Advertisement

এনকাউন্টার (চতুঃচত্বারিংশ পর্ব)

এনকাউন্টার 
চতুঃচত্বারিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


বাংলোতে এসে ভয় থেকে তো মুক্তি পেলই না অভ্র,বরং দিনে দিনে ওর ভয় আকাশচুম্বী হতে শুরু করল।মাঝে মাঝেই অভ্র মাঝরাতে হঠাৎ কোনো এক অজানা শব্দে ঘুম ভেঙে দেখত,কখনো রবি,কখনো সাগরিকা,কখনো বা দুজনেই দাঁড়িয়ে আছে ঘরের এক কোণে রক্তাক্ত বেশে,আর আক্রমণাত্মক চোখে তাকিয়ে আছে অভ্রর দিকে,ওই ভয়ঙ্কর দৃষ্টি দেখলেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে অভ্রর,মনে হয় ওই বীভৎস দৃষ্টি দিয়েই যেন অভ্রর শরীর থেকে শেষ জীবনীশক্তিটুকুও শুষে নিচ্ছে ওরা।অভ্রর পাশে ঘুমন্ত ঝুমকোকে ডাকত অভ্র,কিন্তু ঝুমকোর ঘুমই ভাঙত না,যদিও বা ভাঙত,ও কাউকেই দেখতে পেত না,বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ত আবার।কোনো কোনো রাতে ডাইনিংয়ে টিভি চলার শব্দ পেত অভ্র,দৌড়ে বাইরে এসে দেখত রবির এনকাউন্টারের ভিডিওটা চলছে টিভিতে,অভ্র আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না,চেঁচিয়ে ডাকত ঝুমকোকে,কিন্তু ঝুমকো এসে দেখত টিভিটা অফ রয়েছে।সব মিলিয়ে বাঁচার শেষ ইচ্ছেটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল অভ্র,ও প্রতিটা মুহূর্তে উপলব্ধি করত,যে রবি-সাগরিকাকে শেষ করে কতটা ভুল করেছে ও।

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________

কিন্তু একদিন অভ্র একটা উপায় বের করে নিজের কথাগুলো সকলের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার।ও ঠিক করে,বাংলোর ডাইনিংয়ে একটা সিসিটিভি ক্যামেরা বসাবে ঝুমকোর চোখ এড়িয়ে,সেই মতো বাংলোর কেয়ারটেকারকে মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে ও ব্যবস্থা করে ডাইনিংয়ে সিসিটিভি ক্যামেরা ফিট করার,কারণ বেডরুমে তো ক্যামেরা লাগানো সম্ভব নয়।
একদিন বিকেলে ঝুমকো বাংলোয় ছিল না,ওর এক বান্ধবীর বাড়ি গিয়েছিল,অভ্র একাই বাংলোতে ছিল।ডাইনিংয়ের টিভি অন করে বসেছিল ও সোফায় কফি হাতে।হঠাৎই টিভিটা অফ হয়ে গেল,অভ্র বেশ ভয় পেয়ে গেল,কেয়ারটেকারকে ডাকতে লাগল ও,কিন্তু কেয়ারটেকারের কোনো সাড়া পাওয়া গেল না বারবার ডেকেও।হঠাৎই এক বরফের মতো ঠান্ডা হাতের স্পর্শে অভ্র ভীষণ ভয় পেয়ে গেল,কফির কাপটা হাত থেকে পড়ে গেল।অভ্র ফিরে দেখে,রবি স্পর্শ করেছে তাকে,আর সাগরিকা ক্রূর হাসি হাসছে।
রবি রাগতস্বরে বলল,'আমাদের ধরিয়ে দিবি সবার কাছে?এত বড়ো সাহস!'
পাশ থেকে সাগরিকা রাগীস্বরে বলল,'ওকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে,আর নয়,এবার ওর মরার সময় এসেছে!'
— 'ঠিক বলেছিস সাগর,অভ্রদীপ শিকদার আজ মরবে,মরবে আজ!' রবি আর সাগরিকা ওদের ধারালো নখে ভর্তি রক্তাক্ত ঠান্ডা হাত অভ্রর গলার দিকে এগিয়ে নিয়ে চলল ক্রমশ।অভ্র প্রচন্ড আর্তনাদ করে চোখ বন্ধ করে ফেলল।বেশ কয়েকমিনিট চোখ বন্ধ করে রাখার পর টিভির শব্দে অভ্র চোখ খুলে দেখে,কেউ কোথাও নেই,আর টিভিটাও চলছে।

অভ্র ভাবে,ঝুমকো এলেই ও সিসিটিভি ফুটেজটা ঝুমকোকে দেখাবে,সবটা দেখলে ঝুমকো নিশ্চয়ই সবটা বিশ্বাস করবে।
যেই ভাবা সেই কাজ।ঝুমকো আসা মাত্রই অভ্র নিজের ল্যাপটপটা খুলল,তারপর ঝুমকোর সামনে চালাল সিসিটিভি ফুটেজটা।কিন্তু ফুটেজটা দেখেই অভ্র হতবাক।ফুটেজে রবি সাগরিকা কাউকে দেখা যাচ্ছেনা,এমনকি টিভিটাও অফ,একবারের জন্যও অন করা হয়নি টিভিটা।
— 'এতে কি দেখব অভ্র?আর তুমিই বা অফ টিভিটা ওরকম হাঁ করে দেখছিলে কেন?আর কাকে দেখেই বা ভয়ে চোখ বন্ধ করে মুখ লুকোলে?'
— 'আমি জানিনা জানিনা কিচ্ছু জানিনা!' অভ্র অসহায়ভাবে চিৎকার করে উঠে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল ভেতর থেকে।
ঘরে গিয়েই অভ্র অবাক হয়ে গেল,ও দেখল ঘরের দেওয়াল রক্তের অক্ষরে লেখা,'যখন তুমি বাঁচতে চাও বারবার,কিন্তু জীবন তোমায় বাঁচতে দেয়না,মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়,তখন কেমন লাগে বুঝতে পারছ তো আজ,অভ্র?' লেখাটা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে দেওয়াল বেয়ে।
অভ্র আর পারল না,মেঝেতে বসে ও কাঁদতে শুরু করে দিল।এতদিন ধরে প্রতিটা মুহূর্তে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে,কাউকে পাশে না পেয়ে বাঁচতে বাঁচতে ভেতর থেকে অনেকদিন ধরেই একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছিল অভ্র,খাওয়াদাওয়া,ঘুম কোনোটাই ঠিকমতো হচ্ছিল না বিয়ের পর থেকে,তাই শারীরিক ভাবেও যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছিল অভ্র।সবদিক থেকেই মারণফাঁদে আটকে পড়েছিল সে,যেখান থেকে বেরোবার কোনো পথ সে খুঁজে পেল না,তাই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিল অভ্র।
ওদিকে বাইরে থেকে বারবার ডাকাডাকি করার পরেও অভ্র দরজা না খোলায় দরজাটা ভেঙে ঢোকার ব্যবস্থা করা হল শেষ পর্যন্ত।দরজাটা খুলেই ঝুমকোরা দেখল,অভ্র মেঝেতে পড়ে আছে,ওর হাতের শিরাটা কাটা,পাশে একটা ব্লেড পড়ে আছে,আর রক্ত গড়াচ্ছে মেঝেতে।
আর দেরি না করে ঝুমকোরা ওকে স্থানীয় হসপিটালে নিয়ে গেল,খবর দেওয়া হল অভিজিৎবাবু-তনিমাদেবীদের,সেই সাথে অলোকবাবুকেও।

_________________________

Subscribe my YouTube channel : Suchandra Chakrabarti

_________________________

— 'বুঝলেন অভিজিৎবাবু',অলোকবাবু গম্ভীর গলায় বললেন,'আর কোনো রাস্তা নেই।অভ্রকে এবার মেন্টাল অ্যাসাইলামেই ভর্তি করার ব্যবস্থার কথাই ভাবতে হবে আমাদের।দিন দিন মানসিক রোগটা বাড়তে বাড়তে এমন একটা জায়গায় গেছে যে অভ্র সুইসাইড পর্যন্ত করার চেষ্টা করছে,অ্যাসাইলামে না রাখলে ওকে হয়ত আর বাঁচানোই যাবে না!'
— 'ডাক্তারবাবু!' তনিমাদেবী কেঁদে উঠে বললেন,'অভ্র আমাদের একমাত্র ছেলে,ওকে শেষ পর্যন্ত অ্যাসাইলামে ভর্তি করতে হবে?'
— 'তনিমা ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করো',অভিজিৎবাবু বললেন,'ছেলেটা সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছে,এইযাত্রায় ওর কিছু হয়নি,কিন্তু পরেরবার তো কোনো অঘটন ঘটে যেতেই পারে তাই না?'
তনিমাদেবী কান্নায় ভেঙে পড়লেন সবটা শুনে।অভ্রকে অ্যাসাইলামে নিয়ে যাওয়া হল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ