এনকাউন্টার
ত্রিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
অন্যদিকে সূর্যদেববাবু আর চিন্ময়ী দেবী শহরে এসে পৌঁছালেন পরের দিন দুপুরে।ইতিমধ্যে শুধু নিউজ চ্যানেলই না,প্রত্যেকটা খবরের কাগজেও ফলাও করে বেরিয়েছে রবির ছবি,আর সেই সাথে অভিযোগের তীর তোলা হয়েছে ওর দিকেই।এ শহরে আর তো কেউ নেই সূর্যদেববাবুদের রবির খবর দেওয়ার জন্য,ঝুমকো ছিল একমাত্র যে রবি-সাগরিকার সম্পর্কের একমাত্র শুভাকাঙ্খী,কিন্তু ওর মোবাইল কেড়ে নিয়েছেন ওর মা বাবা,অর্থাৎ সাগরিকার মামা-মামীমা,যাতে ও কোনোমতেই আর রবি বা ওর পরিবারের কারোর সাথে আর যোগাযোগ করতে না পারে।
লকাপে নিজেদের একমাত্র সন্তানকে এই অবস্থায় দেখে আর চোখের জল আটকাতে পারলেন না চিন্ময়ী দেবী,সূর্যদেববাবুরও চোখে জল এলো,অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালেন তিনি,এই সময় যে ওঁকে শক্ত থাকতেই হবে।চিন্ময়ী দেবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন,'কি কুক্ষণে যে তোকে অভ্রর সাথে শহরে পাঠিয়েছিলাম পড়াশুনা করতে!ওই অসভ্য নোংরা ছেলেটা আর ওর বাপটা ছেলেটাকে আমার শেষ করে দিলো গো!'
— 'সত্যি যা বলেছো,ছোট থেকে বড়ো হতে দেখলাম যে ছেলেটাকে চোখের সামনে,সে এতটা নীচে নামতে পারে কল্পনাও করিনি!'
— 'অনেক হয়েছে বাবা আর নয়,লকাপ থেকে তোকে আগে বের করি আমরা,তারপরেই তুই আর সাগর মাকে নিয়ে ধামুয়া চলে যাব আমরা!'
— 'সাগরের কি হবে কিচ্ছু জানিনা মা,ওর এখনো জ্ঞান ফেরেনি জানো!' রবির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে,'ওর কি অবস্থাটাই করল অভ্র-প্রীতমরা মিলে,আর আমি কিচ্ছু করতে পারলাম না!' রবি কান্নায় ভেঙে পড়ে,'জানিনা ওরা সাগরকে বাঁচতে দেবে কিনা,সাগর তো এখন ওদের কাছেই!'
— 'আমি যতদূর নিশ্চিত,সাগরিকা মায়ের কোনো ক্ষতি ওরা করবে না,কারণ এখন তো তুই লকাপে,সাগর মায়ের কিছু হলে তোর দিকে কিন্তু আঙুল উঠবে না,উঠবে ওই অকালকুষ্মান্ড বাপ-ছেলের ওপরেই!' সূর্যদেববাবু বললেন।
— 'কিন্তু বাবা, এখন না হয় ও অসুস্থ,এখন ও কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই,কিন্তু যখন ও সুস্থ হয়ে উঠবে তখন কি হবে বাবা?তখন কি অভ্রর দলবল ওকে ছাড়বে আর?ওকে বাঁচতে দেবে?'
— 'হ্যাঁ একথা তুই ভুল বলিসনি,তাই এখন সবার আগে দরকার তোকে ছাড়ানো,তারপর আমরা সাগর মাকে বাঁচাবো যেমন করেই হোক।'
— 'আমি বলি কি বাবা,যতদিন সাগর সুস্থ না হচ্ছে,আমাকে ছাড়িয়ে না তোমরা।'
— 'ও কি কথা বাবা?'
— 'আমি ঠিকই বলছি মা,ভেবেচিন্তেই বলছি।দেখো আমি যতদিন লকআপে থাকবো,ততদিন অভ্র সাগরের কোনো ক্ষতি করবে না,কারণ আমার ওপর দোষারোপ করতে পারবেনা।আমি বাইরে গেলেই ও সাগরের ক্ষতি করবে,আর প্রাণ থাকতে আমি আর ওর কোনো ক্ষতি হতে দেব না।'
— 'এ তুই কিসব বলছিস বাবা',চিন্ময়ী দেবী কান্নায় ভেঙে পড়লেন,'তুই জেলে থাকবি,আর আমরা আরাম করে খাবো,ঘুমোবো নরম বিছানায়?তা কি হয় বাবা!'
— 'আর তাছাড়া অভ্রর মতো পশুকে একদম বিশ্বাস নেই,কথায় বলে না,দুর্জনের ছলের অভাব হয়না!এর চেয়ে বরং আমরা তোকে ছাড়াই আগে,তারপর সাগর মাকে শহর থেকে অনেক দূরে অন্য কোনো হসপিটালে নাম গোপন করে ভর্তি করব,যাতে অভ্ররা আর ওর নাগাল না পায়।' সূর্যদেববাবু বললেন।
— 'বাহ্ কাকু বাহ্!'
রবিসহ সূর্যদেববাবুরা ফিরে তাকিয়ে দেখেন অভ্র,আর সেই সাথে থানার বড়বাবু।অভ্র বলে যেতে লাগলো,'কাকু আপনি রবিকে এতটুকুও শাসন না করে এইভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছেন?দেখুন স্যার দেখুন শুধু ওর বাবা মার আচরণ,কথাগুলো শুনলেন ওদের?'
— 'হুম,সবই শুনলাম',বড়বাবু ঘৃণার হাসি হেসে বললেন,'যার গার্জেনদের এই শিক্ষা,তাদের ছেলে আর কি মানুষ হবে?ছেলে রেপ করে যে মেয়েটাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিল,সেই মেয়েটাকেই অন্য হসপিটালে ভর্তি করবেন নাম ভাঁড়িয়ে,যাতে মেডিকেল রিপোর্ট পাল্টে ছেলেকে সাধু প্রমাণ করতে পারেন,তাই না?'
— 'স্যার আপনি রবিকে চেনেন না,মেডিকেল টেস্টের রিপোর্ট পাল্টে দেওয়াই নয়,ও আমার রিকাকে খুন করতেও পিছপা হবে না!ও ই তো রবির অপরাধের সবচেয়ে বড়ো সাক্ষী,ওকে মারতে এতটুকুও ভাববে না ও!'
— 'বটে!তার জন্য তো ওকে লকাপ থেকে বেরোতে হবে অভ্রবাবু,আমি সেটা তো হতে দিচ্ছিনা কোনো মতেই,ওর মতো ক্রিমিনাল বাইরে বেরোনো মানে আরো একটা নিরীহ মেয়েকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া!'
— 'থ্যাংক ইউ সো মাচ স্যার, আপনি অন্তত আমার কষ্টটা বুঝলেন, অনেক ধন্যবাদ!' কপট দুঃখের সুরে অভ্র বলল।
— 'এটা আমার ডিউটি অভ্রবাবু। আপনি আসুন এখন, আপনার রিকার কাছে যান, আপনাকে এই মুহূর্তে খুব দরকার ওনার। আর এনাদের আমি বুঝে নিচ্ছি।'
— 'আচ্ছা স্যার আমি আসি।' বলেই রবির দিকে তাকিয়ে একঝলক ক্রূর হাসি হেসে চলে গেলো অভ্র।
— 'এই যে আপনারা,' বড়বাবু সূর্যদেববাবুদের দিকে ফিরে বললেন,'অনেক কন্সপিরেসি হয়েছে,আর নয়,এবার আপনারা আসতে পারেন।আর যদি নেক্সট টাইম দেখেছি ছেলের সাথে দেখা করতে এসে এসব প্ল্যান করছেন,দেখা করতে আসাই বন্ধ করে দেব বলে দিলাম,মনে থাকে যেন!'
— 'বিশ্বাস করুন স্যার, আমরা কোনো চক্রান্ত করিনি,কোনো প্ল্যান করিনি আমরা। আর আমাদের ছেলেটাও কোনো দোষ করেনি স্যার বিশ্বাস করুন, ওকে ফাঁসানো হয়েছে!'
— 'আপনিও বিশ্বাস করুন, সব দোষীরাই এক কথা বলে যে তাদের ফাঁসানো হয়েছে, এই কথা শুনে শুনে আমরা পুলিশরা খুব ক্লান্ত। আর ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না আমার প্লিজ, আসুন তো এখন! যা বলার কোর্টে বলবেন, এখন আসুন।'
0 মন্তব্যসমূহ