Advertisement

মাটি (একাদশ পর্ব)

মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
একাদশ পর্ব 


— 'দেন? দেন আর কি, সবাই মাটির কথাটাই বিশ্বাস করল এসব দেখেশুনে, আর উঠতে বসতে রক্তিমকে বলতে লাগল, 'বাব্বা, বাইরে ভালোমানুষের মুখোশ পরে ঘুরিস, ভেতরে ভেতরে তুই তো রেপিস্ট রে!' এসব শুনতে শুনতে রক্তিম বেচারা লজ্জায় দুঃখে অপমানে ঘেন্নায় বাঁচার ইচ্ছেটাই হারিয়ে ফেলে, গলায় দড়ি দিয়ে সুইসাইড করে ও। পরেরদিন সকালে ওর বেড়রুমে গিয়ে ওর মা বাবা দেখে, ফ্যান থেকে ঝুলছে ওর ডেডবডি।'
— 'ওরে ব্বাবা! বলিস কি! মিথ্যে অপবাদ দিয়ে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরেই ফেলল! উফ, কি ভয়ানক!' 
— 'মিথ্যে অপবাদ না সত্যি কথা সেটা আজ পর্যন্ত কেউ সিওরলি জানে না, কিন্তু মাটির জায়গায় আর কোনো মেয়ে হলে কখনও পারত এসব করতে? নিজের শ্লীলতাহানি হওয়ার ছবি দেওয়ালে দেওয়ালে লাগিয়ে বেড়াবে, এমন নির্লজ্জ মেয়ে দেখেছিস কখনো?' 
— 'সত্যি! মাটি এক্কেবারে ডাকাত মেয়ে!' 
— 'তাই বলছি, ভুলেও ওই মেয়ের পেছনে ঝুলতে যেও না সোনা। আজ ওকে প্রোপোজ করবি, কাল দেখবি তোর প্রোপোজাল ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে। তাই আর যাই করিস, ভুলেও ওই মেয়ের দিকে ফিরেও তাকাস না।' 
— 'হুম সে তো অবশ্যই।' 
— 'তবে কি জানিস, এতকিছুর পরেও সবাই কিন্তু মাটির কথা বিশ্বাস করেনি, অনেকে আজও মনে করে রক্তিম নির্দোষ ছিল, ওকে ফাঁসানো হয়েছে। ওই যে সুজাতাদি আছে না, যাকে সবাই সুজি বলে ডাকে, চিনিস?'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ, রাজীবদার জিএফ তো?'
— 'হুঁ, একসময় সুজাতাদি ওই রক্তিম হালদারের গার্লফ্রেন্ড ছিল। ভীষণ মনের মিল ছিল শুনেছি ওদের, আর তখন সুজাতাদিও আজকের মতন ছিল না জানিস। রক্তিম হালদার সুইসাইড করার পর মানুষটা একেবারে বদলে গেছে। আজ শুধু মদ, সিগারেট আর কথায় কথায় গালাগালি। সেদিনের সুজাতাদি ওরফে সুজি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ ছিল, হাসিখুশি, শান্তশিষ্ট ছিল, রাগের লেশমাত্র কেউ দেখেনি, অথচ আজ দেখ!' 
— 'সেই!' 
— 'শুনেছি সুজি আর মাটি নাকি গলায় গলায় বন্ধু ছিল, কিন্তু এই ঘটনাটার পর দুজনের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায় একদম। সুজাতাদি আজও বিশ্বাস করে, রক্তিম হালদার নির্দোষ ছিল, মাটিই ওকে ফাঁসিয়েছে।' 
— 'কিন্তু মৃত্তিকাদিই বা এসব করতে গেল কেন?'
— 'কেন আবার! বড়োলোকের উশৃঙ্খল মেয়ের বদ খেয়াল হয়ত!' 
— 'তা এই যে রক্তিম হালদার সুইসাইড করল, বিচার হয়নি?'
— 'হয়নি আবার! কিন্তু মৃত্তিকা পুলিশকে ভয়েস রেকর্ডিংটা শোনাল, ছবিগুলো দেখাল, আর মৃত্তিকার মাসি এম.এল.এ, জানিস তো?' 
— 'হুম।' 
— 'ব্যস, সব ধামাচাপা পড়ে গেল!'

  ছেলেগুলো আর বসল না। খাবারের দাম মিটিয়ে দিয়ে ক্লাসে চলে গেল ওরা। 
  নয়নার ওঠার ক্ষমতাই ছিল না। মনে হচ্ছিল গোটা শরীরটা যেন প্যারালাইজড হয়ে গেছে ওর। চুপচাপ মূর্তির মতো বসেছিল ও, হঠাৎ একটা চেনা ডাকে সম্বিৎ ফিরল ওর। তাকিয়ে দেখে, সুজাতা ডাকছে ওকে, 'কি রে নমিতা, কার সাথে স্ট্যাচু স্ট্যাচু খেলছিস? ক্লাসে যাবি না?' 
অন্যদিন হলে নয়না আপত্তি করে বলত, 'আহ, নমিতা নয়, নয়না!' কিন্তু আজ সেরকম মানসিক অবস্থাতেই ছিল না ও। অবাক হয়ে সুজাতাকে দেখতে লাগল ও। কতটা কষ্ট বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় মানুষটা! নয়না খুব দুঃখ পেল মনে মনে।
— 'কি রে গাধী, আমায় হাঁ করে কি দেখছিস? নতুন দেখছিস নাকি আজ আমায়? নাকি মেমরি লস টস হয়ে গেছে তোর?' 
কিন্তু নয়নার হাসি পেল না আর।
— 'কিছু না গো, এমনিই মনটা ভালো নেই আজ।' 
— 'মন আবার কারোর এমনি এমনি খারাপ হয় নাকি পাগলা? বাড়ির জন্য মন কেমন করছে?'
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য নয়না জবাব দিল, 'হুঁ।'
— 'তা বেশ তো, নেক্সট উইকে তিনদিন ছুটি আছে কলেজে, ঘুরে আয় বাড়ি থেকে।'
— 'যাব গো সুজাতাদি, খুব তাড়াতাড়িই বাড়ি যাব। এখন আমি ক্লাসে যাচ্ছি কেমন, টা টা।' 
— 'বাই বস।' 
নয়না ক্লাসে চলে গেল। সুজাতা, নয়না আর মাটি আসলে একই ডিপার্টমেন্টের, তিনজনই ফিলোসফির স্টুডেন্ট। 

ক্লাসে গেল ঠিকই নয়না, কিন্তু একদমই মন বসল না ওর। ওর মনে কেবলই সুজাতার মুখটা ভাসছিল। ছেলেদুটোর মুখে শোনা কথা গুলো যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল ও। দেখতে পাচ্ছিল, মনের মানুষটাকে এভাবে আত্মহত্যা করতে দেখে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কতই না কেঁদেছে সুজাতাদি। কতটা কষ্ট সহ্য করে তবে একজন হাসিখুশি মেয়ে এরকম রুক্ষ মেজাজি হয়ে উঠেছে। যে মানুষটা একসময় স্বপ্নেও নেশা করার কথা ভাবত না, সে ই আজ ডিনারের পর এক গ্লাস মাদক না পেলে ঘুমোতে পারে না, দিনের পর দিন সিগারেটের ধোঁয়ায় ঠোঁট পুড়ে গেছে তার। কিন্তু মৃত্তিকাদি কেন এমন করতে গেল? যে মানুষটা অসহায় মানুষকে হাত খুলে সাহায্য করে, বান্ধবীদের এতটা কেয়ার করে, সেই মানুষটা নিছক খামখেয়ালের বশে একজনকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেবে? তাও কিনা যে তার অন্যতম প্রিয় বান্ধবীর বয়ফ্রেন্ড? যে যাই বলুক, মৃত্তিকাকে এতটা খারাপ মানুষ হিসেবে ভাবতে পারল না নয়না। তাহলে কেন এরকম ঘটনা ঘটল? হাজারটা প্রশ্ন জট পাকিয়ে গেল নয়নার মাথায়। 
'একটা সিন্দুক খোলে, তার ভেতর আরও বন্ধ দশটা সিন্দুক দেখা যায়! ধুস!' মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল নয়না। 

 সেদিন রাতে ভালোভাবে ঘুমই হল না নয়নার। ও কেবলই এপাশ ওপাশ করছে, আর ছেলেদুটোর মুখে শোনা সব ঘটনাগুলো স্বপ্নে দেখছে। ও দেখল, একটা আবছায়া ছায়ামূর্তি আস্তে আস্তে বিছানায় উঠে দাঁড়াল, তারপরেই সিলিংফ্যানে ঝোলানো একটা বড় দড়িতে গলা দিতে যাচ্ছে মূর্তিটা। নয়না বারবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও আটকাতে পারছে না ছায়ামূর্তিকে। ও বারবার চেঁচিয়ে বারণ করছে, 'নেমে এসো রক্তিম হালদার, নেমে এসো! সুইসাইড কোনো সলিউশন না, সুইসাইড মানে হেরে যাওয়া! যদি সত্যিই মৃত্তিকা বণিকের সাথে অন্যায় করে থাকো তুমি, তবে জোর গলায় স্বীকার করো সত্যিটা! নেমে এসো রক্তিম হালদার, সুজাতাদির মুখ চেয়ে নেমে এসো!' কিন্তু ছায়ামূর্তি কোনো কথা শুনল না। ফ্যান থেকে ঝুলে পড়ল ও, আর সেই দড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কালচে লাল রক্ত। আস্তে আস্তে গোটা ঘরটা রক্তে ভরে গেল। নয়নার পাশে ক্রন্দনরতা সুজাতা ওকে বলল, 'পালিয়ে চল নমিতা, পালিয়ে চল!' পাশ থেকে মৃত্তিকাও বলছে ওকে, 'ওরে গরু, ওটা মানুষ নয় রে, সাক্ষাৎ শয়তান! তুই এক্ষুণি পালা, নইলে তোর শরীরের নরম তুলতুলে মাংস ও খেয়ে ফেলবে!' সুজাতা আর মৃত্তিকা নিমেষে পালিয়ে গেল ঘর থেকে, নয়নাও পালাতে গেল, কিন্তু ঘরের মেঝেয় পড়ে থাকা একদলা রক্তে পা পিছলে পড়ে গেল ও। বারবার ওঠার চেষ্টা করেও উঠতে পারল না ও। সেই সময়েই কড়িকাঠের দিক থেকে ভেসে এল একটা ক্রূর হাসির শব্দ। সেই শব্দ শুনে সিলিংফ্যানের দিকে চোখ গেল ওর, আর তাতে হাড় হিম হয়ে গেল ওর। 

(ক্রমশ) 

(দ্বাদশ পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে) 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ