এনকাউন্টার
দ্বাত্রিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'ইউ স্কাউন্ড্রেল!' সূর্যদেববাবু গর্জে উঠলেন।
— 'হাহাহা,সেটা আপনাদের থেকে ভালো আর কে জানে!জানেনই যখন আমি স্কাউন্ড্রেল,তাহলে আর কেন লাগতে আসেন বারবার বলুন তো?কথাতেই তো আছে,দুর্জনকে দূরে পরিহার,তো আমাকেও সেটা করলেই পারেন।আপনারা আমার রাস্তায় না এলে আমিও আপনাদের রাস্তা ভুলেও মাড়াব না।এই সোজা হিসেবটা কেন মানতে চাইছেন না আপনি আর আপনার ছেলে বলুন তো?'
— 'আমরা কেউ তোমার রাস্তায় আসিনি অভ্র,তুমিই এসেছ আমাদের রাস্তায়।সাগরিকা মায়ের জীবনে কেন পড়ে আছ তুমি নির্লজ্জের মতো?ও তো তোমায় চায় না নিজের জীবনে,ও রবিকে চায়,আর তোমার জীবনেও তো নটীদের অভাব নেই,তাদের নিয়েই থাকো না,কেন সাগরিকা মায়ের জীবনটা হেল করে দিচ্ছ এভাবে?'
— 'এই শুনুন আঙ্কেল,আমার জীবনে আমি কাকে রাখব আর কার সাথে কি করব সেটা আপনি বলার কে?আপনি নিজের ছেলের কথা ভাবুন বুঝলেন তো,আর একটা বাড়তি কথা বললে আমার ছেলেদের দিয়ে আপনাদের খুন করাব!শীগগির চলে যান ওখান থেকে!' অভ্র ফোনটা কেটে দিল।
ওদিকে ছেলেগুলো এবার বন্দুক তাক করল চিন্ময়ী দেবীর দিকে।বলল,'আপনি না গেলে কিন্তু এবার আপনার স্ত্রীকে গুলি করতে বাধ্য হব আমরা!'
এইবার সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন সূর্যদেববাবু।চিন্ময়ীদেবীকে নিয়ে চলে গেলেন সেখান থেকে।
— 'কি করব এবার আমরা?টাকা কোথা থেকে জোগাড় করব?অভ্র তো ব্যাঙ্কে যাওয়ার রাস্তাই বন্ধ করে দিয়েছে,আর হাতে যা টাকা আছে তাও তো খুব বেশি নয়,কি হবে এখন?' হতাশ গলায় বললেন সূর্যদেববাবু।
— 'কে বলেছে টাকা জোগাড় হবে না?' চিন্ময়ী দেবী বললেন,'আমার গলায় যে সোনার হারটা আছে আর দু'হাতে বালা,এগুলো দিয়ে দিব্যি সবটা জোগাড় হয়ে যাবে দেখো।'
— 'শেষ পর্যন্ত তোমার গায়ের গয়নাগুলো বিক্রি করব চিন্ময়ী?'
— 'আমার কাছে এসব গয়নার চেয়ে আমার ছেলের দাম অনেক বেশি গো!' চিন্ময়ী দেবী কেঁদে ফেললেন,'আর না কোরো না গো আমায়!'
— 'আচ্ছা তাই হবে,চলো।'
সূর্যদেববাবু আর চিন্ময়ী দেবী এরপর গেলেন সোনার দোকানে।তারপর গয়নাগুলো বিক্রি করে যে টাকাটা পেলেন,সেটা সূর্যদেববাবু একটা ব্যাগে ভরে নিয়ে দোকান থেকে বেরোলেন তাঁরা।
— 'যাক নিশ্চিন্ত হওয়া গেল,সব টাকাটা জোগাড় হয়ে গেছে।' সূর্যদেববাবু নিশ্চিন্ত গলায় বললেন।
— 'সত্যি গো।'
হঠাৎই একটা বাইক এসে দাঁড়াল সূর্যদেববাবুর পাশেই,বাইকে দুটো ছেলে ছিল,আর কিছু বুঝে ওঠাই আগেই বাইকের পিছনে বসে থাকা ছেলেটা ব্যাগটা অতর্কিতে সূর্যদেববাবুর হাত থেকে এক ঝটকায় কেড়ে নিল,আর সামনে বসে থাকা ছেলেটা বাইক স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল।
হঠাৎ করেই সবটা হওয়ায় কেমন যেন শকড হয়ে গেলেন দুজনেই।চিন্ময়ী দেবী হতাশ হয়ে রাস্তায় বসে পড়লেন,আর সূর্যদেববাবু বাইকের পিছনে ধাওয়া করে ব্যর্থ হলেন।
— 'এ আপনি কি বলছেন আঙ্কেল?রাস্তায় কখন কি ছিনতাই হবে,তার দায়টাও আপনি আমার ওপর চাপাবেন?' ক্রূর হাসি হেসে অভ্র বলল,'দোষ চাপাতে চাপাতে এতটাই অভ্যেস হয়ে গেছে যে মঙ্গলগ্রহে কিছু হলেও তো দেখছি আপনি আমাকেই কালপ্রিট ভাববেন!'
— 'শাট আপ অভ্র!তুমি ভালো করেই জানো ফোনটা কেন করেছি তোমায় আমি!অনেক অন্যায় করেছ তুমি,অনেক নীচে নেমেছ তুমি,আর কত নীচে নামবে?তুমি শেষ পর্যন্ত তোমার আন্টির গায়ের গয়নার টাকা চুরি করালে?'
— 'দেখুন আঙ্কেল প্লিজ!আমি রেপিস্ট হতে পারি,মলেস্টার হতে পারি,গুন্ডাও হতে পারি,কিন্তু ছিঁচকে চোর?প্লিজ আঙ্কেল!ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করতে আমি একদম ভালোবাসি না,আমার একটা ক্লাস আছে বুঝলেন তো!'
— 'সেই!ক্রাইম,তার আবার ক্লাস!চুরিটা যে তুমিই করেছ সেটা আমার জানতে বাকি নেই আর!' সূর্যদেববাবু ফোনটা রেখে দিলেন।
— 'অভ্র তো আমাদের শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিল গো!' চিন্ময়ী দেবী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন,'এখন কি হবে?'
— 'ভেঙে পড়ার সময় এটা নয় চিন্ময়ী,কিছু একটা তো ভাবতেই হবে আমাদের,এখন হোটেলে ফিরে চলো।'
শহরে যে হোটেলে উঠেছিলেন ওঁরা,সেখানে ফিরে গেলেন দুজনে।হঠাৎই ওঁদের ঘরে নক করার শব্দ হল।খুব সাবধানে সূর্যদেববাবু ডোর ভিওয়ার লেন্সে চোখ রেখে দেখলেন,তারপর দরজা খুললেন।
সেই উকিলবাবু এসেছেন,যাঁর রবি আর সাগরিকার রেজিস্ট্রি ম্যারেজটা করানোর কথা ছিল।
তিনি ঘরে ঢুকতেই চিন্ময়ী দেবী বসতে বললেন তাঁকে।
— 'একটা বড়ো চক্রান্তের শিকার হয়ে বিয়েটা দিতে পারলাম না বলে বড্ড আফসোস হয় জানেন,অপরাধবোধে ভুগি আমি।যদি সেদিন আমার মেয়ের ভুয়ো অ্যাক্সিডেন্টের খবরটা বিশ্বাস না করে মনোরমা হোটেলে যেতাম,তাহলে হয়তো আপনাদের ছেলেকে,হবু বৌমাকে এরকম বিপদে পড়তে হত না!'
— 'আপনি এভাবে ভেঙে পড়বেন না প্লিজ,' সূর্যদেববাবু বললেন,'নিজের সন্তানের বিপদের খবর শুনলে কোন্ বাবার মাথার ঠিক থাকে বলুন তো?'
— 'হ্যাঁ,আর এই সুযোগটাকেই ওই অমানুষগুলো কাজে লাগিয়েছে।কি বলব এত অপরাধবোধে ভুগছি আমি...'
— 'আপনি এভাবে নিজেকে দোষারোপ করবেন না,' সূর্যদেববাবু বললেন,'তাছাড়া ওরা যা সাংঘাতিক,আপনি ওখানে উপস্থিত থাকলে আপনারও ক্ষতি করে দিতে পারত ওরা।'
— 'সে আপনি যাই বলুন,আমি ওখানে থাকলে আজ এভাবে নিজের কাছেই নিজেকে ছোট হতে হত না আমায়,হাজার হোক রবি আর সাগরিকা তো আমার সন্তানেরই মতো!আচ্ছা শুনুন না সূর্যদেববাবু,' উকিলবাবু সূর্যদেববাবুর হাত ধরে বললেন,'আমায় পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার একটা সুযোগ দেবেন?'
— 'এভাবে বলবেন না প্লিজ,আপনি বলুন না কি করতে চান?'
0 মন্তব্যসমূহ