মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ত্রয়োদশ পর্ব
বারো মাসে তেরো পার্বণ
— 'না না মৃত্তিকাদি এসবের আবার কি দরকার....'
— 'তোর সাহস তো মন্দ নয়! তুই মাটির মুখের ওপর না বলছিস?' কপট রাগ দেখাল মৃত্তিকা, 'বোস চুপচাপ! আমার পারমিশন ছাড়া এক পা ও নড়বি না তুই!'
অগত্যা নয়না গিয়ে বসল একটা চেয়ারে।
— 'তোর নাম কি?' প্রশ্ন করল আদরিণী।
— 'ক'বার বলবে ও?' ঝাঁঝিয়ে উঠল নৃত্যকলা, 'সেদিনই তো বলল! আর তাছাড়া ওর বায়োডাটা নিয়ে তুই কি করবি শুনি? জব দিবি?'
— 'এই শোন্, প্রশ্নটা আমি ওকে করেছি, তোকে করিনি, সো কিপ ইওর মাউথ শাট!
— 'উফ!' টেবিলে চাপড়ে এমন গর্জে উঠল মৃত্তিকা যে নয়না চমকে গেল, 'এখানেও ঝগড়া? এরকম করলে কিন্তু দুজনেরই মুখ সেলাই করে দেব, তাও আবার জং ধরা সুচ দিয়ে!' নয়নার দিকে ফিরে বলল, 'তুই বল তো।'
— 'আমার নাম নয়না প্রামাণিক।'
— 'বাড়ি?'
— 'জলপাইগুড়ি।'
— 'বাড়িতে কে কে আছে?'
— 'মা, বাবা আর বোন।'
— 'বাহ্, ভালো।'
— 'কিন্তু মাটি, আম আসবে না রে আজ?' প্রশ্ন করল মালবিকা, 'ওকে মিস করছি খুব।'
— 'কে বলেছে আসবে না?' সবাই চমকে দেখে, আম্রপালি এসে হাজির। ও বলল, 'আমাদের মুলো এত্ত বড় একটা সুখবর দিল, আর আমি ওর কাছ থেকে ট্রিট না নিয়েই ছেড়ে দেব ওকে?'
সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
— 'তবে? বলেছিলাম না মাটি এতো কাঁচা কাজ করে না!'
— 'তা তোর ওই অগ্নিস্যার অ্যালাও করলেন তোকে এখানে আসতে?' যামিনী বাঁকা হাসল।
— 'ধুস, উনি কিছুই জানেন না এসবের।' আম্রপালি বলল।
— 'বাব্বা, এখন থেকেই উনি?'
হাসিতে ফেটে পড়ল ভেজিটেবল গ্যাং। যোগ দিল নয়নাও।
— 'কিন্তু মাটি, ও কে রে? চেনা চেনা লাগছে, বাট চিনতে পারছি না।' নয়নাকে দেখে প্রশ্ন করল আম্রপালি।
মাটি বিস্তারিত বলল। আম্রপালি সবটা শুনে হাসিমুখে এসে নয়নার পাশের ফাঁকা চেয়ারটায় বসল, তারপরেই নয়নার গালদুটো টিপে বলল, 'তোকে প্রথম দিনেই বেশ ভালো লেগেছিল আমার। খুব মিষ্টি মেয়ে তুই।'
— 'তাই নাকি আম?' লাবণ্য মুচকি হাসল, 'কতটা মিষ্টি রে? তোর অগ্নি স্যারের চেয়েও বেশি?'
— 'শোন লেবু, তুই যদি এক্ষুণি মুখটা বন্ধ না করেছিস, তাহলে তেতো কচলানো লেবু তোর মুখে ঠেসে দেব বলে দিচ্ছি!'
— 'আহ, থাম তো তোরা! আমি একটা প্রস্তাব রাখব এখন, তোরা শোন্ মন দিয়ে।' মৃত্তিকা বলল।
— 'হুম, রাণীমা, বলুন।'
— 'আমি ভাবছি এই যে মেয়েটি, নয়না প্রামাণিক, এই মেয়েটিকে যদি ভেজিটেবল গ্যাঙে ইনক্লুড করি, কোনো আপত্তি আছে তোদের?'
— 'একদম না, একদম না।' সমস্বরে বলে উঠল সবাই।
— 'গুড! তা ও মেয়ে, তোমার আপত্তি নেই তো আমাদের দলে ভিড়তে?' প্রশ্ন করল মৃত্তিকা।
মুগ্ধ হয়ে গেল নয়না। এই মানুষটিকে কিনা সবাই এত খারাপ বলে! যে এত তাড়াতাড়ি মানুষকে আপন করে নিতে পারে, সে কখনোই খারাপ হতে পারে না।
— 'আপত্তি কিসের? এরকম সুবর্ণ সুযোগ জীবনে কখনো পাবি নাকি তুই?' হাসল এলোকেশী।
— 'আর আপত্তি করলেই বা শুনছে কে?' মালবিকা হাসল, 'তোকে আমাদের সব্বার খুউউব পছন্দ হয়ে গেছে, তাই এদ্দম ছাড়া হচ্ছে না তোমায়, তুমি চাও আর নাই চাও, আজ থেকে তুমি ভেজিটেবল গ্যাঙের মেম্বার।'
— 'আমার কোনো আপত্তি নেই গো।' হেসে বলল নয়না।
ওর পিঠ চাপড়ে মৃত্তিকা বলল, 'দ্যাটস লাইক অ্যা গুড গার্ল।'
— 'সব তো হল, কিন্তু একটা সমস্যা রয়ে গেল যে! আদরিনী বলল।
— 'ব্যস, জানতাম উনি ঠিক বাগড়া দেবেন! তা কি সমস্যা তোর শুনি?' নৃত্যকলা রাগ দেখায়।
— 'তোকে কেন বলব রে? আমি যা বলার মাটিকে বলছি।'
— 'কি সমস্যা হল ভাই তোর?'
— 'আরে এই গ্রুপে তো সবারই নাম খাবার দিয়ে, তা ওর কি নাম হবে?'
— 'সিম্পল, নুন বলে ডাকব সবাই ওকে!'
— 'আহা, কি বুদ্ধি কাঁচকলার মাথায়! অমন মিষ্টি শান্ত মেয়ে, তার নাম হবে কিনা নুন! এই বুদ্ধি নিয়ে তুই ম্যাথামেটিক্স পড়িস? ছ্যা ছ্যা!'
— 'বেশ তো আদা, তোর যখন বুদ্ধি এতই উপচে পড়ছে, তাহলে তুইই বল।'
— 'আহ, থাম। এই তেঁতুল, তুই তো ভালো গল্প কবিতা লিখিস, ম্যাগাজিনেও বের হয় তোর লেখা, তুই একটা সলিউশন দে না রে! আমাদের গ্রুপের নাম ভেজিটেবল গ্যাং তো তুইই রেখেছিলি।'
— 'দাঁড়া মাটি, ভাবতে দে।' বেশ কিছুক্ষণ ভেবে তিতলি বলল, 'দারুন আইডিয়া এসেছে, শুনবি?'
— 'বল বল!'
— 'এক কাজ কর, নয়নার নাম হোক নয়ন, আর আমাদের গ্রুপের নাম পালটে হোক বারো মাসে তেরো পার্বণ, কেমন?'
— 'উরি শালা, এ তো দারুণ আইডিয়া!' টেবিল চাপড়ে যখন সবাই সায় দিল, তখন জায়গাটাকে রেস্টুরেন্ট কম, পার্লামেন্ট বেশি মনে হচ্ছিল নয়নার।
— 'ওকে, দেন এটাই ফাইনাল, আজ থেকে আমাদের গ্রপের নাম 'বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর হ্যাঁ শোন নয়না, সরি নয়ন, তুই আমাদের কাউকে কিন্তু তুমি, দিদি এসব বলে ডাকবি না। এই গ্রুপে সবাই সবার বন্ধু, কেউ কারোর সিনিয়র নয়, আর কেউ কারোর জুনিয়রও নয়। ওই যে দেখছিস এলোকেশী মানে আলু, ও কিন্তু থার্ড ইয়ারে পড়ে না, পড়ে সেকেন্ড ইয়ারে, বাট আমাদের কাউকেই দিদি টিদি বলে না। সো বুঝলি তো, তুই আজ থেকে আমায় মৃত্তিকাদি না, মাটি বলবি। বাকিদেরও এভাবেই বলবি, ওকে?'
— 'ওকে।'
সেদিন রেস্টুরেন্টে খাওয়া শেষ করে বেরোতে ওদের আটটা বেজে গেল।
— 'নয়ন, গাড়িতে ওঠ। তোকে আর শশাকে হোস্টেলে ছেড়ে দিয়ে দেন আমরা যে যার বাড়ি ফিরব।'
— 'না না মৃত্তিকাদি, ইয়ে মানে মাটি, আমি বাসে চলে যেতে পারব।'
— 'নো মাই ডিয়ার, সেটি হচ্ছে না।' মৃত্তিকা একরকম টেঁনে হিঁচড়ে ওকে গাড়িতে তুলল।
হোস্টেলের সামনে টাটাসুমোটা থেকে নামল নয়না। মৃত্তিকাসহ বাকিরা বাই জানাল ওকে, আর গাড়িটা ছেড়ে দিল। হোস্টেলের দোতলার ঘরের জানলাটা থেকে সবটা দেখল সুজাতা। অজান্তেই শ্লেষের হাসি ফুটে উঠল ওর চোখেমুখে।
(ক্রমশ)
0 মন্তব্যসমূহ