সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুর্দশ পর্ব
পরেরদিন সকালে নয়না রেডি হয়ে সবে বেরোতে যাবে কলেজে, হঠাৎ সুজাতার ডাকে ফিরে তাকাল ও।
— 'কি ব্যাপার! এখন তো আর তোকে ছাগল, গাধা, গরু এসব বলাই যাবে না! এখন তোর বড় বড় লোকদের সাথে ওঠাবসা, বাব্বা, তুই কি এখন আমাদের মতো সাধারণ আছিস!'
— 'কি বলছ তুমি সুজাতাদি?'
— 'আর ন্যাকা সাজিস না তো! ভেজিটেবল গ্যাঙের সাথে এত দহরম মহরম কবে শুরু হল শুনি যে কাল ওরা তোকে হোস্টেল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেল?'
— 'ওহ, এই ব্যাপার!' বলেই হাসতে হাসতে মৃত্তিকার কানের দুল কুড়িয়ে পাওয়া থেকে শুরু করে সবটা খুলে বলল নয়না।
— 'ব্যস, হয়ে গেছে।'
— 'কি হয়ে গেছে সুজাতাদি?'
— 'যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে আর কি! তোকে বারবার বলেছিলাম ওই সর্বনাশীর থেকে দূরে থাকতে, কিন্তু তুই শুনলি না! সেই নিশির ডাকে সাড়া দিয়েই দিলি, এবার দেখবি, হাঁটতে হাঁটতে কখন যে খাদের ধারে চলে গেছিস, বুঝতেই পারিস নি। হুঁশ কখন ফিরবে জানিস? খাদে পড়ে যাওয়ার পর।' শ্লেষের হাসি হাসল সুজাতা, 'যাক গে, লাইফ তোর, ডিসিশন তোর। আমার কাজ ছিল তোকে ওয়ার্ন করা, দ্যাটস ইট।'
সুজাতা আর দাঁড়াল না, কলেজের দিকে চলে গেল গটগট করে হেঁটে।
নয়না মুখ কালো করে নীচের দিকে তাকিয়ে রইল।
— 'সুজাতাদির কথায় কিছু মাইন্ড করিস না রে নয়না।' নয়না ফিরে তাকিয়ে দেখে ওর এক রুমমেট প্রিয়াঙ্কা। প্রিয়াঙ্কা পড়ে সেকেন্ড ইয়ারে। প্রিয়াঙ্কা বলে চলে, 'মানুষটার ওপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেছে রে। রক্তিম হালদারের ব্যাপারটা শুনেছিস তো?'
— 'শুনেছি প্রিয়াঙ্কাদি।'
— 'হ্যাঁ রে। আমরা কেউ জানি না যে দোষ কার ছিল, মৃত্তিকাদি না রক্তিমদার, কিন্তু দোষ যারই হোক, শাস্তি পেতে হয়েছে তো ওই মানুষটাকে বল্। আগের রাতেই যে মানুষটার সাথে তুই ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে গিয়েছিলি, পরেরদিন সকালেই যদি শুনিস সেই মানুষটা আর ইহজগতে নেই, তার মরদেহ তোর চোখের সামনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় চিতার আগুনে, তাহলে তোর মাথার ঠিক থাকবে?' দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রিয়াঙ্কা বলতে থাকে, 'আমাদের সবাইকে ওই এক কথা বলে রে সুজাতাদি। যাই হোক, তুই এখন কলেজ যা।'
ক্লাসে যেতেই নয়না দেখে, ওর মৃত্তিকাদের গ্রুপে যোগ দেওয়ার কথাটা গোটা কলেজে চাউর হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। অনেকে আবার নানারকম টোন টিটকিরিও দিতে লাগল, 'বাইরে থেকে দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানে না, এদিকে কার পা চাটলে ওপরে ওঠা যায় সেটা ঠিক জানে!' কেউ কেউ বলল, 'এই তো সেদিন দেখলি না, ওই মাটি ফার্স্ট ইয়ারের সবাইকে র্যাগিং করল, কিন্তু ওকে কিছুই করল না, শুধু দুটো উপদেশ দিয়ে ছেড়ে দিল। আসলে আগে থেকেই আঁতাত ছিল, বুঝলি কিনা!' অনেকে বলল, 'ভেবেছে ওকে ধরে পলিটিক্সে ঢুকবে! কিন্তু ওটি হচ্ছে না, ওই মাটি সহজ মানুষ নাকি?' কেউ কেউ আবার বাঁকা হাসি হাসল, 'পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে।' অনেকে আবার সামনাসামনি সাবধান করল নয়নাকে, 'সুজাতাদিকে দেখছিস তো,তাও শিক্ষা হয়নি? ওই মাটির জীবনে কাছের মানুষ বলতে কেউ নেই, দরকার মিটে গেলেই টিস্যু পেপারের মতো ছুড়ে ফেলে দেয় সবাইকে, যেমনভাবে দিয়েছিল সুজাতাদিকে, বা রক্তিম হালদারকে।'
এবার হাঁপিয়ে উঠল নয়না, বলে উঠল, 'সবাই যে মাটিকে খারাপ বলছিস, সরস্বতীদির ছেলের ব্যাপারটা জানিস?'
সেটা শুনে ওর এক ক্লাসমেট বলল, 'হ্যাঁ হ্যাঁ, সবই জানি। রাজনীতির আঙিনায় বড় হয়েছে ও, তাই রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাজনীতি ঢুকে গেছে সেই বাচ্চাবেলা থেকেই। তুই আমি যেমন ছোট থেকে পুতুল আর রান্নাবাটি খেলে বড় হয়েছি, মাটি তেমন বড় হয়েছে কয়েন আর নোট নিয়ে খেলতে খেলতে। গরীব মানুষকে টাকা দিয়ে কিনতে ওর চেয়ে ভালো আর কে পারবে? ওরকম কত মানুষকে ও কিনে রেখেছে, তার কটার খবর তুই আমি জানি? ওদের হাতে না রাখলে ভবিষ্যতে যখন ও ভোটে দাঁড়াবে, তখন জিতবে কি করে বল্?'
অনেকেই অনেক কথা বলল, কিন্তু নয়না ওদের কারোর কথাতেই কান দিল না। ওদের হাজার অভিযোগেও মৃত্তিকার প্রতি যে শ্রদ্ধা জন্মেছে ওর মনে, তাতে এতটুকুও চিড় ধরল না। তবে রক্তিম হালদারের মৃত্যু নিয়ে যে গভীর রহস্য জাল বুনেছে কলেজের আনাচে কানাচে, সেটার সমাধান একটা করতেই হবে এবার, আর এই ব্যাপারে ডাইরেক্ট মৃত্তিকার কাছেই সবটা জানবে ও ঠিক করল।
কেটে গেল বেশ কয়েকটা দিন। সেদিন ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা দিচ্ছিল 'বারো মাসে তেরো পার্বণ' গ্রুপ, আম্রপালি ছাড়া সবাই সেখানে উপস্থিত ছিল, উপস্থিত ছিল নয়নাও। মালবিকা সিনেমার জন্য কোথায় কোথায় শুটিংয়ে যেতে হবে, ডায়লগ আর গানের লিরিক্স মুখস্থ করতে গিয়ে ওকে কতটা হিমসিম খেতে হচ্ছে আর তার জন্য উঠতে বসতে মায়ের কাছে যে কতখানি বকুনি খেতে হচ্ছে সেসব গল্পই বলছিল ও, আর সবাই হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিল।
— 'জানিস তো, মাটির মানুষের নায়ক আশুতোষ আঙ্কেল, উনি আমার মায়ের ক্লাসমেট ছিলেন, সেম কলেজ ছিল ওনার আর মায়ের।'
— 'হ্যাঁ তা তো শুনেছি। তুই এটাও বলেছিস যে উনি নাকি মানুষ খুব ভালো?'
— 'হুম রে, শুধু রুপোলি পর্দাতেই না, বাস্তব জীবনেও উনি মাটির মানুষ। যারা ওনাকে কাছ থেকে চেনে, তারাই জানে। আর ওনার মেয়ে ত্রিপর্ণা দত্তও হয়েছে একদম ওনারই মতো, ক্লাস নাইনে পড়ে, খুব ভালো মেয়ে, আমি ওদের বাড়ি গেলেই আমায় জাপটে ধরে, আর ছাড়তেই চায় না, খালি বলে ভেজিটেবল গ্যাঙের গল্প শুনব। বোঝো!'
— 'আর ওনার ওয়াইফ?'
— 'বাব্বা, তুহিনা আন্টির ব্যাপারে যাই বলি কম বলা হবে! যেমন ওনার হাতের গুণ, তেমনই ওনার রূপ, আবার তেমনই মিষ্টভাষী উনি।'
— 'মানে যাকে বলে আশুতোষ দত্তের পারফেক্ট লাইফ পার্টনার।'
— 'একদম রে।'
— 'তাহলেই ভাব মাটি, আমাদের নায়ক আশুতোষ দত্ত চুয়াল্লিশ বছর বয়সেও এমন এভারগ্রিন যে ওনার পাশে আমাদের বিশবর্ষীয়া মুলোকে কি দারুণ লাগবে হিরোইন হিসেবে, উফ! পুরো জমে ক্ষীর।' লাবণ্য বলে উঠল।
— 'সিনেমাটা একবার রিলিজ হোক, আমরা ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো দেখব!'
— 'সে আর বলতে?'
গল্পের ছন্দপতন ঘটন একটা ফোন কলে। মাটির মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠল।
— 'ওই দেখ, আম ফোন করেছে। বেচারা এত মিস করছে আমাদের যে সামনে এসে কথা বলতে পারছে না ঠিকই কিন্তু ফোন করছে ক্লাসে বসে।'
ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে উঠল আম্রপালির গলা। ওর গলায় উত্তেজনা স্পষ্ট।
— 'কি রে আম, এত লাফাচ্ছিস কেন? অগ্নিদেব পাল প্রোপোজ করেছে তোকে?'
(ক্রমশ)
(পঞ্চদশ পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে)
0 মন্তব্যসমূহ