সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
নবম পর্ব
— 'এজন্যই তো ও মাটি রে আম, আমাদের রাণী। সবাই কি আর রাণী হতে পারে রে?' লাবণ্য বলল।
— 'সত্যি লেবু। আসলে মাটিতে সবাই ফসল ফলায়, আবার সেই মাটিকেই মাড়িয়ে হাঁটে। এটাই তো মানুষের স্বভাব।' পম্পার গলাতেও শোনা গেল বিষাদের সুর।
— 'আহ, কি হচ্ছেটা কি!' মৃত্তিকা বলে উঠল, 'এটা কি সাহিত্য সমাবেশ বসেছে নাকি, যে তোরা যে যার মতো সাহিত্যিকদের মতো বুলি আওড়াচ্ছিস! আর এই আম', আম্রপালির দিকে ফিরে মৃত্তিকা বলল, 'তুই এখানে বসে বসে কি জাবর কাটছিস মোষের মতো? তোকে যে প্ল্যানটা বললাম, মাথায় ঢোকেনি তোর? যা যা, এক্ষুণি ক্যান্টিন থেকে বেরো। স্যার এসে নইলে হয়ত আবার তোকে আমাদের সাথে দেখে রাগ করবেন।'
আম্রপালি উঠতেই চাইছিল না, মৃত্তিকাই একরকম ওকে ঠেলেঠুলে ক্যান্টিন থেকে বের করে দিল। অগ্নিস্যার তখন সেদিকেই আসছিলেন, মৃত্তিকার ধাক্কার চোটে ও গিয়ে পড়ল এক্কেবারে স্যারের বুকের ওপর।
দৃশ্যটা বাকি এগারোজনের চোখ এড়াল না। ওরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল আর মিটিমিটি হাসতে লাগল।
— 'আরে আরে সামলে!' আম্রপালির কাঁধদুটো ধরলেন অগ্নি স্যার, 'আরেকটু হলেই তো পড়ে যাচ্ছিলে, এইভাবে কেউ হাঁটে? একটু দেখেশুনে চলবে তো!'
কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিল আম্রপালি, 'সরি স্যার!'
— 'ইটস ওকে। সকালে যেটা বললাম সেটা মনে আছে তো?'
— 'আছে স্যার।'
— 'ভেরি গুড। যাও ক্লাসে যাও।'
আম্রপালি লজ্জিতমুখে ক্লাসে চলে গেল। মনে মনে ভাবল, 'মাটি যে কি করে না! এমন ঠেলল!'
— 'ছোট খোকা বলে অ আ,
শেখেনি সে কথা কওয়া।' হাসতে হাসতে বলল আদরিণী।
— 'কি আলফাল বকছিস আদা? তুই থার্ড ইয়ারে পড়িস না ক্লাস ওয়ানে? সহজপাঠের ছড়া বলছিস!' ধমকে উঠল নৃত্যকলা।
— 'ও মা, বলব না? ক'দিন পরেই তো বিয়ের সানাই বাজল বলে, তারপর আমের যে বেবি হবে সে তো প্রথম কথা অ আই বলবে, অগ্নিস্যারের অ আর আমের আ, হ্যা হ্যা হ্যা।'
— 'হ্যা হ্যা হ্যা! মনে হচ্ছে যেন রামছাগলের হাসি।'
— 'এই কাঁচকলা, একদম ভ্যাঙাবি না আমায়! আমার হাসি তোর হাসির চেয়ে লাখোগুণে ভালো।'
নৃত্যকলাকে সবাই ডাকে কলা বলে, কিন্তু আদরিণী ডাকে কাঁচকলা বলে।
— 'তুই আবার আমায় কাঁচকলা বললি?'
— 'তা ছাড়া আর কি বলব! আমার হাসি তো তবু রামছাগলের মতো, আর তোর হাসি তো শাঁকচুন্নির মতো, শুনলেই লোকের হার্ট অ্যাটাক করবে!'
শুরু হয়ে গেল ঝগড়া। মৃত্তিকা চেঁচিয়ে উঠল, 'আহ! আদা, কলা কি হচ্ছে কি? তোদের নাম এরকম বলে কি সম্পর্কটাও আদায়-কাঁচকলায় করতে হবে? আজব মাইরি!'
— 'যা বলেছিস মাটি। এই আদাটা সত্যিই বিদঘুটে, আজব।'
— 'বাজে বকবি না কাঁচকলা! মাটি মোটেও আমায় আজব বলেনি, বলেছে তোকে। তুই তো ভিনগ্রহের প্রাণী, এলিয়েন একটা!'
এই ঝগড়া কতক্ষণ চলত কে জানে, মৃত্তিকার গর্জনে এই ঝগড়া থামল।
— 'তোরা যদি এক্ষুণি তোদের মুখে কুলুপ না এঁটেছিস, তাহলে লাথিয়ে দুজনকেই বের করে দেব ভেজিটেবল গ্যাং থেকে, বলে রাখছি আমি। মাথাটা বেকার গরম করাস না।'
— 'সত্যি! কথা হচ্ছিল আমের বিয়ে নিয়ে, সেখান থেকে এনাদের ঝগড়া শুরু হয়ে গেল কোত্থেকে!' বিরক্তি দেখাল সুপ্রিয়া।
— 'অনেক আলোচনা হয়েছে। এখান যে যার ক্লাসে যা। দুটো প্রায় বাজল বলে।'
মৃত্তিকার কথায় সবাই ওকে টা টা করে ক্যান্টিন থেকে যে যার ডিপার্টমেন্টে চলে গেল। মাটি শূন্যদৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে রইল। এই দুনিয়ায় হাতে গোনা কিছু মানুষ আছে, যারা ওকে মন থেকে ভালোবাসে, তাদের কথাই ভাবছিল ও। মনের অজান্তে মুখে হাসি ফুটে উঠল ওর।
হঠাৎ টেবিল পরিষ্কার করতে এক মধ্যবয়স্ক মহিলা মৃত্তিকারা যে টেবিলে বসেছিল সেদিকে এগিয়ে এল। মাটিকে দেখেই ও হাসিমুখে প্রশ্ন করল, 'দিদি, তুমি যে শুনছিলাম গ্যাংটক গিয়েছিলে, কবে ফিরলে? আজ?'
— 'হ্যাঁ গো সরস্বতীদি, আজ ফিরলাম। তা তোমার ছেলে এখন আছে কেমন? আর প্রবলেম হয় না তো ওর?'
— 'না গো দিদি, ছেলে আমার ভালো আছে এখন। সবই তো তোমার জন্য দিদি, তুমি যদি টাকাটা না দিতে, তাহলে কি আর ছেলেটার অসুখ সারাতে পারতাম আমি?'
— 'আহ সরস্বতীদি, আবার এসব কথা শুরু করলে কেন বলো দেখি! আমি পাপী তাপী মানুষ, দুটো ভালো কাজবাজ করে যদি পাপের বোঝাটা এট্টু কমে তাই এসব করে বেড়াই আর কি।'
— 'অমন বোলো না দিদি, পাপী তো তারা যারা তোমায় মন্দ কথা বলে। ও দিদি, একটু ওঠো না, টেবিলটা মুছে নিই।'
— 'হুম, নাও।'
টেবিলটা মুছে সরস্বতী চলে গেল। মৃত্তিকার এখনও মনে পড়ে সেই দিনটা। তখন ও ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, হঠাৎ একদিন ক্যান্টিনে এসে শোনে সরস্বতীর এগারো বছর বয়সী ছেলে পলাশের ব্রেন টিউমার ধরা পড়েছে। সরস্বতী জনে জনে ছেলের চিকিৎসার টাকা চেয়ে বেড়াচ্ছিল তখন। তখন শরৎকাল, সামনেই পুজো। প্রতিবার পুজোয় জামা জুতো জুয়েলারি কেনার জন্য মৃত্তিকার হাতে মোটা অঙ্কের টাকা ধরিয়ে দেন ইন্দিরা। টাকাগুলোর বেশিরভাগই খরচ হয় না, জমিয়ে রেখে দেয় ও। সেবছর পুজোয় পাওয়া পুরো টাকাটাই সরস্বতীর হাতে তুলে দিয়েছিল ও। পলাশের টিউমার অপারেশনের পর যাবতীয় ওষুধের খরচও মৃত্তিকাই দিয়েছিল ওকে। সরস্বতী ওকে দুহাত জোড় করে একদিন বলেছিল, 'তুমি মানুষ না গো, তুমি দেবী।' মৃত্তিকা সেকথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল, বলেছিল, 'দেবী আর আমি? হুহ, আমি হলাম মহিষাসুরের ফিমেল ভার্সন, বুঝলে?'
এই সাহায্যের জন্য ইন্দিরার কাছে কম কথা শুনতে হয়নি ওকে।
— 'অত টাকাগুলো চোখের পলকে খরচ হল কি করে? কোন চুলোয় ওড়ালে?'
মৃত্তিকাকে চুপ করে থাকতে দেখে রাগের পারদ আরও চড়ে গিয়েছিল তাঁর মাথায়, চেঁচিয়ে বলেছিলেন, 'মাসির হোটেলে বসে বসে খাচ্ছ পরছ, ইনকাম তো আর করতে যেতে হয় না তোমায়, টাকার মূল্য তাই বুঝবে কি! ভাবছ মাসির বাড়িতে টাকার গাছ আছে, ঝাঁকালেই দু'হাজার টাকার নোট পড়ে!'
তবুও মৃত্তিকা চুপ করে থাকে, কিচ্ছু বলে না। ওকে ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করেন ইন্দিরা, 'কোন্ সাহসে এখনও চুপ করে আছো তুমি? একটা প্রশ্ন করছি তো নাকি!'
রেগেমেগে মৃত্তিকা উত্তর দিয়েছিল, 'কোথায় আবার খরচ করেছি! আমার একটা বয়ফ্রেন্ড বিলিতি কোম্পানির বাইক চেয়েছিল, সেটা কিনে দিয়েছি তাকে! আমার তো আর একটা বয়ফ্রেন্ড না, অসংখ্য বয়ফ্রেন্ড, তাদের এক একজনের এক এক দাবি৷ সবই তো মেটাতে হয়.....'
কথা শেষ করতে পারেনি মৃত্তিকা, তার আগেই ওর গালে নেমে এসেছিল প্রকান্ড চড়।
(ক্রমশ)
(দশম পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে)
0 মন্তব্যসমূহ