সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
তৃতীয় পর্ব
— 'সুজাতাদি, তুমি!'
— 'হ্যাঁ রে হাঁদা আমি। তা মুখটা অমন বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছিস কোন দুঃখে?'
উগ্রতা থাকলেও সুজাতার কথায় যে স্নেহটুকু ছিল, তার ছোঁয়া পেয়েই হয়তো নয়না আর চোখের জল সামলাতে পারল না।
— 'আরে আরে, কি হল রে? এখানে সবার সামনে এমন করিস না, চল্ ক্যান্টিনে।'
সুজাতা নয়নাকে একরকম জোর করেই নিয়ে গেল ক্যান্টিন। দুপুর দেড়টায় টিফিন পিবিয়ড হয়, এখনো দেড়টা বাজেনি, তাই ক্যান্টিন প্রায় ফাঁকা। পছন্দমতো একটা টেবিল বেছে সুজাতা আর নয়না বসল। নয়না কিছু বলার আগেই সুজাতা বলল, 'তোর মতো মেয়েকে যে চোখের জল ফেলতে হবে এ আমি অ্যাডমিশনের দিনই বুঝেছিলাম। সেইজন্যই তোর খোঁজ নিতে আসছিলাম তোদের ক্লাসরুমে। দেখি তুই নিজেই বেরিয়ে এলি। তা ভনিতা না করে বলে ফেল্ দেখি কি হয়েছে?'
নয়না আমতা আমতা করে বলল, 'মানে, মানে ওই সুবীর স্যার.....'
— 'ব্যস, আর বলতে হবে না। ওই শালার ক্লাস ছিল নাকি আজ তোদের?'
— 'হ্যাঁ, প্রথম দুটো পিরিয়ড।'
— 'শালা জন্তু, ঘরে মা-বোন নেই, মাঝে মাঝে মনে হয় শুয়োরের বাচ্চার চোখদুটো উপড়ে নিই। মেয়েদের বাজে চোখে দেখে! আর তোর মতো এমন হাঁদারাম মেয়ে পেলে তো আর কথাই নেই। তা তোর সাথে কি করেছে সে শুনি?'
নয়না সব ঘটনা খুলে বলল।
— 'হ্যাঁ জানি, কুত্তার মুখে জুতো মারতে ইচ্ছে হয় মাঝে মাঝে। শোন্ ওর থেকে সাবধানে থকিস, পারলে ওর ক্লাসগুলো বাঙ্ক করিস। আর পিছন থেকে কয়েকটা উড়ো কমেন্ট কানে আসেনি তোর?'
— 'হ্যাঁ, শেষদিকের বেঞ্চে বসা কয়েকটা বখাটে ছেলেমেয়ে ছিল, বাট তুমি.….'
— 'ওরে, তিন বছর ধরে আছি আমি এই কলেজে, সবার নাড়িনক্ষত্র আমার জানা, তোর মতো গাধা নই তো আমি। জানিস, ওই বখাটেগুলো মোটেও তোদের সমবয়সী নয়, সব ইয়ারে ঠিকঠাক পাস করলে আজ থার্ড ইয়ারে পড়ার কথা ওদের। যাই হোক, ওই সুবীর শালাটা ছাড়া অন্যান্য টিচাররা সবাই বেশ ভালো, ঠিকঠাক পড়াশুনা করলে ওঁদের কাছে ভালো ছাত্রী নিশ্চয়ই হতে পারবি। তোকে দেখে পড়াশুনাতে মন আছে বলেই মনে হয়, আমার মতো বাউন্ডুলে তো নস নিশ্চয়ই। যাই হোক, চলি বস, কাজ আছে।' সুজাতা চলে গেল।
সুরীর স্যারের ক্লাসগুলো বাঙ্ক করে অন্যান্য ক্লাসগুলো করত নয়না। কলেজ-হোস্টেল মিলিয়ে দিনগুলো ভালোই কাটছিল নয়নার। হোটেলের সিনিয়ররা যে জুনিয়রদের র্যাগিং করত না, তা নয়, তবে সেসব খুব ভয়ানক কিছু নয়। হয়ত প্র্যাকটিকাল খাতায় ছবি আঁকতে দেওয়া, নোট টুকে দিতে বলা, হঠৎ মাঝরাতে ডেকে এনে গান গাইতে বলা, নাচতে বলা, নাচ-গান না পারলেও করতে বাধ্য করা, আর হাসিমস্করা করা। অথবা জলের বোতল ভরে আনতে বলা ইত্যাদি। তবে সেসব নয়না অন্যান্য ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্টদের মতোই মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছিল। সুজাতাও থাকত ওই একই হোস্টেলে, আর চেষ্টা করত নয়নাকে আগলে রাখার। সুজাতা প্রায়ই বলে, 'তুই যেদিন এলি এই কলেজে, তার আগেরদিনই মাটি ওর ভেজিটেবল গ্যাঙের সাথে গ্যাংটক ঘুরতে গেছে। বড়োলোকের বেটি, টাকাপয়সার তো অভাব নেই, আজ এখানে তো কাল ওখানে ঘুরুঘুরু।'
— 'তোমার মুখে প্রায়ই এই ভেজিটেবল গ্যাঙের কথা শুনি, তা এরা কারা? আর এই মাটিই বা কে?'
— 'মাটি কে?' বাঁকা হাসল সুজাতা, 'এই কলেজের রাণী! আর ভেজিটেবল গ্যাং? সে না হয় ওরা কলেজে ফিরলেই জেনে নিস ওদের কাছ থেকে!'
— 'কেন? ওদের কাছ থেকে কেন শুনতে যাব? ওদের চিনিই না ছাই! তার চেয়ে তুমিই বলো।'
— 'বেশ, না শুনে আর রেহাই দিবি না যখন, তখন শোন্। মাটির আসল নাম মৃত্তিকা বণিক, ভেজিটেবল গ্যাঙের হেড। শালীর মাসি ইন্দিরা শিকদার এই অঞ্চলের এম. এল.এ., তাই এই কলেজের কেউ ওকে তেমন ঘাঁটায় না, টিচাররাও এড়িয়ে চলে। তাই হতচ্ছাড়ী যা খুশি তাই করে এখানে। পাক্কা প্লে গার্ল যাকে বলে, ছেলে চড়িয়ে বেড়ায় খালি! মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে করে এক ঘুষি....'
— 'আচ্ছা থাক থাক, আর মাথা গরম করতে হবে না!' নয়না হেসে ওঠে।
— 'হাসছিস তো? হাস হাস। ওরা এখন নেই, তাই সবাই বেঁচেছে, থাকলে সবই জুজু হয়ে থাকে ওদের ভয়ে। শুয়োর কোথাকার!'
— 'ওরে বাবা, এত দাপট?'
— 'নয়তো কি আমি ভাট বকছি ভাবছিস বসে বসে? তবে একটা কাজ ও ভালো করেছিল জানিস!'
— 'কি কাজ?'
— 'রানীমা যখন প্রথম কলেজে আসেন, তখন ওই সুবীরের বাচ্চাটা ওকেও.….. বুঝছিস নিশ্চয়ই! তো ও ক্লাসে সবার সামনে টেনে এমন চড় কষাল জানোয়ারটার গালে, সে বেচারা ভয়ে জড়োসড়ো।'
— 'তাতেও ওনার শিক্ষা হল না?
— 'না রে, শিক্ষা তো মানুষদের হয়, কুকুরদের হয় না। মাটির মাসি এম.এল.এ. জেনে ব্যাটা ওর কেনা গোলাম হয়ে রইল আর কি!'
— 'তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু মাটির যে দলটা আছে তার নাম ভেজিটেবল গ্যাং কেন?'
— 'হে হে হে, এরকম অদ্ভুত নামের পেছনেও কি কারণ নেই ভেবেছিস?' সিগারেট ধরিয়ে সুজাতা বলল, 'বিলকুল আছে। তবে ওদের আরও একখানা নাম আছে, যেটা ওদের আড়ালে কলেজের সবাই বলে।'
— 'কি নাম?'
— 'বারোভাতারি গ্রুপ!' বলেই খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল সুজাতা, 'হাঁ করে কি দেখছিস রে গাধা, আসলে ওই গ্রুপে বারোজন মেয়ে আছে, গোটা কলেজকে উত্যক্ত করে মারাই ওদের কাজ, তাই তো এমন নাম। তা মেয়েগুলোর নাম শুনবি?'
— 'বলো।' আগ্রহভরে শুনতে লাগল নয়না।
— 'ওদের নাম হল আম, জাম ,কলা, পেঁপে, আলু, তেঁতুল, লেবু, মুলো, আদা, শশা, স্যুপ আর এদের জন্মস্থান মাটি।'
— 'কি?' অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল নয়না, 'এরকম আবার কারোর নাম হয় নাকি?'
— 'ধ্যুত মাথামোটা, এগুলো কি আসল নাম ঠাউরেছিস নাকি? এগুলো হল ডাকনাম, ওই মহারাণী মাটির দেওয়া।'
— 'তা আসল নামগুলো কি কি?'
— 'বাব্বা, বিশাল আগ্রহ তো! পরীক্ষায় প্রশ্ন আসবে নাকি?'
— 'আরে বাবা তা কেন হবে? আমি তো এমনিই....'
— 'ঠিক আছে ঠিক আছে, অত এক্সপ্ল্যানেশন এক্সাম হলে দিবি খাতায়, আমায় দিতে হবে না বেকার। শোন্', একটু থেমে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল সুজাতা, আর সেই ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে উঠতে লাগল ওপরে। সেদিকে তাকিয়ে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল সুজাতা।
(ক্রমশ)
(চতুর্থ পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে)
0 মন্তব্যসমূহ