Advertisement

মাটি (দ্বাদশ পর্ব)

মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দ্বাদশ পর্ব 


 নয়না দেখল, সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে একটা নরকঙ্কাল, চোখ নেই কঙ্কালের, তবু করোটির বীভৎস কোটর দিয়ে যেন নয়নার বুকের ভেতরটা পর্যন্ত দেখে নিচ্ছে ও। সেই সময়েই আতঙ্কে ঘুম ভেঙে গেল ওর। ও ঘুম ভেঙে দেখে, ও ঘেমেনেয়ে একাকার, বিছানাও ভিজে গেছে ঘামে। বিছানা ছেড়ে উঠেই ও রুমালে নিজের কপাল, গাল, ঘাড় মুছে নিল। চুলটাও ভিজে গিয়েছিল ঘামে, বাধ্য হয়েই চুলটা খুলে দিল ও। অন্ধকার ঘরে কেমন দম আটকে আসছিল ওর, তাই লাইটটা জ্বালল ও। অন্য দুজন রুমমেট অঘোরে ঘুমোচ্ছে, লাইট জ্বালানোতে ঘুমে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটেনি ওদের। ঘরের মেঝেয় একটা মাটির কুঁজো রাখা ছিল, ওখান থেকে গ্লাসে ঢেলে প্রাণভরে ঠান্ডা জল খেয়ে কিছুটা তৃপ্ত হল ও। উফ কি বীভৎস স্বপ্নই না দেখল ও! এখনও সেই ভয়ঙ্কর মুখটা চোখের সামনে ভাসছে যেন! আলোটা আবার অফ করে ও শুল বটে, কিন্তু ভয়ে দুচোখের পাতা এক করতে পারল না কিছুতেই। যদি আবার সেই ভয়ানক স্বপ্নটা ফিরে আসে! 
এসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল নয়না তা আর টের পায়নি ও। নাহ, আর ফিরে আসেনি স্বপ্নটা। 

পরেরদিন কলেজ যেতেই নয়না দেখে, হুলুস্থুলু কান্ড। ভেজিটেবল গ্যাং মহাখুশি হয়ে যেন কিছু একটা সেলিব্রেট করছে। 
— 'না মুলো সোনা, আজ আর কেউ তোমাকে ছাড়ছে না।' মৃত্তিকা হেসে বলল, 'আজ আমাদের সবাইকে ট্রিট দিবি তুই, যে যা খেতে চাইবে তাই খাওয়াবি।'  
— 'একদম, আজ ছুটির পর আমাদের সবার প্রিয় রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবি তুই।' এলোকেশী বলল। 
কিন্তু যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে, সে সলজ্জ হাসিমুখে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। 
এসব দেখে শুনে নয়না দাঁড়িয়ে পড়ল। পাশে যে সুজাতা কখন এসে দাঁড়িয়েছে তা ও খেয়ালই করেনি। 
— 'ব্যস, সকাল সকাল শুরু হল নতুন নাটক!' মুখ বেঁকিয়ে সুজাতা বলল, 'এটা কলেজ না রঙ্গমঞ্চ সেটাই বোঝা দায়!'  
— 'কি হয়েছে গো সুজাতাদি? সকাল সকাল এরকম হৈহুল্লোড় কেন করছে ওরা?'
— 'দাঁড়িয়ে যা, একটু পরেই মহারাণী সবটা অ্যানাউন্স করবেন।' 
সুজাতা আর দাঁড়াল না, তবে নয়না মৃত্তিকা কি বলে শোনার জন্য দাঁড়িয়ে গেল। 
— 'শুনুন শুনুন শুনুন শুনুন,' জলের বোতলটাকে মাইকের ভঙ্গিতে মুখের সামনে নিয়ে মৃত্তিকা বলতে লাগল, 'শুনুন দিয়া মন! আজ আমাদের বড়ই সুখের দিন! কেন জানতে চান? সামনেই একটা সিনেমার শুটিং শুরু হবে, বাংলা সিনেমা, আর সেই সিনেমায় এক নতুন হিরোইনকে দেখতে চলেছে সবাই, জানতে চান সেই হিরোইনের নাম?'
সমবেত উত্তর শোনা গেল, 'চাই!' 
— 'সেই হিরোইন আর কেউ নয়, তার নাম হল মালবিকা মুখার্জী, আমাদের সবার প্রিয় মুলো!' 
সাথে সাথে শোনা গেল সমবেত হাততালির শব্দ। মাটি বলে যেতে লাগল, 'আন্টি, মানে মুলোর মা অনিতা মুখার্জীর নাম আমরা কে না জানি! ফিল্ম ডিরেক্টর হিসেবে কত অ্যাওয়ার্ড আছে তাঁর ঝুলিতে, তা গুনে শেষ করা যাবে না। ওনার আসন্ন ছবি 'মাটির মানুষ' -এ আমরা দেখতে পাব আমাদের সবার প্রিয় নায়ক, মেয়েদের হার্টথ্রব আশুতোষ দত্তকে, আর তার বিপরীতে দেখতে পাব কাকে?'
আবার সমবেত উত্তর এল, 'কাকে?'
— 'আবার কাকে? আমাদের প্রিয় মুলোকে!' 
সমবেত হাততালির শব্দ শোনা গেল আবার। 
অবাক হয়ে গেল নয়না। অনিতা মুখার্জীকে ও কতবার টিভির পর্দায় দেখেছে, এই মালবিকা যে তারই মেয়ে এটা জেনে ও চমকে উঠল। 
একেই আগেরদিন ওসব ঘটনা শোনা, রাতে ভয়ানক স্বপ্ন দেখা, এসবের রেশ কাটতে না কাটতেই আবার আজ সকালে এসব দেখল ও। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও মনে মনে বলল, 'সত্যিই, এটা কলেজ কম, থিয়েটারের স্টেজ বেশি মনে হচ্ছে! এত বাঁক তো কোনো সিনেমার গল্পেও দেখি নি আমি, এই কলেজে আসার পর প্রত্যেকটা মুহূর্তে যেভাবে বাঁকের সম্মুখীন হচ্ছি আমি!' 
আর না দাঁড়িয়ে নয়না ক্লাসে চলে গেল। 

 সেদিন ছুটির পর নয়না দেখে, পরমানন্দে ভেজিটেবল গ্যাং রেস্টুরেন্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। 
— 'উফ, আমি শুধু ভাবছিলাম কখন ছুটিটা হবে! তরই সইছিল না আমার!' সোৎসাহে বলে উঠল পম্পা। 
— 'সত্যি রে। শুধু আমটার জন্যই মন কেমন করছে! ওই অগ্নিস্যারের জ্বালায় তো কথাটুকু পর্যন্ত বলতে পারিনা ওর সাথে! ও ও যদি আজ যেত আমাদের সাথে....'
— 'কে বলল যাবে না?' যামিনীকে থামিয়ে দিয়ে মৃত্তিকা বলল, 'তোদের মাটি এত কাঁচা কাজ করে না, বুঝলি জাম? রেস্টুরেন্টে তো চল আগে, তারপরেই দেখবি।'
— 'হুম চল চল, বাকি গল্প ওখানে গিয়ে হবে।' লাবণ্য তাড়া দেয়। 
আর দেরি না করে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লাল টাটাসুমোটায় উঠে পড়ল ওরা। ওটা আসলে মৃত্তিকাদের গাড়ি। 
নয়নাও হোস্টেলে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, হঠাৎ মাটিতে পড়ে থাকা একটা চকচকে জিনিসের দিকে নজর পড়ল ওর। জিনিসটায় পড়ন্ত রোদ পড়ে আলো ঠিকরোচ্ছিল। সেদিকে এগিয়ে গিয়ে নয়না দেখে সর্বনাশ! একটা সোনার কানের দুল পড়ে আছে, তাতে আবার হিরে বসানো। দুলটা কেমন চেনা চেনা ঠেকে ওর, তারপরেই মনে পড়ে, এই দুলটা মৃত্তিকার কানে দেখেছিল ও। আর দেরি না করে দুলটা কুড়িয়ে নেয় ও, তারপরেই থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্টদের জিজ্ঞেস করে ও জানতে পারে, ব্লু রোজ রেস্টুরেন্টে গেছে ওরা। কলেজের সামনের বাস স্টপ থেকে বাস ধরলে পনেরো মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যাবে ব্লু রোজ। দেরি না করে রওনা দিল নয়না। 

  ভেজিটেবল গ্যাং তখন রেস্টুরেন্টের একটা বড় টেবিলের চারধারে আয়েস করে বসেছে, এমন সময় নয়না এসে দাঁড়াল ওর সামনে। 
— 'তুই ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট না? এখানে কি চাই?' ভ্রু কুঁচকে প্ৰশ্ন করল মৃত্তিকা। 
— 'কলেজ ক্যাম্পাসে এটা কুড়িয়ে পেলাম।' বলেই কানের দুলটা মৃত্তিকার হাতে দিল ও। 
দুলটা দেখেই চমকে উঠল মৃত্তিকা। কানে হাত দিয়ে ও দেখে, ডান কানে দুলটা ঠিকই আছে, কিন্তু বাঁ কানটা খালি। 
দুলটা নয়নার হাত থেকে নিয়ে মৃত্তিকা হেসে ওঠে, 'এখান থেকে তো কলেজ অনেকটাই দূর রে, শুধু এটা ফেরত দিবি বলে এতদূর এলি? সত্যি, পাগলি একটা বটে তুই!' 
নয়না কিছু না বলে হাসল শুধু। 
— 'তা এসেই যখন পড়েছিস, না খাইয়ে তো ছাড়তে পারব না তোকে। বোস এখানে।'
টেবিলের দুটো চেয়ার তখনও খালি ছিল, তারই একটায় নয়নাকে বসতে বলল মৃত্তিকা।

(ক্রমশ) 

(ত্রয়োদশ পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে) 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ