Advertisement

মাটি (প্রথম পর্ব)

মাটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
প্রথম পর্ব


নয়নার নতুন জীবন

নয়না তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে কাজল পরছিল। পিছন থেকে তার বোন সুমনা ফুট কাটল, 'ওগো কাজলনয়না, তোমায় কোথায় রাখি আমি!'
নয়না কিছু না বলে হেসে আবার কাজল পরতে লাগল।ছন্দা এসে ছোটমেয়ের কানটা মলে দিয়ে বললেন, 'আবার দিদির পেছনে লাগা হচ্ছে?'
— 'উফ মা, লাগছে, ছাড়ো না!' কানে হাত দিয়ে সুমনা চেঁচিয়ে উঠল।
— 'ভালো হচ্ছে, লাগার জন্যই তো ধরেছি। তোর না সামনে টেস্ট, পড়াশুনোর নাম নেই, সারাদিন খালি ফাজলামি!'
— 'মা, ও ছোট, ওকে ছেড়ে দাও না, ওর লাগছে তো!' নয়না বলল।
— 'এই তোর প্রশ্রয়েই ও দিন দিন বাঁদর হয়ে উঠছে। বেশ, যাকে নিয়ে মজা করে, তারই যদি গায়ে না লাগে, তবে আমার আর কি?' সুমনার কান ছেড়ে দিয়ে ছন্দা চলে গেলেন।

  সুমনা এসে নয়নার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, 'এতদিন মায়ের হাত থেকে তুই ই আমায় বাঁচিয়েছিস। কিন্তু দুদিন পরেই তো তুই চলে যাবি, তখন কে বাঁচাবে আমায়?'
নয়না সুমনার গাল টিপে বলল, 'দূর পাগলী,আমি কি একেবারে চলে যাচ্ছি নাকি? ছুটি পড়লেই তো চলে আসব, আর তোর জন্য কত সুন্দর সুন্দর গিফট আনব দেখিস!'
— 'না দিদি, আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর গিফট টা তো তুই, আমার আর কিছু লাগবে না। তুই কেন যাচ্ছিস বল্ তো? না গেলেই কি নয়?'
— 'না নয়!' রমেন এসে বললেন, 'সুমি,তোর দিদি কত ভালো কলেজে চান্স পেয়েছে বল্ তো? ক'জন এমন সুযোগ পায়? আর ও পেয়েও হাতছাড়া করবে?'
রমেন মনে মনে বললেন, 'নয়ন আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে কি শুধু তোর একার কষ্ট হচ্ছে সুমি? আমাদের কি বুক ফাটছে না? কিন্তু এমনভাবে ভেঙে পড়লে নয়ন যাবে কি করে মন শক্ত করে?' সবার অলক্ষ্যে রমেন দুফোঁটা চোখের জল মুছে নেন।
সুমনা ছুটে এসে বলল, 'দেখো বাবা, দিদিকে কাজল পরে কি সুন্দর লাগছে না বলো?'
— 'জানি মা, ওর চোখের দৃষ্টি বড় মায়াময়, অমন গভীর কালো চোখদুটোর গভীরতায় ডুব দিয়েছে যে, সেই টের পেয়েছে ওর মনের অন্তহীন সারল্য। জানিস সুমি, ওর জন্মের পর যখন ওর অমন চোখদুটো আমি প্রথমবার দেখেছিলাম, তখনই মনে মনে ঠিক করেছিলাম, এ মেয়ের নাম নয়না ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনা।'
— 'হ্যাঁ বাবা, একদম ঠিক। ও হল কাজলনয়না হরিণী!' সুমনা মুচকি হাসে।
— 'অনেক হয়েছে, এবার থামো তোমরা!' নয়না লাজুক হেসে বলে।

নয়নাদের বাড়ি উত্তরবঙ্গে। উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করে কলকাতার দিকে এক নামী ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে নয়না। তাই বাড়ির মানুষগুলোর উচ্ছ্বাসের সীমা নেই, কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ির কোনায় কোনায় যেন লুকোনো বিষাদের ছায়া। বাড়ির বড়ো মেয়েটা দুদিন পরেই চলে যাবে যে বাড়ি ছেড়ে! ছন্দা বললেন, 'অমন শান্তশিষ্ট মেয়েটাকে অত দূরে পাঠাচ্ছ, ও পারবে তো মানিয়ে থাকতে?'
রমেন বললেন, 'হ্যাঁ গো হ্যাঁ, ঠিক পারবে। ওকে তো আজ দেখছি না। এখানে যেমন সবাই ওকে ভালোবাসে, তেমন ওখানেও বাসবে দেখো। ওর ওই শান্ত দৃষ্টি যে দেখেছে, সেই ওকে না ভালোবেসে পারেনি।'
— 'হ্যাঁ সেটা ঠিক।'

দেখতে দেখতে এসে পড়ল সেই প্রতীক্ষিত দিন, অবশ্য অপ্রতীক্ষিত বললেও কিছু ভুল বলা হয় না। যাবার আগে যখন নয়না বাবাকে প্রণাম করল, তখন কাজলমাখা দুফোঁটা উষ্ণ কালো জল রমেনের পায়ে পড়েছিল, মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে তিনিও শিশুর মতোই কাঁদতে শুরু করেছিলেন।
— 'বাবা, তোমরা সবাই এরকম করলে আমি কি করে যাই বলো তো!'
ছন্দা শাড়ির আঁচল দিয়ে নয়নার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললেন, 'না মা, আমরা কেউ আর কাঁদব না। তুই যা, ওখানে গিয়ে মন দিয়ে পড়াশুনা করবি, জীবনে বড়ো হবি, আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করবি। একবার ওখানে মন বসে গেলে দেখবি, আর আমাদের কথা মনেই পড়বে না।'

  বাবার হাত ধরে নয়না চোখের জল মুছে বাড়ির গেট পার করল। বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছিল, সমস্ত লাগেজ ডিকিতে ভরে রমেন আর নয়না গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসলেন। সুমনা তখনও ঘুমোচ্ছিল, গাড়ির শব্দে ঘুম ভেঙে ছুটে আসতেই দেখল, গাড়িতে দিদিরা চলে যাচ্ছে।
সে ছুটে এসে ছন্দাকে বলল, 'দিদি চলে গেল, আর আমাকে একবারটি ডেকে দিলে না!'
— 'কাল সারারাত নয়ন চলে যাবে বলে বালিশে মুখ গুঁজে তুই কাঁদছিলি, ভাবিস না এটা আমার চোখ এড়িয়েছে।ভোরবেলার দিকে তুই একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলি, তাই আর ডাকিনি।'
— 'মা, বাড়িটা যে ফাঁকা হয়ে গেল।'
— 'শুধু কি বাড়িটা রে? তুই আর নয়ন যে আমার বুকের পাঁজর। আমার বুকের পাঁজরটা যেন কেউ উপড়ে নিয়ে গেল রে সুমি!' সুমনাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলেন ছন্দা।

ওদিকে ট্রেন ছুটছে ঝড়ের বেগে। বাবার সঙ্গে গল্প করতে করতে কখন যে বাবার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়ালই নেই নয়নার। যখন ঘুম ভাঙল, তখন সূর্যদেব তাঁর লাল আভা গুটিয়ে বিদায় নিয়েছেন পশ্চিমের ওই দূরের সবুজ জঙ্গলের আড়ালে। অন্ধকার তার কালোছায়া মাখা ওড়নাটা সরে মেলেছে মাত্র, যে ওড়নার ভেতর দিয়ে চোখ রাখলে চাঁদ-তারা- নীহারিকার মায়ার খেলা প্রত্যক্ষ করা যায় খুব সুন্দরভাবে। কিন্তু সেইসব দেখার মানসিকতা একেবারেই নয়নার ছিল না। চোখ খুলেই ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'বাবা কোথায় এলাম আমরা?'

— 'ব্যস্ত হস না মা, কলকতা আসতে এখনো ঢের দেরি। তুই ঘুমো আমার কোলে, যেমনটা ছোটবেলায় ঘুমোতিস।'

ক্লান্ত মেয়েটা আবার ঢলে পড়ল বাবার কোলে। সিগন্যালের জন্য ট্রেনটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আকশের দিকে তাকিয়ে রমেন ভাবলেন, 'সেদিন চারমাসের মেয়েটাকে যখন ঘুম পাড়াতাম তখন যেমনি ছিল ওই তারাদের সাজসজ্জা, পূর্ণিমার চাঁদের অফুরন্ত আলো, আজও ঠিক তেমনই আছে, সবই আছে, কিন্তু কেমন যেন ফ্যাকাশে লাগছে সবকিছু।'

ট্রেনের দুলুনিতে রমেনের চোখটাও যে কখন লেগে গেছিল তা টের পাননি রমেন। হঠৎ একটা কোলাহল আর হৈ-হট্টগোলের আওয়াজে তাঁর ঘুম ভাঙল। তাঁদের গন্তব্য স্টেশন এসে গেছে। চোখ কচলতে কচলাতে নয়নাও উঠে বসল। রসেন দেখলেন, স্টেশনের বড়ো ঘড়িটায় সাড়ে ন'টা বাজছে। স্টেশন থকে অনতিদূরে একটা হোটেলেই সেই রাতটা কাটল দুজনের।

পরদিন সকাল থেকেই ব্যস্ততার সীমা নেই বাবা মেয়ের। আজ কলেজে নয়নার ভর্তি হওয়ার দিন। নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই কলেজের কাছে পৌঁছে গেছেন রমেন আর নয়না। গেটে দাঁড়িয়ে গার্ড বলল, 'গার্জেনরা অ্যলাওড নন, শুধু স্টুডেন্টরা ঢুকবে কলেজের ভেতরে।'

(ক্রমশ)


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ