যত্তসব!'
ইন্দিরার গলা শুনে মেজাজটা বিগড়ে গেল মৃত্তিকার। ও তমালকে বলল, 'ছেড়ে দে তমু, আইসক্রিম টিম আমার চাই না, ওসব বাড়ির কর্ত্রীকে দে গে যা!' বলেই পিঠের ব্যাগটা মাটিতে ছুড়ে ফেলে ও ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই হঠাৎ গা টা গুলিয়ে উঠল মৃত্তিকার। বেসিনে গিয়ে হড়হড়িয়ে বমি করল ও।
— 'সকাল সকাল ছাইপাশ গিলে এসেছে, সেগুলোই উগরোচ্ছে এখন! ছি!' ইন্দিরা ভ্রূ কুঁচকোলেন।
— 'দেখছ মেয়েটার শরীর খারাপ, এখনো তেতো কথাগুলো না শোনালেই শান্তি হচ্ছে না তোমার!'
— 'এই তোমার প্রশ্রয়েই দিন দিন বেয়াদব তৈরি হচ্ছে ও অরুণ। বেশ, তোলো মাথায়, যেদিন ওর জন্যই তোমার মাথাটা কাটা যাবে সেদিন বুঝবে, আমি কেন ওকে উঠতে বসতে ওকে শক্ত কথাগুলো বলি!'
— 'আমার কিন্তু অন্য কিছু মনে হচ্ছে মা ঠাকরুণ!' নিচুগলায় ফুট কাটল বিমলার মা।
— 'তোমার আবার কি মনে হচ্ছে শুনি!'
— 'আরে বাবা, আমি ওই সিনেমা টিনেমায় দেখেছি, মেয়েমানুষেরা ইয়ে মানে....'
— 'কি ইয়ে ইয়ে করছ? যা বলার সোজাসাপ্টা বলো, নইলে নিজের কাজে যাও, আমার মাথা খেও না।'
— 'আরে বাবা, মেয়েমানুষেরা কখন বমি করে জানেন না? পোয়াতি টোয়াতি হলে.....'
ইন্দিরা এসব অযৌক্তিক কথায় বিরক্ত হয়ে ওকে থামাতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ সেখানে হাজির মৃত্তিকা, 'বলি ও বিমলার মা, এত বড় গাইনোকোলজিস্টটা হলে কবে?'
বিমলার মা মৃত্তিকাকে দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। মৃত্তিকা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল ওর দিকে, বাঁকা হেসে নিচু গলায় বলল, 'কিন্তু আমার যে অনেকগুলো বয়ফ্রেন্ড মাসি! বয়ফ্রেন্ড মানে বোঝো তো? তোমাদের ভাষায় যাকে বলে ভাতার। আর লোকে আমায় ভালোবেসে বলে বারোভাতারি। তা ও মাসি, এতই যখন বোঝো, তাহলে এটাও বলে দাও না গো যে ওদের মধ্যে কে আমার হবু বাচ্চার বাবা?'
বিমলার মা কিছু না বলে পড়ি কি মরি পালিয়ে গেল সেখান থেকে।
— 'ছি ছি ছি, কি ভাষা মুখে! কোনো ভদ্রবাড়ির ছেলেমেয়ে এরকম কথা মুখে আনে?'
— 'এই যে মিসেস ইন্দিরা শিকদার, আমায় কিছু বলার আগে নিজের পোষা নেড়ি কুত্তোদের সামলাও।'
— 'শোনো মাটি, লোককে যদি তুমি বলার সুযোগ করে দাও, তারা তো বলবেই! কই, এবাড়িতে আরও তো একটা মেয়ে আছে, তাকে নিয়ে তো কেউ এরকম কমেন্ট করার সাহস পায় না!'
— 'সাহস? হেঃ, আমার হাতের তালুদুটো দেখেছ মিসেস শিকদার? আর পাঁচটা কুড়ি বছরের মেয়ের মতো নরম গোলাপের পাপড়ি না, ছোট থেকে নোংরা, কাদা, রক্ত এসব মেখে মেখে হাতগুলো ছেলেদের চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে, যেন কাঠের পুতুলের হাত! তা এই হাতদুটো দিয়ে যদি ওই বিমলার মার নরম গলাটা চেপে ধরি, প্রাণপাখি বেরোতে কতক্ষণ লাগবে, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ?'
রাগে গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেল মৃত্তিকা ইন্দিরার ঘর থেকে।
— 'দিদি, জামাইবাবু কেউই এমন ছিল না, এ মেয়ে যে কেন এমন সৃষ্টিছাড়া হল, ভগবান জানেন!' নিজের মনে বিড়বিড় করে ইন্দিরা স্নানে গেলেন। ওঁকে কাজে বেরোতে হবে।
মৃত্তিকা নিজের ঘরে এসে বসতেই তমাল আইসক্রিম এনে ধরল ওর সামনে, 'নিশ্চয়ই আজ সকাল থেকে খাসনি কিছু, তাই পিত্তি বমি হল। নে, ঠান্ডা মুখে দে, পেট মাথা দুটোই ঠান্ডা হবে, নে তো।'
ব্যাজার মুখে আইসক্রিমটা নিল মৃত্তিকা।
— 'কি রে, কেমন ঘুরলি ওখানে, বল্!'
— 'ধ্যার ছাড়। এখন মুড নেই।'
মৃত্তিকা আইসক্রিম খাচ্ছিল বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে আর তমাল ওর রাগ ভাঙাবার চেষ্টা করছিল, হঠাৎ ঘরে রেণুকার প্রবেশ।
— 'কি ব্যাপার রে রেণু? হঠাৎ আমার ঘরে? রাস্তা ভুল করে নাকি!' ব্যঙ্গের সুরে বলল মৃত্তিকা।
— 'দিদিভাই, তুই তো ভালো ড্রয়িং পারিস, আমার জিওগ্রাফি প্র্যাকটিক্যালের কয়েকটা ছবি একটু এঁকে দে না প্লিজ!'
— 'তাই তো ভাবি ছোড়দি! দরকার ছাড়া আবার বড়দিকে চিনিস নাকি তুই?'
— 'এই তমু, তুই ছোট আছিস ছোটর মত থাক। একদম বড়দের ব্যাপারে ইন্টারফেয়ার করবি না!'
— 'তমু, মাথা গরম করিস না বেকার, ছেড়ে দে। রেণু, তোর প্র্যাকটিক্যাল খাতাটা রেখে যা, সন্ধ্যেবেলায় নিয়ে যাবি।'
— 'থ্যাংক ইউ সো মাচ রে দিদিভাই!' হাসিমুখে রেণুকা বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
— 'সত্যি মাইরি, ছোড়দি আর মা জিনিস বটে!'
— 'চুপ চুপ তমু! এক্ষুণি তোর মাতৃদেবী শুনতে পেয়ে গেলেই বিপদ!'
হাসতে থাকে তমাল আর মৃত্তিকা।
সেদিন নয়না মনে কিছুটা ভয় নিয়েই কলেজ ক্যাম্পাসের দিকে গেল। কে জানে ভেজিটেবল গ্যাং কি কান্ড ঘটাবে!
ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকতেই দেখে, ক্যাম্পাসের মধ্যভাগ আলো করে বারোটা চেয়ারে বসে আছে বারোজন, আর সকলের মধ্যমণি হয়ে বসে আছে মৃত্তিকা। সত্যিই সুজাতা কিছু ভুল বলেনি। এ যেন এক রাজদরবার, আর মৃত্তিকা যেন এ রাজদরবারের রাণী! ওর আদেশ ছাড়া মানুষ তো দূর, গাছের পাতাটাও বুঝি ঝরে পড়বে না।
এসব সাতপাঁচ ভাবছিল নয়না, হঠাৎ তীব্র নারীকন্ঠে চমক ভাঙল ওর। ও শুনল মৃত্তিকা চেঁচিয়ে প্রশ্ন করছে, 'ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট কে কে আছিস? সামনে আয়।'
এতক্ষণে মৃত্তিকাকে ভালোভাবে দেখল নয়না। এতদিন পর্যন্ত মৃত্তিকার স্বভাবের যে বর্ণনা ও শুনেছিল, তাতে ও নিজের মনে মৃত্তিকার এক কাল্পনিক চেহারা কল্পনা করে নিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবের মাটিকে দেখে সে ভাবনা মাটিতে আছাড় খেয়ে খানখান হয়ে গেল। কি অপূর্ব অসামান্য রূপ মৃত্তিকা বণিকের! লালচে কালো কোঁকড়ানো চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমেছে, ঠোঁট দুখানিতে হালকা পিঙ্ক লিপস্টিক, আর সেই সাথে কাজলকালো টানা দুখানি বড় বড় চোখ। এতদিন সুন্দর কাজলকালো চোখের জন্য যে পরিমাণ সম্মান আর প্রশংসা পেয়ে এসেছে নয়না, তার সবটুকু এই সুন্দরীকে উজাড় করে দিয়ে দিতে ইচ্ছে হল ওর। মনে মনে হাসল, 'সুমি, তুই আমায় কাজলনয়না হরিণী বলিস না? একবার দেখে যা মৃত্তিকা বণিককে।' নারীদেহে এত রূপও সম্ভব? সকলে এই মেয়েকে বলে অলক্ষ্মী, অথচ রূপে যে এ মেয়ে একেবারে লক্ষ্মী!
(ক্রমশ)
(ষষ্ঠ পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে)
0 মন্তব্যসমূহ