Advertisement

মাটি (দ্বিতীয় পর্ব)

মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 
দ্বিতীয় পর্ব


রমেন বললেন, 'ঠিক আছে বাবা আমি যাব না ভেতরে। নয়ন, যা মা আর দেরি করিস না।'
নয়না রমেনকে প্রমাণ করে বলল, ' আসি বাবা তাহলে?
— 'হ্যাঁ যা মা।' নয়নকে আশীর্বাদ করে রমেন বললেন।

 গেট পেরিয়ে নয়না পা দিল কলেজের ক্যাম্পাসে। খুব সুন্দর পরিবেশ। একটু এগিয়েই বিল্ডিং এ, কিছু দূরে বিল্ডিং বি, বিল্ডিং বি ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে এদিকটায় লাইব্রেরী আর উল্টোদিকে অফিস রুম। বিল্ডিং 'এ'র উল্টোদিকে বাগান, সেখানে কত রকমারি গাছ আর পাখিদের কলকাকলি। মনটা একেবারে ভরে গেল নয়নার। বিল্ডিং সি যেতে হলে বাগানটা পার করেই যেতে হয়। গাছগাছালির আড়ালে বিল্ডিং সি ভালোভাবে দেখা যায় না।

হঠাৎ একটা কোকিল মিষ্টি স্বরে ডেকে উঠল। নয়নার মনে হল কোকিলটা যেন ওকেই স্বাগত জানাচ্ছে নতুন কলেজে।

— 'ওই মেয়ে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধ্যান করছিস নাকি?

নয়না চমকে পিছনে তাকাল। একটা মেয়ে, চোখে সানগ্লাস, মুখে চুইংগাম। নয়নার মনে হল ওর থেকে দু'এক বছরের বড়ো হবে মেয়েটা, চুইংগাম চিবোতে চিবোতে বলল, 'কে রে তুই? নতুন নাকি এখানে? আগে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না! নাম কি?' 
— 'নয়না। হ্যাঁ আমি নতুন, আজ এসেছি....'
— 'থাক থাক বুঝেছি। আজ অ্যাডমিশন তো?' 
— 'হ্যাঁ।' 
— 'তোর ভাগ্য ভালো যে আমার চোখে পড়েছিস, ভেজিটেবল গ্যাঙের হাতে পড়িসনি, তহলে আর দেখতে হত না। শোন্ বস, ওদিকে বিল্ডিং সি, তুই যেদিকে যাচ্ছিস। হাঁদার মতো কাজগুলো ভাই এই কলেজে করিস না, লেগপুল করে তোকে মেরে ফেলবে সবাই। অফিসটা ওই দিকে, যা চলে যা।'
— 'ওকে থ্যাংক ইউ।' ও একদম উল্টোপথে চলেছিল, নিজের বোকামিতে নিজেই মনে মনে হাসল নয়না।
— 'আরে আরে দাঁড়া, কেথায় চললি? আচ্ছা স্বার্থপর তো তুই! আমি হেল্প করলাম আর আমার নামধাম না জেনেই উনি চললেন নিজের কাজ বুঝে নিতে! শোনো, সুজি এসব একদম সহ্য করে না।'
— 'ওহ, সরি। কি নাম তোমার?
— 'সুজাতা দত্তরায়। ডাকনার সুজি। তবে তুই আমার জুনিয়র, সো ডাকনাম ধরে ডাকার রাইট তোর নেই। বুঝলি?' সুজতা হাসতে লাগল।
— 'না না, ঠিক আছে। তোমার কি থার্ড ইয়ার সুজাতাদি?'
— 'হুম।' 

হঠাৎ সুজাতার মোবাইলে মেসেজের টোন রেজে উঠল। মেবাইলে চোখ রেখেই সুজাতা চেঁচিয়ে উঠল, 'তোর সাথে হেজাতে গিয়ে কত লেটই না হয়ে গেল! ওরে থার্ড ইয়ারে পড়ি বলে কি বয়ফ্রেন্ডকেও শিকেয় তুলে রাখব? যা হাঁদুরাম, যা যা, ওদিকে ওই গাধাটা তো আমার জন্য ওয়েট করে করে হেদিয়ে ম'ল!' 

সুজাতা ছুটে যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। বলল, 'এই মেয়ে, তোর মোবাইলটা দে তো!' 
— 'কেন?' 
— 'আরে দূর,আবার কেন! আমি সিনিয়র, চাইছি, তাই দিবি, ব্যস!'

সুজাতা নয়নার হাত থেকে মোবাইলটা একরকম কেড়ে নিল, তারপর খুটখুট করে কিছু টাইপ করে নয়নাকে মোবাইলটা নিয়ে বলল, 'শোন নমিতা...'
নয়না আপত্তি করল, 'নমিতা নয়, নয়না।'
— 'আবার কথা বলে! এই একই হল! আসল কথটা শোন্ না! তোর মোবাইলে আমার ফোন নাম্বারটা সেভ করে দিয়েছি। দরকার হলে ফোন করিস। তাই বলে আবার যখন তখন করবি না! যদি তোর ফোনের জন্য আমার কাঁচা ঘুম ভেঙেছে কোনোদিন, তাহলে মাথায় এক গাঁট্টা মের শিং উঠিয়ে দেব! যাই হোক, চললাম বস।' নয়নার কাঁধ চাপড়ে সুজাতা চলে গেল।

অ্যাডমিশন পর্ব ভলেভাবেই মিটল। নয়না একটু আগে পৌঁছে যাওয়ায় অফিসে ভিড় ছিল না তেমন।

অ্যাডমিশনের সপ্তাহখানেক পর ক্লাস শুরু হল। ক্লাস শুরুর প্রথম দিনে ডিপার্টমেন্টাল হেড ডিপার্টমেন্টের সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন ছাত্রছাত্রীদের। সব শিক্ষক শিক্ষিকারাই উপস্থিত ছিলেন আজ, শুধু একজন ছাড়া, তিনি ডঃ সুবীর মিত্র। 

পরের দিন প্রথম ক্লাসটাই সুবীর স্যারের। মধ্যচল্লিশের কাছাকাছি বয়স। ক্লাসে এসেই সকলের নাম, বাড়ি, ঠিকানা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে চাইলেন। নয়নার পালা আসতেই, ওকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে তিনি প্রশ্ন করলেন, 'কি নাম তোমার?'
— 'নয়না, নয়না বসু।'
— 'আরে বাঃ, সাবাশ নাম তো! তবে একদম যোগ্য নামই বটে। একটা কথা বলি, কিছু মাইন্ড করবে না তো?'
— 'না স্যার, বলুন না।'
— 'তোমার ওই কাজল পরা চোখদুটো খুব সুন্দর। তোমার চোখদুটো থেকে তো আর চোখই সরাতে পারছিনা।'

ক্লাসে একটা হাসির রোল পড়ে গেল, নয়না খুব অস্বস্তিতে পড়ল, কি বলা উচিত বুঝতে না পেরে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। পিছনের দিক থেকে তো কয়েকটা সিটির আওয়াজও পাওয়া গেল। 

সুবীর হাসতে হাসতে বললেন, 'কিছু মাইন্ড করলে নাকি? বোসো বোসো।' পিছন থেকে মন্তব্য উড়ে এল, 'নয়নমণি, কতক্ষণ আর সং সেজে দাঁড়িয়ে থাকবে? বসে পড়ো, বসে পড়ো।'

নয়নার চোখে জল এল। কোনো কথা না বলে ও বসে পড়ল। পরপর দুটো ক্লাসই সুবীর স্যারের ছিল, অনেক কষ্টে দাঁতে দাঁত চেপে কান্নাটা যাতে চোখ ছেড়ে বাইরে আসতে না পারে তার অপরিসীম চেষ্টা করে মাথা নীচু করে বসেছিল ক্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত। 

ক্লাসটা শেষ হওয়ার পড় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল নয়না, কিন্তু স্বস্তি কেথায়? স্যার গেলেন বটে, কিন্তু পিছনের দিকে বসা বখাটে ছেলেমেয়েগুলোর কি টোন কাটা বন্ধ হয়? বিরক্ত হয়ে নয়না বেরিয়ে পড়ল ক্লাস থেকে, ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটা চেনা কন্ঠ কানে এল ওর। 

(ক্রমশ) 

(তৃতীয় পর্ব আসবে আগামী পরশু এই পেজে) 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ