সপ্তবিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'হুম,সবটাই বুঝলাম।সত্যি অভ্র,মুখোশের আড়ালে যে কত বড়ো ক্রিমিনাল লুকিয়ে থাকতে পারে সেটা তোমায় না দেখলে জানতেই পারতাম না!'
— 'যা বলেছিস সাগর,' রবি বলল,'আমার তো এখন নিজের ওপরেই ঘৃণা হয় এটা ভেবে যে ছোটো থেকে আমি ওকে আমার সবচেয়ে আপন বন্ধু বলে ভাবতাম!'
— 'দাঁড়াও মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড,নিজেকে ঘৃণা করা এই তো সবে শুরু!এরপর যে আরও কি কি হবে.....'
— 'প্লিজ অভ্র,তুমি রবিকে বিনা দোষে অনেক কষ্ট দিয়েছ,সবার সামনে অনেক ছোট করেছ,আর না প্লিজ!রেহাই দাও ওকে!'
— 'দেব তো ডার্লিং,তুমি এখন আমার সাথে বিয়ের মন্ডপে ফিরে চলো,আমাদের বিয়েটা হোক,মন দিয়ে সংসার করো আমার সাথে,আমি রবির দিকে আর ফিরেও তাকাব না,সিম্পল হিসেব!'
— 'না!সাগর তোর মতো জানোয়ারকে বিয়ে করবে না!কোনোদিন করবে না!' রবি গর্জন করে ওঠে,'আমার জন্যেও না!'
— 'করবে করবে,আলবাত করবে!বিয়ে তো ওকে করতে হবেই!চলো রিকা,ফিরে চলো আমার সাথে!'
— 'হ্যাঁ আমি যাব,কিন্তু আগে রবিকে তুমি মুক্তি দাও,ওর গায়ের বাঁধন খুলে দাও আগে!'
— 'দেব তো সোনা,কিন্তু এখন তো নয়!তুমি যাবে,আমাদের বিয়েটা হবে,সবটার লাইভ ভিডিও রবিকে দেখাব,তারপর ছাড়ব ওকে।'
— 'সাগর তুই ওর কথা বিশ্বাস করিস না,এসব ওর শয়তানি।ও আমাকেও ছাড়বে না,আর তোকেও ছাড়বে না!তুই প্লিজ ওর সাথে যাস না!'
— 'অভ্র,আমি তোমার শর্তে রাজি,বিয়েবাড়ি চলো এখন!' সাগরিকা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল।
— 'এই তো লক্ষ্মীমেয়ের মতো কথা!আই লাভ ইট!চলো',বলেই সাগরিকার হাতটা শক্ত করে ধরল অভ্র,তারপর হাত ধরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল ওরা।তারপর বাঁ হাতে সাগরিকার হাতটা চেপে ধরে যেই অভ্র ডান হাতে দরজার ছিটকিনিটা খুলল,ওমনি অতর্কিতে সাগরিকা অভ্রর বাঁ হাতে জোরে কামড় দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে রুমের বাইরে ছুটে বেরিয়ে গেল।অভ্র 'আঃ' বলে চিৎকার করে উঠল,ওর হাত থেকে রক্ত পড়তে লাগল।কিন্তু সিঁড়িতে অভ্রর পোষা গুন্ডারা দাঁড়িয়ে ছিল,ওরা সহজেই ধরে ফেলল সাগরিকাকে।সাগরিকা চিৎকার করতে গেল,ওরা ওর মুখ চেপে ধরে পাঁজাকোলা করে নিয়ে এল ঘরে,তারপর অভ্রর কোলে ওকে তুলে দিয়ে বলল,'নিন গুরু,আপনার জিনিস আপনার কাছেই রাখুন।' রবি সবটা দেখে ভীষণ আশঙ্কিত হয়ে পড়ল সাগরিকার জন্য।ও বুঝলে পারল অভ্র আর সহজে মুক্তি দেবে না সাগরিকাকে।হলও তাই।অভ্র ভীষণ রেগে দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল,সাগরিকাকে বিছানায় ছুড়ে ফেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর,'বড়োলোকের সুন্দরী মেয়ে,তায় আমার হবু স্ত্রী,তাই এতদিন তোর সব অসভ্যতামি সহ্য করেছি,এতকিছুর পরেও শাস্তি হিসেবে শুধু বিয়ে করে ফেলে রাখতে চেয়েছি ঘরের কোণে,কিন্তু আর না!তুই অভ্র শিকদারকে আঘাত করেছিস,এত দুঃসাহস যে আমার রক্ত বের করেছিস তুই?এবার তো আর তোকে ছাড়ব না,এর উপযুক্ত শাস্তি তোকে পেতেই হবে!' বলেই সাগরিকার আঁচল ধরে টেনে তার শাড়িটা খোলার চেষ্টা করতে লাগল সে,সাগরিকা বাধা দিতে গেল যেই,অমনি অভ্রর ইশারায় লাবণ্য আর টিয়া এসে ওর হাতদুটো শক্ত করে ধরল,অভ্র একমুখ ক্রূর হাসি হেসে এগিয়ে এল সাগরিকার দিকে,শাড়িটা টেনে খুলে নিল,তারপর রবির দিকে ফিরে বলল,'তোর পেয়ারের হেনাদির গল্প তো চিঠিতে পড়েছিস,এবার তোর প্রেমিকার গল্পটা লাইভ টেলিকাস্ট দেখার জন্য রেডি হ!'
— 'অভ্র প্লিজ ওকে ছেড়ে দে,ওকে চলে যেতে দে এখান থেকে,ও তো কোনো ক্ষতি করেনি তোর,তাহলে কেন এসব করছিস?' রবি অসহায় গলায় বলে ওঠে।
কিন্তু অভ্র ওর কোনো কথায় কর্ণপাতই করল না।প্রীতম এসে রবির মুখ বেঁধে দিল,যাতে ও চিৎকার না করতে পারে।
এরপর প্রথমে অভ্র,তারপর ওর পুরুষবন্ধুরা নৃশংস অত্যাচার চালাল সাগরিকার ওপর।রবি শরীরের সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা করতে লাগল বাঁধন খোলার,কিন্তু ব্যর্থ হল।চেয়ারসুদ্ধু মাটিতে পড়ে গেল ও অতিরিক্ত নড়াচড়ার কারণে,চোখ দুটো বন্ধ করে নিল রবি,অসহায় চোখদুটো থেকে জল গড়িয়ে মেঝেতে পড়তে লাগল।
অন্যদিকে সাগরিকা চিৎকার চেঁচামেচি করতে লাগল প্রথম দিকে,কিন্তু এত অত্যাচার সে সহ্য করতে পারল না আর,নেতিয়ে পড়ল সে।অত্যাচার শেষের পর অভ্র আর বন্ধু বান্ধবরা চলে গেল ঘর থেকে,সাথে লাবণ্য টিয়ারাও গেল,যাওয়ার আগে লাবণ্য রবির বাঁধন খুলে দিয়ে গেল,ক্রূর হেসে বলল,'ইটস ইয়োর টাইম রবি,এনজয়!' বলেই বাঁকা হাসি হেসে চলে গেল সে।রবি তাড়াতাড়ি উঠেই সাগরিকার কাছে গেল।সাগরিকা জ্ঞান হারিয়েছিল,সারা শরীরে রক্তের দাগ,পরনে এতটুকুও পোশাক ছিল না তার।রবি কোনোরকমে পরনের শাড়িটা ওর গায়ে জড়িয়ে দিয়েই ডাকতে লাগল,'সাগর!সাগর ওঠ!দেখ আমি তোর রবি!ওঠ সাগর!'
কিন্তু তবু সাগরিকার জ্ঞান ফিরল না দেখে তাড়াতাড়ি জল খুঁজতে লাগল সে।কিন্তু ঘরে কোথাও জল ছিল না,তাই তাড়াতাড়ি বেসিন থেকে হাতে করে কোনোরকমে জল এনে ছিটিয়ে দিতে লাগল সাগরিকার চোখে মুখে,কিন্তু তবুও জ্ঞান এল না সাগরিকার।রবি বুঝল,আর দেরি করা ঠিক হবে না,তাড়াতাড়ি ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।কিন্তু দরজাটা খুলতে গিয়ে দেখে,বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গেছে অভ্ররা যাবার সময়।রবি বারবার ধাক্কাধাক্কি করল,ডাকাডাকি করল,'কেউ আছেন?প্লিজ দরজাটা খুলে দিন না,খুব বিপদে পড়েছি আমরা!'
কিন্তু কেউ দরজা খুলল না।অসহায় রবি ঘরের মধ্যে তাড়াতাড়ি ফোন খুঁজতে লাগল,ওর আর সাগরিকার মোবাইল অভ্রর দলবল কেড়ে নিয়ে গেছে।হোটেলের সব রুমেই ল্যান্ডফোন থাকে।কিন্তু ল্যান্ডফোনের কাছে গিয়ে রবি দেখে,ফোনের তার কাটা।
অসহায় রবি দেওয়ালে এক ঘুষি মারে,'শয়তানটা সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে গেছে!'
হঠাৎই রুমের দরজায় কে যেন লক করে।রবি ব্যস্ত হয়ে তাড়াতাড়ি দরজাটা খোলে।
0 মন্তব্যসমূহ