অষ্টবিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দরজাটা খুলে আরেক দফা চমকানোর পালা রবির।সে দরজাটা খুলতেই পুলিশ এসে ঢুকে পড়ল ঘরে,সাথে কয়েকজন মহিলা পুলিশও।মহিলা পুলিশরা এসেই সাগরিকাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল,বারবার ডাকতে লাগল,চোখেমুখে জল ছেটাতে লাগল,কিন্তু জ্ঞান ফিরল না সাগরিকার কিছুতেই।শেষে ওরা বলল,'স্যার,মেয়েটাকে এক্ষুণি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে!'
— 'উফ একলা মেয়ে পেয়ে কি অত্যাচারটাই চালিয়েছে জানোয়ারটা!' বলাবলি করতে লাগল ওরা।
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ প্লিজ,প্লিজ ওকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন,ওর জ্ঞান ফিরছে না যে!' রবি ব্যস্ত হয়ে বলল।
— 'এই তুই চুপ কর্ একদম!' পুরুষ পুলিশদের মধ্যে একজন ধমকে উঠল,'মেয়েটাকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে এসে আধমরা করেছিস একেবারে,এখন একটা কথা বললে এমন লাঠির বাড়ি মারব যে এখানেই মরে পড়ে থাকবি!'
— 'কি বলছেন টা কি!আমি কেন ওর এই অবস্থা করতে যাব?'
— 'থাক রবি,অনেক নাটক করেছ,এবার থামো!'
সাগরিকার মামা এসে বললেন।সেই সাথে এলেন সাগরিকার মামীমা,অভ্রর মা বাবা,এমনকি অভ্র আর তার বন্ধুবান্ধবরাও!সাগরিকার মামা বলে যেতে লাগলেন,'আমাদের মেয়েটাকে বিয়ের দিন তুলে এনে ওর এত বড়ো সর্বনাশটা করলে?কি ক্ষতি করেছিল ও তোমার?ও শুধু তোমায় প্রত্যাখ্যান করেছিল,তার জন্য এই অবস্থা করলে?'
— 'আঙ্কেল এসব কি বলছেন টা কি আপনি?সাগরের এই অবস্থার জন্য আপনি আমাকে দায়ী করছেন?আমি সাগরকে ভালোবাসি,আমি ওর এই অবস্থা করতে পারি কখনো?'
— 'প্লিজ রবি!' অভ্র মিথ্যে কান্না কেঁদে হাতজোড় করল,'আমার রিকাকে ছেড়ে দে!কেন এভাবে ওর পেছনে পড়ে আছিস তুই?রিকা আমাকে ভালোবেসেছে,তোকে বাসেনি এটাই কি ওর দোষ?সেইজন্যই এত বড়ো শাস্তিটা দিলি ওকে?কি করে পারলি রবি!' অভ্র কপট কান্নায় ভেঙে পড়ল।
— 'কাঁদেনা বাবা,' অভ্রর মা এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,'নির্দোষ মানুষের কোনো ক্ষতি হয়না,সাগরিকারও হবে না দেখিস।ও সুস্থ হয়ে যাক,তারপর আমাদের ঘরের লক্ষ্মী করে নিয়ে আসব ওকে!'
— 'আপনারা মানুষ নন,আপনারা দেবতা!' গদগদ কন্ঠে সাগরিকার মামীমা বললেন,'এতকিছুর পরও আমাদের নষ্ট মেয়ের সাথে আপনাদের ছেলের বিয়ে দেবেন আপনারা?'
— 'এ আপনি কি বলছেন আন্টি!' অভ্র বলল,'আমার রিকা কোনোদিন ওই অমানুষ রবির জন্য নষ্ট হতে পারে না,ও আমার কাছে এতদিন যা ছিল,আজও তাই আছে,ভবিষ্যতেও থাকবে।শুধু একবার ওকে সুস্থ হতে দিন...'
— 'এনাফ ইজ এনাফ!' রবি গর্জন করে বলল,'এসব আলোচনা কি একটু পরে করা যায় না!দেখছেন মেয়েটা সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে,জ্ঞান ফিরছে না,ওকে আগে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন!' রবি এবার সাগরিকাকে কোলে তুলে নিল,'বেশ,কাউকে নিয়ে যেতে হবে না,আমিই যাচ্ছি!' বলে রবি রুমের দরজাটা দিয়ে বাইরে যেতে গেল,কিন্তু পুলিশরা বাধা দিল।অভ্র এক ঝটকায় সাগরিকাকে কেড়ে নিল,পুলিশদের বলল,'দেখুন স্যার,এতকিছু করেও আশ মেটেনি ওর,আমার রিকাকে এবার পুরোপুরি মেরে ফেলতে চায়,তাইজন্যই হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার নাম করে ওকে খুন করতে নিয়ে যাচ্ছিল!'
— 'সে কি আর আমরা বুঝিনা অভ্র বাবু?' একজন মহিলা পুলিশ বলল,'এসব জারিজুরি এখানে খাটবে না!'
— 'আমরাই সাগরিকা মা কে হসপিটালে নিয়ে যাব,চল অভ্র!'
— 'হ্যাঁ বাবা চলো।'
অভ্র,অভিজিৎবাবু আর অভ্রর কিছু বন্ধু সাগরিকাকে নিয়ে হসপিটালে গেল।যাওয়ার সময় অভ্র বলল,'রিকার মেডিকেল রিপোর্টটাও থানায় জমা দেব আমি,তারপর দেখব তুই কিভাবে বাঁচিস রবি!'
মেডিকেল রিপোর্ট কি আসবে তা জানতে বাকি ছিল না রবির।কিন্তু এই মুহূর্তে সে নিজের থেকে সাগরিকাকে নিয়ে বেশি চিন্তিত,তাই এসব নিয়ে মাথা ঘামাল না সে।
পুলিশ রবিকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেল অভ্রদের মিথ্যে অভিযোগে।ওদের অভিযোগ ছিল,রবি সাগরিকাকে ভুলিয়ে নিয়ে এসেছে হোটেলে,তারপর ধর্ষণ করেছে তাকে।হোটেলের ম্যানেজারও অভ্রদের কথাটা বেমালুম অস্বীকার করে রবির ঘাড়েই পুরো দোষটা চাপিয়েছে।অন্যদিকে ঘরের সিসিটিভি ফুটেজটাও অভ্রর বদান্যতায় ডিলিট করা হয়েছে,ফলস্বরূপ প্রমাণ বলতে আর কিছুই নেই।আর মেডিকেল রিপোর্টটাও আসবে অভ্রদের ইচ্ছে মতোই তাও জানতে বাকি নেই রবির।ও শুধু সাগরিকার সুস্থ হওয়ার অপেক্ষা করছে,আর কিছুটা ভয়ও কাজ করছে ওর মনে,কারণ এই সমস্ত ঘটনাটার মোড় একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যেতে পারে শুধু সাগরিকার কথাতেই,তাই সাগরিকাকেও অভ্র শেষ করে দিতে পারে,এটা নিয়ে যথেষ্ট ভয় ছিল রবির মনে।
আবারও আইনকে ভুল পথে চালনা করা হল,লকাপে গেল রবি।অন্যদিকে রবির বাবার ফোনে রিং বাজল।সূর্যদেব বাবু দেখলেন সাগরিকার মামা ফোন করেছেন।সূর্যদেব বাবু আর চিন্ময়ী দেবী এসব ঘটনার বিন্দুবিসর্গও জানেন না,ওঁরা অপেক্ষা করছেন কখন রবির ফোন আসবে আর সে বলবে বিয়ে কমপ্লিট।
ফোনটা ধরলেন সূর্যদেববাবু।
— 'হ্যাঁ বলুন।'
— 'আর কি বলব!আপনার ছেলে যা করল,আর মুখ দেখানোর জো রইল আমার সভ্য সমাজে!'
— 'দেখুন আমি বুঝতে পারছি আপনাদের মনের অবস্থা,বাট আমাদের ছেলে যা করেছে সাগরিকার ভালোর জন্যই করেছে,ওকে একটা নতুন সুখী জীবন দেওয়ার জন্য করেছে।'
— 'কি?কি বললেন আপনি?ভালোর জন্য?নতুন জীবন দেওয়ার জন্য?তা অবশ্য ঠিকই,আপনার ছেলের বদান্যতায় এখন আমাদের মেয়েটার সমাজে এক নতুন পরিচয় হবে,ধর্ষিতা।'
— 'মানে?' রবির বাবা ভীষণ অবাক হয়ে বললেন,'কি বলছেন টা কি আপনি?আমার রবি তো ওকে বিয়ে করার জন্যই...'
— 'হুম আপনার ছেলে তেমনটাই বুঝিয়েছে সাগরিকাকে।আর আমাদের মেয়েটাও হয়েছে বোকা,মিষ্টি কথায় গলে গিয়ে বিয়ের মন্ডপ ছেড়ে,অভ্রর মতো হীরের টুকরো ছেলেকে ছেড়ে গেছে রবির মতো একটা নোংরা ছেলের সাথে!আর তার ফলটাও পেয়েছে,নিজেও নোংরা হয়ে গেছে আবর্জনার স্তূপে পড়ে!'
0 মন্তব্যসমূহ