Advertisement

মাটি (দশম পর্ব)

মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দশম পর্ব 

চড় খেয়েও মুখ খোলেনি মৃত্তিকা। কাজলকালো চোখ দুটো দিয়ে একফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়েনি। শুধু রাঙা মুখখানি কালবৈশাখীর মেঘে মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল নিমেষে। 
— 'তুই মাসিমণিকে তখন সত্যিটা বললি না কেন মিতু মা?' মৃত্তিকার মাথায় হাত বুলিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন অরুণাভ। 
— 'কি লাভ মেশোমণি? তোমার বৌ বিশ্বাস করত না।' 
— 'তাও ঠিক। যত বয়স বাড়ছে ওর রাগ আর ছেলেমানুষি ততই বাড়ছে যেন! তবুও মা, সত্যিটা তো সত্যিই হয়, তুই মিথ্যে কেন বলতে গেলি?' 

কোনো উত্তর দেয়নি মৃত্তিকা। নীরব হয়ে অরুণাভর বুকে মাথা রেখেছিল চোখ বন্ধ করেছিল। নাহ, তবু চোখ থেকে জল কিন্তু গড়িয়ে পড়েনি একফোঁটা। 

— 'ধুস মাটি, কিসব আজেবাজে জিনিস ভাবছিস বল তো তুই? ওঠ, ক্লাসে যা।' নিজের মনে মনে বিড়বিড় করে মৃত্তিকা উঠে পড়ল।

ওদের থেকে একটু দূরে একটা টেবিলে বসেছিল নয়না। এতক্ষণ ক্যান্টিনে ঘটা একটা ঘটনাও চোখ এড়ায়নি ওর। সবার মুখে বর্ণিত মাটির স্বভাবের সাথে এই মাটিকে একেবারেই মেলাতে পারল না ও। এ এক অচেনা মাটি, যে নিজে অপমানিত হয়েও বান্ধবীকে মিলিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে তার মনের মানুষের সাথে। এ এক অজানা মাটি, যে অসহায় মানুষের আঁচল ভরিয়ে দেয় নিমেষে, ঠিক মা অন্নপূর্ণার মতো। নয়না ভীষণ কনফিউজড হয়ে পড়ে। মাটির কোন্ রূপটা সত্যি? আর মাটি যদি সত্যিই ভালো মনের মানুষ হয়, তবে চারিদিকে তার এত বদনামই বা কেন? ও যদি সত্যিই ভালো মানুষ হয়, তাহলে শুধু ভেজিটেবল গ্যাঙের এগারোজন ছাড়া আর কেউ কেন ওর সম্বন্ধে একটাও ভালো কথা বলে না? স্যার ম্যামরাও নিজেদের ক্লাসের স্টুডেন্টদের ওর সাথে মিশতে বারণ করেন, কেন? ওর মনে পড়ল বাবার বলা কথাগুলো, 'নয়ন মা, অন্যের মুখের কথা শুনে কখনোই সিদ্ধান্ত নিবি না কিছু, সবসময় যাচাই করে নিবি সবকিছু।' আবার সেই সাথে একটা প্রবাদও মনে পড়ল ওর, 'যাহা রটে তাহা কিছু তো বটে!' অর্থাৎ মাটির জীবনে এমন কিছু ঘটনা তো অবশ্যই আছে যার জন্য সকলে ওকে নিয়ে এত কুৎসা করে। কি সেই ঘটনা? হঠাৎ করেই ওর মনে পড়ে গেল সুজাতার বলা কথাগুলো, 'মাটি একসময় আমার জীবন থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল।'  
'কিন্তু কি কেড়ে নিয়েছিল? আর সেজন্যই কি সুজাতাদির এত ক্ষোভ মৃত্তিকাদির ওপর?' নিজের মনে বিড়বিড় করেই ও ভাবে, সুজাতাদির কাছে এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাওয়া যাবে না। হয়ত বা খুব পার্সোনাল প্রশ্ন, আস্ক করতে গেলেই খুব রেগে যাবে সুজাতাদি। তাহলে? তাহলে কার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর থাকবে? অন্যের পার্সোনাল ম্যাটার নিয়ে টানাটানি করা একেবারেই স্বভাববিরুদ্ধ নয়নার, কিন্তু এই ঘটনাটা না জানলেও তো ওর কাছে মৃত্তিকা আর সুজাতা দুজনেই অচেনা থেকে যাবে। 
— 'সত্যি বাবা, এটা কলেজ না রহস্যপুরী কে জানে! এখানে সবাই যেন এক একটা জলজ্যান্ত রহস্য!' মনের অজান্তেই বলে উঠল নয়না। 

 কিছুদিন পরেই উত্তরটা পেয়ে গেল নয়না অদ্ভুতভাবেই। সেদিন টিফিন পিরিয়ডে ও ক্যান্টিনে অন্যমনস্কভাবে বসে স্যান্ডুইচ খাচ্ছিল, হঠাৎ দুটো ছেলের কথাবার্তা কানে এল ওর। ওরা নয়নার পাশের একটা টেবিলে বসে গল্প করছিল, কথা শুনে নয়নার মনে হল ওরাও ওর মতোই ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। 
— 'ওই ভেজিটেবল গ্যাঙের সাথে আলাপ হয়েছে তোর?'
— 'বাব্বা হয়নি আবার! ওদের এই কলেজের কে না চেনে! তবে জানিস, মেয়েগুলো বাজে হতে পারে, কিন্তু ওদের দেখতে কিন্তু হেব্বি মাইরি, বিশেষ করে ওদের যে হেড, কি যেন নাম...'
— 'ওই তো মাটি। ভালো নাম মৃত্তিকা বণিক।'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ ওই। ইসস যদি থার্ড ইয়ারে পড়তাম, একবার ট্রাই মারতামই মারতাম। কি সুন্দরী মাইরি!' 
— 'উঁহু, ভুলেও ওসব চিন্তা মাথায় এনো না বাছাধন, নইলে ওই রক্তিম হালদারের মতো কেস হবে। এই বয়সেই কি গলায় দড়ি দিতে চাস তুই?' 
— 'মানে? এটা কি কেস? জানি না তো!'
নয়না ওদের কথা খুব মন দিয়ে শুনতে থাকে। 
— 'আমিও তো জানতাম না ভাই। থার্ড ইয়ারের একটা দাদার কাছ থেকে শুনলাম।'
— 'আচ্ছা আচ্ছা, তা কেসটা কি?' 
— 'বলছি শোন। এটা গতবছরের ঘটনা। এখন যারা থার্ড ইয়ারে পড়ে, ওরা তখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ত। সেদিন ছিল কলেজ ফেস্টের রাত। হঠাৎ তিনতলার গার্লস কমন রুম থেকে মেয়ের গলায় তীব্র চিৎকার ভেসে আসে। সবাই পড়ি কি মরি ছুটে এসে দেখে, ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কিন্তু জানালাটা খোলা ছিল, সেই জানালা দিয়ে এসে সবাই দেখে, ওই মাটি আর রক্তিম হালদার....বুঝছিস তো?'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝছি, তারপর কি হল?'
— 'দুজনেরই জামা কাপড় ছিঁড়ে বিধ্বস্ত, আর মাটির কপালে রক্তের দাগ। মাটিই চিৎকার করছে, বাঁচাও বাঁচাও!'
— 'ওরে ব্বাবা! তারপর?' 
— 'তারপর তো সবাই মিলে দরজাটা ভেঙে ভেতরে ঢুকে আসে। মাটি সবাইকে বলে যে রক্তিম হালদার নাকি ওর শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা করেছিল, যদিও কলেজের বেশিরভাগই ওর কথা বিশ্বাস করেনি, কারণ রক্তিম হালদার নাকি খুব শান্তশিষ্ট ভালোমানুষ ছেলে ছিল, ওই সাত চড়ে রা কাড়ে না টাইপ, আর মাটি কেমন তা তো সবাই জানে।'
— 'হুম, তা আর বলতে!' 
— 'তো যথারীতি ঘটনাটাকে কেউ পাত্তাই দেয়নি, সবটাকেই মাটির নাটক বলে উড়িয়ে দিয়েছিল প্রত্যেকে। রক্তিম হালদারও তাই দিব্যি কলেজ আসছিল, কিন্তু দুদিন পরেই অঘটনটা ঘটে।'
— 'অঘটন?'
স্যান্ডুইচ যে কখন শেষ হয়ে গেছে খেয়ালই নেই নয়নার। ও আঙুল চাটছে আর মন দিয়ে ছেলের দুটোর কথা শুনছে কান পেতে।
— 'তা নয়ত কি! ফেস্টের ঠিক দুদিন পরই সবাই কলেজে এসে দেখে সে এক অদ্ভুত কান্ড। গোটা কলেজ বিল্ডিংয়ের প্রত্যেকটা দেওয়ালে মাটি আর রক্তিমের ঘনিষ্ঠ ছবি লাগানো। আর সেই ছবিগুলোয় দেখা যাচ্ছে, রক্তিম মোটেও ভীত নয়, বা অস্বস্তিতেও পড়েনি, বরং ওর চোখে মুখে একটা লোভাতুর হাবভাব। লালায়িত চোখে ও মাটিকে মাপছে যেন! শুধু তাই নয়, সেই সঙ্গে একটা অডিও রেকর্ডিংও সবার ফোনে ফোনে ঘুরতে থাকে।'
— 'বাব্বা, কি ছিল সেই রেকর্ডিংয়ে?'
— 'কি ছিল না তাই বল্। ভয়েস রেকর্ডিংয়ে শোনা যাচ্ছিল যে ওই রক্তিম মাটিকে ফোন করেছে আর বলছে, ডার্লিং, কাল তুমি আসছ তো কলেজে? যদি আসো, তাহলে অবশ্যই তিনতলার গার্লস কমন রুমে চলে এসো রাত আটটা নাগাদ, যদি না আসো, তাহলে কিন্তু ফল ভালো হবে না, মাথায় রেখো।' 
— 'দেন কি হল রে?' 

(ক্রমশ) 

(একাদশ পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে) 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ