মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুর্থ পর্ব
ভেজিটেবল গ্যাঙের আবির্ভাব
— 'কি হল সুজাতাদি?' নয়না ঝাঁকুনি দিল ওকে, 'কি ভাবছ এত?'
— 'ওই ভেজিটেবল গ্যাঙের থেকে দূরে থাকিস রে, বিশেষ করে ওই মাটির থেকে। ও আমার কাছ থেকে একসময় সব কেড়ে নিয়েছিল রে।' দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুজাতা বলল, 'গভীর জলের মাছ ওই মাটি। শুনেছি, ওর যখন আড়াই বছর বয়স, তখন নাকি ওর বাপ মা পটল তোলে। সেজন্য ওর পরিবারের লোকেরাই নাকি ওকে ডাইনি, অপয়া এসব বলে।'
— 'না গো সুজাতাদি, মৃত্তিকা বণিক মানুষটি যতই খারাপ হোক, তা বলে ওর মা বাবার মৃত্যুর জন্য ওকে দোষারোপ করা উচিত না, কোনো সন্তানই তার মা বাবাকে হারাতে চায় না, তা সে যতই কুসন্তান হোক।'
— 'কি উচিত নয়, আর কি যে উচিত, সেটা আর কে ঠিক জানে এই দুনিয়ায়? হয়ত বা ওপরওয়ালা জানে। যাক গে, বাদ দে, তুই যেন কি জানতে চাইছিলি তখন?'
— 'ভেজিটেবল গ্যাঙের মেম্বারদের নাম।'
— 'ও হ্যাঁ হ্যাঁ, শোন। আম হল আম্রপালি, জাম হল যামিনী, কলা হল নৃত্যকলা, পেঁপে হল পম্পা,আলু হল এলোকেশী, তেঁতুল হল তিতলি, লেবু হল লাবণ্য, মুলো হল মালবিকা, আদা হল আদরিনী, শশা হল শশধর আর স্যুপ হল সুপ্রিয়া। আর এঁদের হেড হলেন....'
— 'মিস মৃত্তিকা। তা তুমি যে বললে গ্রুপে নাকি সবাই মেয়ে? তাহলে শশধর.... '
— 'আরে দূর দূর! ওটাকে এই কলেজে কেউ ছেলে বলে মানেই না! যে এগারোটা গার্লের লেজ ধরে ঘোরে কাপুরুষের মতো, তাকে আবার পুরুষমানুষ বলা যায় নাকি? তাই ওকেও সবাই মেয়েছেলেই মনে করে একরকম।'
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নয়না বলে, 'বুঝলাম!'
— 'কত যে বুঝেছিস তা আর বুঝতে আমার বাকি নেই নমিতা!'
— 'আবার নমিতা!'
— 'ধুর গাধী, একই হল। শোন্, মনে রাখবি, আমি তুই যতই ওদের পছন্দ না করি, সেই ভাবটা একদমই ওদের সামনে দেখানো যাবে না, কি বুঝলি? দেখালেই একদম শেষ!'
— 'তাহলেই কলেজের প্রত্যেকটা দিন হয়ে উঠবে কন্টকশয্যা, তাই তো?'
— 'ধ্যার, অত কঠিন কথাবার্তা আমার আসে না। মোট কথা, যেগুলো বললাম, ওগুলো তোর মোটা মাথায় ঢুকিয়ে নে, নইলে কিন্তু....'
কথা শেষ হওয়ার আগেই সুজাতার ফোন বেজে উঠল।
— 'তাই তো ভাবি! এত রাতে গাধাটা ছাড়া আর কেই বা মিস করবে আমায়!' জ্বলন্ত সিগারেটটা ফেলে মাড়িয়ে ছাদে চলে গেল ও মোবাইল কানে। আর নয়না ভেজিটেবল গ্যাঙের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমের দেশে পাড়ি দিল অজান্তেই।
পরেরদিন ঘুম ভেঙে নয়না দেখে, হোস্টেলে কেমন একটা থমথমে ভাব, যেন ঝড়ের পূর্বমুহূর্ত। একটু পরেই যেন কালবৈশাখী এসে সবকিছু তছনছ করে দেবে।
— 'তোমরা সবাই এরকম চুপচাপ কেন? কি হয়েছে?' নয়না প্রশ্ন করল একজন রুমমেটকে।
— 'তুই এখনও জানিস না?'
— 'না তো!'
— 'হুহ্, ও শালী জানবে কি! ওর মাথায় কি আর ঘিলু আছে? একদলা গোবর আছে বুঝলি, গোবর! চোখ থাকতেও ও একটা ব্লাইন্ড!' সুজাতা এসেই বাঁকা হেসে বলল ওকে।
— 'আরে ধুর সুজাতাদি, বলোই না কি হয়েছে!'
— 'ওরে গরু, আজকে ওই ভেজিটেবল গ্যাঙের ফেরার কথা গ্যাংটক থেকে, বুঝলি কিনা!' শ্লেষের হাসি হেসে ও বলল, 'ব্যস, সবার জীবনে যেটুকু শান্তি ছিল, সব শেষ! আবার রাণীগিরি শুরু!'
— 'ওহ্!'
সকাল ন'টা কি সাড়ে ন'টা হবে তখন, হঠাৎ শিকদার বাড়িতে কলিং বেলের শব্দ। ইন্দিরা শিকদার সবে সকালের চা নিয়ে বসেছেন, হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ শুনে ভীষণ বিরক্তি ফুটে উঠল ওঁর চোখেমুখে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে তিনি বললেন, 'এতদিন ছিল না, বাড়িতে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় ছিল, এবার গোটা বাড়িটা চেঁচামেচি মাতলামিতে একেবারে লাটে উঠবে, টেকা দায় হবে!'
— 'আহ, মেয়েটা ফিরতে না ফিরতেই তুমি শুরু করলে! সবটাই তো জানো তুমি, সবটা জেনেও....' ইন্দিরার স্বামী অরুণাভ বললেন।
— 'ছাড়ো তো! একটা অলক্ষ্মী, অপয়া, মা বাবা দুজনকে খেয়েও হতভাগীর শান্তি হয়নি, এবার আমাদের সবাইকে শুদ্ধু গিলে খেলে তবে পেট ভরবে!' বিরক্ত ইন্দিরার চোখ গেল মেডের দিকে, আর যেতেই তাতিয়ে উঠলেন তিনি আরও, 'বলি বিমলার মা, কোনো কাজবাজ নেই? সকাল থেকে স্বামী স্ত্রীর কথা হাঁ করে না গিলে যাও না, দরজাটা খুলে দাও না!'
কিন্তু বিমলার মা ইতস্তত করতে লাগল, 'ইয়ে মানে জানেন তো মাঠাকরুণ, দিদিমণি যা রাগী মানুষ....'
ওর কথা শেষ না করতে দিয়ে অরুণাভ বললেন, 'থাক থাক, কাউকে যেতে হবে না। আমার মিতু মাকে আমিই দরজা খুলে দেব।'
অরুণাভ চললেন সদর দরজার দিকে। ওঁর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আরও একহাত নিলেন ইন্দিরা, 'নেহাত দিদি মৃত্যুসজ্জায় গুরুদায়িত্বটা দিয়ে গিয়েছিল, নইলে এমন বেহায়া বাউন্ডুলে মেয়েকে কবেই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতাম! আমার ছেলেমেয়েদুটোও না পচা আলুর কাছে থেকে পচে না যায়!'
অরুণাভ দরজাটা খুলতেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা অতিথি ওঁর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল শিশুর মতো, 'মেশোমণি!'
— 'ওই দেখো মিতু মার কান্ড! এই তো সবে এলি, আগে খা, রেস্ট নে, তারপর কত্ত গল্প শুনব আমি গ্যাংটকের, তা না ও দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে রইল! আয় আয়, ভেতরে আয়।'
অরুণাভ হাত ধরে মৃত্তিকাকে টেনে আনলেন বাড়ির ভেতরে।
— 'এই বাড়িতে শুধু তুমিই ভালো, আর সবাই খুব বাজে! এই বাড়িটাও তো তোমার না, তোমার এম.এল.এ বৌয়ের! এই বাড়িতে আমার মোটেই ফিরতে ইচ্ছে করে না, নেহাত তোমার আর তমুর জন্যই ফিরি। বাকিরা তো চায়, আমি মরে যাই!'
— 'ওরকম ভাবে না মা। তোমার মাসিমণি হয়ত রাফ বিহেভ করে তোমার সাথে, কিন্তু তোমায় ভালো তো বাসে বলো, তাই তো তোমায় নিয়ে চিন্তা করে।'
— 'ছাই করে! শোনো না মেশোমণি, আমি যেদিন জব পাব, একটা ছোট্ট বাড়ি বানাব কেমন, যেখানে শুধু তুমি, আমি আর তমু থাকব, কেমন?'
— 'আচ্ছা বেশ বেশ, তা হবে খন। আগে খাওয়াদাওয়া তো কর!'
মৃত্তিকা দোতলায় যেতেই তমাল ছুটে এল, 'বড়দি! জানিস এতদিন তোকে কত্ত মিস করেছি!'
তমালের গালদুটো টিপে দিয়ে মৃত্তিকা বলে, 'তোর আর মেশোমণির জন্যই তো ফিরতে ইচ্ছে করে রে তমু।'
(ক্রমশ)
(পঞ্চম পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে)
0 মন্তব্যসমূহ