এনকাউন্টার
ঊনচত্বারিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'তার মানে আজ আমাকে তোমাদের ঘরে শুতে দেবে না তাই তো?এতকিছু শোনার পরও আমায় এই ঘরেই একা শুতে বলবে তোমরা,বাহ!'
— 'শোন অভ্র,পাগলামির একটা লিমিট থাকে ওকে!সেটা ভুলে যাস না।তোর বিয়ে হয়ে গেছে,এতবড়ো একটা ছেলে মা-বাবার সাথে শোয় নাকি,ছি!' তনিমাদেবী ভ্রূ কুঁচকে বললেন।
— 'আর তাছাড়া তুমি তো সেই কবে থেকেই একা শোও,কোনোদিন কোনো সমস্যা তো হয়নি!শহরে একটা ফ্ল্যাটে তুমি একা থাকতে,ভুলে গেছ?' অভিজিৎবাবু বললেন।
— 'কিন্তু সেদিন আর আজকের মধ্যে অনেক তফাত বাবা...'
— 'কিচ্ছু তফাত নেই,তফাত একটাই,সেদিন তুমি একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ ছিলে,আর আজ...'
— 'বাবা প্লিজ!'
— 'আর কোনো কথা নয়,আমরা শুতে চললাম।তুমি লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ো চুপচাপ ওকে!গুডনাইট।' বলেই অভিজিৎবাবু আর তনিমাদেবী চলে গেলেন নিজেদের ঘরে।
— 'এরা মা-বাবা না শত্রু কে জানে বাবা!' অভ্র নিজের মনেই গজরাতে লাগল,'দেখছে নিজেদের ছেলেটা বিপদে আছে,তাও একা একা শুতে পাঠিয়ে দিল!' তারপর নিজের মনেই বলল,'নিকুচি করেছে লাইট নিভিয়ে শোয়া!আমি আজ শালা লাইট জ্বালিয়েই শোবো!'
আলো জ্বালিয়েই অভ্র বিছানায় শুয়ে পড়ল,আর শোয়ার আগে বিছানা লাগোয়া জানালাটা বন্ধ করে দিল।
কিন্তু শুয়ে কিছুতেই ঘুম এল না ওর,বারবার মনে একটা ভয় কাজ করছিল,যদি ঘুমিয়ে পড়লেই ঘুম ভেঙে উঠে আবার ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে দেখে ও!সেই ভয়ে সারাটা রাত জেগেই কাটাল অভ্র,তারপর যেই সকাল হল,ঘরের আলো নিভিয়ে জানালাগুলো খুলে দিল ও।সূর্যকিরণ এসে যখন গোটা ঘরটা ভরিয়ে দিল আলোয়,তখন অভ্রর মন থেকে সমস্ত ভয় কেটে গেল,ওর মনে হল,আগের রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দুঃস্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।নিশ্চিন্তমনে চোখটা বুজে বিছানায় আরাম করে শুলো ক্লান্ত অভ্র,আগের রাতে ওর একদমই ঘুম হয়নি।
ঘুমটা সবে একটু গাঢ় হয়ে এসেছে,অমনি তনিমাদেবী এসে ডাকাডাকি শুরু করলেন অভ্রকে,'ছেলের কান্ডটা দেখো শুধু!বৌভাত আজ,উনি বেলা পর্যন্ত বিছানা কামড়ে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছেন!ওঠ্!'
মায়ের ডাকে বিরক্ত অভ্র বাধ্য হয়েই উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে।
সেদিন সমস্ত অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হল,অভ্রর সাথেও আর কোনো ভয়ানক ঘটনা ঘটল না।অভ্রর মনে হল,সবটাই ওর মনের ভুল।
রাতে ফুলসজ্জা অভ্র-ঝুমকোর।অভ্রর ঘরটা আজ ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।ঘরে যাওয়ার আগে অভ্রর পিঠ চাপড়ে অভিজিৎবাবু হেসে বললেন,'যাও,আর একা একা শুতে হবে না,ভয়ও লাগবে না আর!'
অভ্র ঘরে ঢুকেই ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনি তুলে দিল,তারপর বিছানার দিকে গেল।বিছানায় ঝুমকো লাজুক মুখে বসে ছিল নিচের দিকে তাকিয়ে।
অভ্র হেসে বিছানায় গেল,তারপর এগিয়ে গেল ঝুমকোর দিকে।কিন্তু ঝুমকোর কাছে গিয়েই ও হঠাৎ যেন ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল।ঝুমকোর হাতে একটা নীল গোলাপ ছিল,গোলাপটা আসল নয়,নকল।সাগরিকা প্রায়শই চুলে এরকম নীল নকল গোলাপ আটকাত,কারণ রবির পছন্দ ছিল।
— 'একি?তোমার হাতে ওটা কেন!' ভয়ার্ত অভ্র বলে উঠল।
— 'কোন্ টা অভ্র?ও এই নীল গোলাপটা?আর বোলো না অভ্র,' ঝুমকো হেসে বলল,'আজ রিসেপশনে একজন মহিলা এসেছিলেন,বোরখা পরেছিলেন,শুধু চোখদুটো দেখা যাচ্ছিল,এসেই উনি বললেন,'আমি অভ্রর এক বান্ধবী,তুমি এই নীল নকল গোলাপটা রাখো,আজ রাতে অভ্রকে দিয়ো,দেখবে খুশি হবে ও।'
আমি অবাক হয়ে বললাম,'সে কি!এত আসল গোলাপ থাকতে নকল গোলাপ কেন দিতে যাব?আর আমি যতদূর জানি,ও লাল গোলাপ ভালোবাসে,নীল নয়।'
তখন সেই মহিলা হেসে বললেন,'আমি তোমার আগে থেকে ওকে চিনি,সেই কলেজজীবন থেকে,আমি বলছি নীল গোলাপটা পেলেই ও খুশি হবে।'
আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম,'সে নয় বুঝলাম,কিন্তু আপনি কে?আপনার নাম কি?' কি বলব অভ্র,সেই মহিলাটি কি উত্তর দিলেন জানো?তিনি বললেন,'সূর্য আর সমুদ্রের অনেক নাম থাকে,তাই নাম খুঁজতে যেও না,কুলকিনারা পাবে না।' এই পর্যন্ত বলে ঝুমকো হাসল,'কিসব পাগলছাগলদের সাথে যে তুমি বন্ধুত্ব করো,কে জানে!'
অভ্র রীতিমতো ভয়ে সিঁটিয়ে গেছে,কোনোরকমে ঢোক গিলে ও জিজ্ঞেস করল,'মেয়েটার চোখদুটো দেখেছিলে তুমি?ওর কি নীল মণি ছিল?'
— 'হ্যাঁ অভ্র,যতদূর মনে পড়ছে ওনার নীল চোখের মণি ছিল,কিন্তু কেন?'
— 'তুমি এক্ষুণি ওই ফুলটা ফেলে দাও ঝুমকো,আমি বলছি এক্ষুণি ফেলো ওটাকে!'
— 'কি আশ্চর্য অভ্র,কেন ফেলব?তোমার এক বান্ধবী কত আশা করে দিয়ে গেছে যাতে এটা তোমায় আমি দিই,আর তুমি ফেলে দিতে বলছ?'
— 'না আমি ওই ফুল নেব না,আর তুমিও ওটা নিজের কাছে রাখবে না,কেন বুঝতে পারছ না ওই ফুল অভিশপ্ত!'
— 'দুর,কিসব আবোলতাবোল বকছ!ফুল আবার অভিশপ্ত হয় নাকি!'
— 'হ্যাঁ হয়,আর আমি এক মুহূর্ত ওটাকে চোখের সামনে দেখতে চাই না!' বলেই অভ্র ঝুমকোর হাত থেকে ফুলটা কেড়ে নিয়ে ঘরের বাইরের ডাস্টবিনে ফেলতে গেল।যেই অভ্র ডাস্টবিনে ফেলল ফুলটা,অমনি লোডশেডিং হয়ে গেল।
অভ্র ভীষণ ভয় পেয়ে গেল।ও পড়ি কি মরি ছুটতে ছুটতে ঘরে চলে এল,কিন্তু ঘরে এসেই যে দৃশ্য ও দেখল সেটা দেখে অভ্রর পায়ের তলার মাটি সরে গেল,ওর মনে হল আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না ও।
0 মন্তব্যসমূহ