মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সপ্তম পর্ব
হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা মাটিতে ফেলে উঠে দাঁড়াল মাটি। পা দিয়ে মাড়িয়ে ফেলল সিগারেটটা। দুমড়ানো মোচড়ানো সিগারেটটা থেকে তখনও ধোঁয়া উড়ছিল কুন্ডলী পাকিয়ে।
— 'এই মেয়ে! এক্ষুণি মুখটা বন্ধ কর, নইলে কিন্তু!' প্রকান্ড চড় তুলল মালবিকা, কিন্তু মাটি আটকাল।
— 'কি লাভ মুলো ওকে মেরে? তুই মারবি, ও এক্ষুণি প্রিন্সিপাল ম্যামের কাছে গিয়ে নাকে কান্না কাঁদবে, গালে পাঁচ আঙুলের দাগ দেখাবে, মাঝখান থেকে তুই বিশাল ঝাড় খাবি', বাঁকা হাসি হাসল মাটি, 'তার চেয়ে এমন টাইট দেব ওকে, না পারবে গিলতে, আর না পারবে উগরোতে।'
ইশারায় ও ডাকল শশধরকে। মাথা চুলকে শশধর এসে দাঁড়াল ওর সামনে।
— 'শোন্ শশা, এক কাজ কর। এ মেয়ের যা রাগ, মেজাজ দেখাতে গিয়েই সব এনার্জি নষ্ট করে ফেলেছে, এখন দোতলায় ক্লাসে কি করে যাবে? তার চেয়ে তুই এক কাজ কর, ওকে কোলে নিয়ে ক্লাসে দিয়ে আয় তো!'
— 'একদম। ক্লাসে গিয়ে ও যে বেঞ্চে বসে, সেই বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে এসে তবে ফিরবি।' বাঁকা হেসে বলল তিতলি।
— 'কিন্তু....' আমতা আমতা করতে লাগল শশধর।
— 'কি কিন্তু? তোকে সবাই লেডিস বলে, তোর লজ্জা করে না ছাগল? আজ সময় এসেছে, একটা ক্লান্ত অবসন্ন অসহায় মেয়েকে ক্লাসে পৌঁছে দিয়ে তুই প্রমাণ করে দে যে তুই মেয়ে না, তুই একটা পুরুষমানুষ।' শশধরের পিঠ চাপড়ে বলল লাবণ্য।
— 'আহ!' গর্জন করে উঠল মৃত্তিকা, 'এত বকবক শুনে আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে! শশা, তুই যাবি কিনা!'
শশধর শান্তশিষ্ট ছেলে, কোনোমতে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল দুহিতার দিকে। দুহিতা কটমট করে তাকাল, 'একদম না শশধরদা, একদম না।'
কিন্তু শশধর দুহিতার কোনো আপত্তিতে কান না দিয়েই ওকে কোলে তুলে নিল। এই দৃশ্য দেখে ভেজিটেবল গ্যাং সমস্বরে বলে উঠল, 'জিও শশা, জিও!'
দুহিতা হাত পা ছুড়তে লাগল, 'এর ফল ভালো হবে না বলছি! শশধরদা, নামাও আমায়! সবার সামনে নাটক কোরো না।'
শশধর দুহিতাকে কোলে নিয়ে ক্লাসরুমে পৌঁছে দিল। এই দৃশ্য দেখে গোটা ক্লাসরুম হাসিতে ফেটে পড়ল। রাগে লাল হয়ে গেল দুহিতা, দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল, 'মৃত্তিকা বণিক, তোমায় আমি দেখে নেব!'
— 'দুহিতা', শশধর এতক্ষণে মুখ খুলল, 'জলে থেকে কুমিরের সাথে লড়াই করতে যাস না রে।'
— 'কেন? কলেজটা কি ওর কেনা নাকি?'
— 'জানিস দুহিতা,' শশধর শ্লেষের হাসি হেসে বলল, 'সবার মতো তুইও মাটিকে খারাপ মেয়ে ভাবলি, নিজের শত্রু ভাবলি। কিন্তু ও আসলে একটা নারকেলের মতো রে। বাইরে তোকে নিয়ে ইয়ার্কি করবে, লেগপুল করবে, কিন্তু যেদিন সমস্যায় পড়বি, সেদিন..... যাক, বাদ দে। আমার ক্লাস আছে, আমি আসি।'
— 'হুঁহ্, মাটির চ্যালা একটা!'
হেসে ফিরে তাকাল শশধর, 'তা ঠিক কথা। আসলে কি জানিস, মাটিকে আমি খুব রেসপেক্ট করি, তাই কলেজের আর পাঁচটা ছেলে ওকে নিয়ে যে এত বাজে মন্তব্য করে, ওর চরিত্র নিয়ে কুৎসা করে, সেসব আমি অ্যাক্সেপ্ট করতে পারি না একদম, আর তাই তো আমার একটাও পুরুষ বন্ধু নেই, ওই এগারোজনই আমার বেস্টফ্রেন্ড এই কলেজে। তোরা আমাকে নপুংসক, লেডিস, যা ইচ্ছে বলতে পারিস, তবু আমার লাইফের শেষ দিন পর্যন্ত মাটির প্রতি রেসপেক্টটা আমার সেম থেকে যাবে। টা টা।'
শশধর আর দাঁড়াল না।
দুহিতা মুখ বেঁকিয়ে বসে পড়ল। আশপাশ থেকে উড়ে আসতে লাগল কমেন্ট, 'কি রে দুহিতা, ফার্স্ট দিনেই বয়ফ্রেন্ড জুগিয়ে ফেললি?' অনেকে বলল, 'বুঝলি না! ফার্স্ট দিন থেকেই ভেজিটেবল গ্যাংকে হাতে রাখতে চাইছে, নইলে বাড়তি সুযোগ সুবিধা পাবে কি করে বল?'
গোটা ক্লাসরুম অট্টহাসিতে ভরে গেল। টেবিল চাপড়ে দুহিতা গর্জে উঠল, 'শাট আপ!'
— 'এইবারে আমায় ক্লাসে যেতে হবে রে। স্যার এক্ষুণি চলে আসবেন, অ্যাটেনডেন্স মিস হয়ে যাবে।' আম্রপালি ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ যা, তোর কিসের এত তাড়া তা কি আর জানি না? আজ তো ফার্স্ট দুটো ক্লাসই অগ্নিস্যারের, তাই তো....' হাসল মাটি।
— 'ধুস! যত্ত বাজে কথা!' লজ্জায় লাল হয়ে সেখান থেকে যেন পালিয়ে বাঁচল আম্রপালি।
এরপর আরও বেশ কয়েকজনের পর নয়নার ডাক পড়ল।
— 'উরি শালা, এ তো পাঁকে পদ্ম রে মাটি!' এলোকেশী ব্যঙ্গ করল।
— 'তাই তো দেখছি! এই মেয়ে, কলেজে পড়তে এসেছিস? নাকি ছেলেদের মনে ঝড় তুলতে?'
মাটির মুখে এরকম কথা শুনে লজ্জায় কুঁকড়ে গেল নয়না, মনে মনে কিছুটা বিরক্তও হল ও, কিন্তু সে ভাব মুখে প্রকাশ করল না ও, বলল, 'কেন মৃত্তিকাদি?'
— 'ওও ব্বাবা, এ তো শুধু রূপ দিয়ে না, মিষ্টি কথা দিয়েও মন ভোলাতে পারে! তা তুমি কি সত্যিই এরকমই ন্যাকা বোকা? কিছুই বোঝো না? নাকি নেকু দুখী সেজে সবাইকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করতে চাও তুমি? কোনটা?' নৃত্যকলা ব্যঙ্গ করল।
— 'বাদ দে, ও কাকে কিসে ভোলাবে সেসব ওর পার্সোনাল ম্যাটার,' মাটি বলল, 'কিন্তু এই কলেজে চোখে ওরকম মোটা কাজল, কানে ভারী দুল, চুমকিবসানো ওড়না, পায়ে নূপুর, হাতে চুড়ি, ডিপ কালারের লিপস্টিক এসব কেউ পরে আসে না। এটা কলেজ, কোনো বিয়েবাড়ি না যে রাজ্যের যত জুয়েলারি গায়ে চাপিয়ে আসবি, মনে থাকবে?'
— 'থাকবে।' মুখে হ্যাঁ বলল ঠিকই নয়না, কিন্তু ওর দুহিতার মত প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হল, 'কেন মৃত্তিকাদি? তুমিও তো চোখে মোটা কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক, হাতে বালা পরে এসেছ, সে বেলায় তো দোষ নেই! এম.এল.এ-র আত্মীয় বলে কি তোমার সাতখুন মাপ?'
কিন্তু ও এসব কিছুই মুখে বলল না।
— 'ওর জন্য কি টাস্ক বরাদ্দ হবে বস?' লাবণ্য প্রশ্ন করল মৃত্তিকাকে।
— 'ওকে ছেড়ে দে তোরা। ও খুব শান্তশিষ্ট ভালোমানুষ মেয়ে, বুঝছিস না? তোর আমার মতো বখাটে না ও যে লোকে হাজারটা বাজে কথা বললেও নির্লজ্জের মতো সেসব গায়ে না মেখে দাঁত কেলিয়ে বসে থাকবে। ও নরম মাটি, দুটো কড়া কথা বললেই ও এক্ষুণি ভ্যাঁ করে কেঁদে ভাসাবে, তখন পারবি সামলাতে? তার চেয়ে ছেড়ে দে ওকে।' নয়নার দিকে ফিরে মাটি বলল, 'আজ তোকে ছেড়ে দিলাম, তাই বলে ভাবিস না যে পরে কিছু হবে না তোর সাথে! এখন যা, ক্লাসে চলে যা ফটাফট।'
— 'এটাই তোর দোষ মাটি। কেউ দুটো নরম গলায় কথা বললেই অমনি তোর মন গলে যায়!' মালবিকা বলল।
— 'কি আর করি বল! আমার নামটাই তো মাটি, রোদে তাপে শুকিয়ে কাঠ, কিন্তু বৃষ্টি হলেই.....যাকগে যাক। তোরা এবার ক্লাসে যা রে গাধাগুলো, নইলে অ্যাটেনডেন্স মিস হয়ে যাবে, যা ফোট।'
(ক্রমশ)
(অষ্টম পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে)
0 মন্তব্যসমূহ