মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
অষ্টম পর্ব
আম্রপালি ক্লাসরুমে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই অগ্নিস্যারের ক্লাসে প্রবেশ। ক্লাসে ঢুকেই তিনি একঝলক দেখলেন আম্রপালিকে, তারপরেই রোল কল করতে লাগলেন। ক্লাসের মাঝে মাঝেও তিনি তাকাচ্ছিলেন আম্রপালির দিকে, এতে আম্রপালি ভীষণ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বসেছিল, রাঙা হয়ে উঠেছিল ওর গালদুটো।
ক্লাস দুটো শেষ করে তিনি আম্রপালিকে বললেন, 'একবার স্টাফরুমে এসো, তোমার সাথে কথা আছে।'
আম্রপালি যে মনে মনে অগ্নিস্যারকে পছন্দ করে এটা ক্লাসের কারোর অজানা ছিল না, তাই সবাই লেগপুল করতে লাগল ওকে।
অগ্নিস্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই আম্রপালি দুরুদুরু বুকে রওনা দিল স্টাফরুমের দিকে।
ওকে দেখেই অগ্নিস্যার বললেন, 'এসো, ভেতরে এসো।'
গুটি গুটি পায়ে অগ্নিস্যারের সামনে এসে দাঁড়াল ও।
— 'দেখো আম্রপালি', গম্ভীর গলায় বলতে লাগলেন অগ্নি স্যার, 'তুমি পড়াশুনায় ব্রিলিয়ান্ট, প্রত্যেক বছর শুধু কলেজেই টপ করো তাই নয়, ইউনিভার্সিটির মধ্যেও র্যাঙ্ক করো। তা তুমি কি নিজের কেরিয়ার নিয়ে ভাবো আদৌ? নাকি কলেজ পাসের পরেই ওসব জলাঞ্জলি?'
থতমত খেয়ে গেল আম্রপালি, 'কেন স্যার?'
— 'কেন মানে? তুমি ব্রিলিয়ান্ট, ডিসিপ্লিনড ডিসেন্ট স্টুডেন্ট, কিন্তু সবসময় ওই ভেজিটেবল গ্যাং না কি যেন একটা গ্রুপ আছে, যত ফাঁকিবাজদের আড্ডাখানা, ওখানে সবসময় দেখা যায় কেন তোমায়? তোমায় ভালোয় ভালোয় বলছি, নিজের ভালো চাও তো ওদের অ্যাভয়েড করো, পড়াশুনায় ফোকাস করো, নইলে পচা আলুদের সাথে থাকতে থাকতে তুমিও পচে যাবে। ফার্স্ট সেকেন্ড ইয়ারে ভালো মার্কস পাওয়াটা সহজ ছিল, থার্ড ইয়ার কিন্তু যথেষ্ট টাফ, জানো তো? কথাটা মাথায় রেখো। এখন এসো।'
আম্রপালির বলতে ইচ্ছে হল, 'মাটি পচা আলু না স্যার, ও তো আসলে খাঁটি সোনা।' কিন্তু বলতে পারল না ও, হুঁ হাঁ করে বেরিয়ে এল স্টাফরুম থেকে।
ব্যাজার মুখে আম্রপালি ক্লাসে ফিরে আসতেই সবাই প্রশ্ন করল, 'কি রে, মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে রেখেছিস কেন? স্যারের কি সামনেই বিয়ে, আর তার ইনভিটেশন কার্ড তোর হাতে ধরিয়ে দিলেন?'
— 'যদি সেটাই দিতেন তাহলেও এতটা হার্ট হতাম না রে। কিন্তু উনি আমায় বললেন ভেজিটেবল গ্যাং লিভ করতে, মাটির সাথে না মিশতে। এটা পসিবল বল্ তো তোরা!'
— 'কি অদ্ভুত, স্যার ভুলটা কি বললেন? যা দেখেছেন সেটাই বললেন! আর তাছাড়া তুই পড়াকু মেয়ে, ওদের মতো বেহায়া বখাটে না, তুই কি করে যে ওদের দলে গিয়ে ভিড়লি সেটাই তো অষ্টম আশ্চর্য!'
— 'ধ্যাৎ, তোদের সাথে কথা বলাই বেকার!'
— 'দেখ, আমরা স্যারের সাথে একমত। তুই বরং স্যারের কথাটাই মেনে নে, এতে তোরও মঙ্গল, আর স্যারও ইমপ্রেসড হবেন,সিম্পল!'
টিফিন পিরিয়ডে ভেজিটেবল গ্যাং ক্যান্টিনে বসে আড্ডা দেয় রোজ। আজও তার অন্যথা হল না।
— 'এই আম, কি হল রে তোর? মুখখানা বোদা করে রেখেছিস কেন?' প্রশ্ন করল মৃত্তিকা।
— 'আমার মনে হয় সামনেই স্যারের বাচ্চার অন্নপ্রাশন, আর সেই অনুষ্ঠানে ফোটোগ্রাফি করার জন্য আমকে ইনভাইট করেছেন উনি, ঠিক বললাম?' সুপ্রিয়া হাসল।
— 'ভুলভাল বকিস না স্যুপ, মুখটা বন্ধ রাখ।'
— 'তাহলে ঠিকটা তুইই বল না, নইলে জানব কোত্থেকে?' প্রশ্ন করল তিতলি।
— 'কি আর বলব তেঁতুল, উনি যদি আমার ক্রাশ না হতেন, ওনার মুখের ওপর আজ দুটো কথা বলতামই বলতাম!'
— 'এই আম, ভণিতা না করে সোজাসুজি বল তো কি হয়েছে!'
— 'উনি আমায় ভেজিটেবল গ্যাং ছাড়তে বললেন রে মাটি, বললেন তোদের সাথে মিশলে নাকি আমার কেরিয়ার রসাতলে যাবে! তুইই বল এটা কোনো কথা হল?'
— 'কি!' মৃত্তিকা এবং আম্রপালি বাদে বাকি দশজন হাঁ হাঁ করে উঠল, 'আমরা খারাপ? আমাদের সাথে থাকলে তোর ক্ষতি হবে? মাটি, দেখেছিস, ওই অগ্নিস্যারটাকে বাইরে থেকে দেখে ভালো লোক মনে হয়, ভেতরে ভেতরে পাক্কা....'
— 'আহ, থাম তো! তোরা সবাই ব্যাপারকে নেগেটিভলি দেখছিস কেন? একটু পজিটিভলি দেখ না ভাই!'
— 'কি পজিটিভলি নেব?' পম্পা বলে উঠল, 'ভেজিটেবল গ্যাঙের মাথা হলি তুই রে মাটি, এই ভেজিটেবল গ্যাংকে অপমান করা মানে ঘুরিয়ে তোকেই অপমান করা, আর তোর অপমান আমরা কেউ সহ্য করব না!'
— 'একদমই তাই! ওই অগ্নিদেব পালকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেব, যে আমাদের গ্যাংকে অপমান করার ফল কি হতে পারে!' গর্জে উঠল যামিনী।
— 'ওরে আমার ফ্রিডম ফাইটার, সবসময় দেখে নেব বুঝিয়ে দেব এই ভাবটা ছাড় তো! তোরা যদি স্যারকে উত্ত্যক্ত করিস, ওনার কি আমাদের প্রতি ধারণাটা পাল্টাবে? উলটে আরও ঘৃণা করবেন না উনি আমাদের?'
— 'তাহলে বস, উপায় কি?' মালবিকা মাথা চুলকে প্রশ্ন করল।
— 'শোন বলি। তোরা আস্ক করলি, এই ব্যাপারটায় কি পজিটিভ আছে! আরে বাবা, পজিটিভ তো আছেই! স্যার আলাদাভাবে আমকে ডেকে আমাদের থেকে দূরে থাকতে বললেন, ওকে পড়াশুনায়, কেরিয়ারে ফোকাস করতে বললেন, এটা কি কম আনন্দের কথা? এর মানে হল আমকে উনি কেয়ার করেন, বাকি স্টুডেন্টদের থেকে ওকে নিয়ে উনি একটু বেশিই কনসার্ন, কি বুঝলি গাধাগুলো?'
— 'বুঝলাম তো অনেককিছুই। প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁ......'
— 'থাম আলু, ক্যান্টিনে আর নহবত বাজিয়ে কাজ নেই। আসল প্ল্যানটা শোন। আম, তুই স্যারের কথামতো চল, উনি যা চাইছেন সেটাই কর।'
— 'সরি মাটি, আমায় ক্ষমা কর, স্যারকে ইমপ্রেস করতে গিয়ে তোদেরকে হারাতে চাই না আমি।' আম উঠে পড়তে যাচ্ছিল, মাটি ওর হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিল, 'আরে ছাগল, তুই কি সত্যি সত্যি ভেজিটেবল গ্যাং লিভ করছিস নাকি? এ তো ক'দিনের অভিনয়! একবার স্যার ধরা দিন তোর প্রেমের জালে, তারপর তুই ওনাকে সবটা খুলে বলবি। আর তাছাড়া উনি তখন আমাদের জিজু হবেন, শ্যালিকাদের ওপর রাগ করে থাকতেই পারবেন না।'
— 'বাহ ভালো বললি। তাহলে স্যার যতদিন ইম্প্রেস না হবেন, ততদিন তোদের সাথে কথা বলা, ঘুরতে যাওয়া, সব বন্ধ তো?'
— 'কে বলল বন্ধ? তোর সাথে ভেজিটেবল গ্যাঙের কোনো সম্পর্ক থাকবে না, তবে তা শুধু কলেজ ক্যাম্পাসে। কলেজের বাইরে তো আমাদের সাথে সম্পর্ক তোর সেম থাকবে।'
— 'ধুস, তাহলে তো কলেজে আসার মজাটাই থাকল না!'
— 'কেন থাকল না? তোর অগ্নিস্যার তো আছেন নাকি! শোন্ আম, আর অমত করিস না, আমার বুদ্ধিমতো চল।'
— 'সত্যি মাটি, লোকে তোকে কত খারাপ বলে, অথচ তারা কোনোদিন তোর ভালো দিকগুলো দেখল না! নিজে অপমান সয়েও বন্ধুদের ভালোটাই তুই ভেবে যাস, তবু এই কলেজের কেউ তোকে বুঝল না।' আম্রপালি শ্লেষের হাসি হাসল।
(ক্রমশ)
(নবম পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে)
0 মন্তব্যসমূহ