Advertisement

এনকাউন্টার (ঊনপঞ্চাশৎ পর্ব)

এনকাউন্টার 
ঊনপঞ্চাশৎ পর্ব(অন্তিম পর্ব)
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 



— 'তবে যে ডাক্তারবাবু তোমায় দেখতে এসেছিলেন তুমি সিঁড়িতে পড়ে যাওয়ার পর,তাঁকে আমরা বশ করিনি অবশ্য,তিনি সবটা দেখে নিজে থেকেই সাইক্রিয়াটিস্ট দেখানোর পরামর্শ দিলেন।আর সাইক্রিয়াটিস্ট কে জানো অভ্র?' সাগরিকা বলল,'অলোক নস্কর আর কেউ নন,তিনি আমাদের কলেজের জি.পি.স্যারের মাসতুতো ভাই।জি.পি.স্যারও এই সম্পূর্ণ প্ল্যানে আমাদের সাথেই ছিলেন।সবটা শুনেই তিনি তাঁর মাসতুতো ভাই অলোক নস্করের কথা বলেন,যিনি সাইক্রিয়াটিস্ট আর সেই সাথে অভ্র তোমাকে যে অ্যাসাইলামে ভর্তি করা হয়েছিল সেখানকার একজন ডক্টরও।সবটা শুনে অলোকবাবুও আমাদের পাশে দাঁড়ান,প্ল্যানের অংশীদার হন।'
— 'তারপরের গল্পটা আশা করি তুমি বুঝেই গেছ অভ্র',ঝুমকো হেসে বলল,'অলোকবাবুর চেম্বারে গিয়ে তুমি আবার রবিদা-দিদিভাইকে দেখলে,আমরাও দেখলাম,কিন্তু না দেখার ভান করলাম আমরা!এরপর অলোকবাবু তোমায় বাড়ি থেকে দূরে যাওয়ার কথা বললেন,আর সেখানে শুধু আমায় যেতে বললেন তোমার সাথে,এটাও প্ল্যানের অংশ ছিল আমাদের,যাতে নির্জন জায়গায় তোমায় ভয় পাওয়াতে আরও সুবিধা হয় আমাদের,আর দিগন্তপুর বাংলোয় তোমায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আমরা ইচ্ছে করেই করেছিলাম,কারণ এই দিগন্তপুরের বাংলোটা দিদিভাইয়ের ভীষণ প্রিয় সত্যি সত্যিই,আর দিগন্তপুরের প্রায় প্রত্যেকটি পরিবার দিদিভাইকে বড্ড ভালোবাসে,তাই এখানে এসেই তোমায় নিয়ে গেলাম সকলের বাড়িতে,যাতে দিদিভাইয়ের কথা শুনে ভয় আরও দানা বাঁধে তোমার মনে।' একটু থেমে ঝুমকো বলল,'আমি ইচ্ছে করেই আন্টির নীল শাড়িটা সেদিন সন্ধ্যেয় পরে তোমার মনে ভয়ের উদ্রেক করেছিলাম,তারপর রক্তাক্ত পাঞ্জাবির গল্প তো তুমি নিশ্চয়ই বুঝেই গেছ!আসলে অভ্র',ঝুমকো বাঁকা হেসে বলল,'অলোকবাবুর চেম্বার থেকে শুরু করে দিগন্তপুর কোথাও তুমি আর আমি আমরা দুজন যাইনি,তুমি যেখানেই গেছো সাথে গেছে রবিদা আর দিদিভাই,কিন্তু লুকিয়ে,তাই তুমি টের পাওনি কিচ্ছু।'

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________

— 'এরপর গাছে যে হার্ট সাইনটা আঁকা ছিল ওটাও আমাদের কাজ।তারপর রোজ রাতে ঘুম ভেঙে আমাদের দুজনকে বীভৎস অবস্থায় দেখা,টিভিতে আমার এনকাউন্টারের ভিডিও চালু হওয়া আবার অফ হওয়া সবটাই আমাদের বদান্যতায় হয়েছে সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে বাকি নেই তোর আর!' রবি হেসে বলল,'কি ভেবেছিলি অভ্র ঘুষ দিয়ে কেয়ারটেকারকে হাত করবি?ওরে বাংলোর বৃদ্ধ কেয়ারটেকার সাগরকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসত,সাগরের ওপর তুই যে কি কি অন্যায় করেছিস কিছুই তার জানতে বাকি ছিল না,তুই ভাবলি কি করে তার পরেও কেয়ারটেকার তোর কেনা হয়ে যাবে কটা টাকার বিনিময়ে?' রবি বলল,'যাই হোক,এরপর তুই সিসিটিভি ফিট করলি বারান্দায়,আমাদের সেটা নজর এড়ায়নি,ইচ্ছে করেই সিসিটিভিতে ধরা দিলাম আমরা,কিন্তু সাগরিকার ভিডিও এডিটিং দক্ষতা সম্পর্কে তুই তো অবহিত,তাই ওর দৌলতেই ভিডিও ফুটেজ থেকে আমরা ভ্যানিশ হয়ে গেলাম,অন টিভিটা হয়ে গেল অফ।আর সেদিন আমি আর সাগর দুজনেই হাতে বরফ ঘষে তোকে টাচ করেছিলাম,তাই জন্যই আমার হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা মনে হয়েছিল তোর,আর হাতে ছিল লাল রঙ আর নকল বড়ো বড়ো নখ,যাতে তুই সিওর হয়ে যাস যে আমরা জীবিত নই,আমরা ভূতই!তবে তুই যে এতটা ভেঙে পড়বি যে সুইসাইড অ্যাটেম্পট করবি সেটা আমরা ভাবিনি,আমরা ভেবেছিলাম অ্যাসাইলামে পাঠানোর ব্যবস্থা করব তোকে!জানিস অভ্র,যখন তুই হাতের শিরা কেটেছিলি,তখন বেশ ভয় পেয়ে গেছিলাম আমরা,কারণ তোর সুইসাইড আমাদের ছকের বাইরে ছিল।ভীষণ নিশ্চিন্ত হলাম যখন তুই সেযাত্রা বেঁচে গেলি!কি বোকা তুই অভ্র,নকল ভূতের ভয়ে কেউ সুইসাইড করে,হ্যাঁ?'
তিনজনেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
— 'কিন্তু আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম,তোমায় দিয়ে সত্যিটা স্বীকার করাবই,তাই অ্যাসাইলামেও রাতবিরেতে তোমার ওপর অ্যাটাক করলাম ভ্যাম্পায়ারের মতো',সাগরিকা হাসতে হাসতে বলল,'তাই বলে আমার এত ক্ষমতা তো নেই যে তোমার গাল কামড়ে রক্ত খাব,সেদিন রাতে তোমার গালে যে রক্তের দাগটা ছিল ওটাও লাল রঙই ছিল,আর সেদিন রাতে তোমার গাল আমি কামড়াইনি,ধারালো নকল নখ দিয়ে আঁচড় দিয়েছিলাম মাত্র!কিন্তু এতদিন এত ভয়ানক অপরাধ করা অভ্র এই সামান্য ঘটনায় এতটাই কাবু হয়ে পড়ল যে দ্বিতীয়বার সুইসাইড অ্যাটেম্পট করল!'
— 'দুবার তুই সুইসাইড অ্যাটেম্পট করে বেঁচে গেলি,কিন্তু তৃতীয়বার যদি কিছু অঘটন ঘটে যায় তাহলে তো সমস্যায় পড়ে যাব আমরা,আর আমাদের উদ্দেশ্যও জলে যাবে,তাই আর দেরি না করে তোর বেডে সাগর চিরকূট রেখে এল আঙ্কেল-আন্টির ছবিসহ।অন্যদিকে সাগরকে যে মাঠে রেখে এসেছিলি অ্যাসাইলামটাও ওই মাঠেরই কাছাকাছি,আর এটাও আমাদের প্ল্যানেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল,ইচ্ছে করেই ওই অ্যাসাইলামে তোকে ভর্তি করার ব্যবস্থা করেছিলেন ডাক্তারবাবু।তারপর আঙ্কেল-আন্টির জিনিসপত্র ছড়িয়ে তোকে নিয়ে এলাম মাঠে,তারপর তো যা যা ঘটল সবটাই তুই জানিস।' রবি বলল।
— 'আর সেদিন আন্টির সাথে যেটা ঘটল সেটা আমি বলব',ঝুমকো বলল,'আন্টি তো সেদিন দুঃখ-কষ্টে  বসেছিলেন ঘরে নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে,আর আগে থেকেই রবিদা আর দিদিভাই ওই ঘরের আলনার পিছনে লুকিয়ে ছিল,আন্টি খেয়াল করেননি।আর আমি ছিলাম ঘরের বাইরে,দরজাটা বাইরে থেকে আটকে দিয়েই আমি মিটার অফ করে দিলাম,আন্টি মোমবাতি খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন,আর সেই ফাঁকে দিদিভাই আয়নায় লাল রঙে লিখল,'রবি মিত্রও তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিল,তার মৃত্যুর খবর শুনে তার মা-বাবার মনের কি অবস্থা হয়েছিল বুঝতে পারছেন তো আজ?' আন্টি মোমবাতি জ্বালালেন যেই,প্রথমে রবিদা,তারপর দিদিভাই আলনার পিছন থেকে বেরিয়ে এল,যাতে আন্টি ওদের আয়নায় দেখতে পায়,তারপর যেই আন্টি পিছন ঘুরলেন,ওরা আলনার পিছনে তাড়াতাড়ি লুকিয়ে পড়ল,তারপরের ঘটনাও তুমি সবই আন্টির কাছে শুনেছ,আশাকরি বুঝেওছ।' এই পর্যন্ত বলে ঝুমকো থামল।

_________________________

Subscribe my YouTube channel : Suchandra Chakrabarti

_________________________


— 'সো অভ্র,আজ থেকে দুবছর আগে আসল এনকাউন্টার করে তুই আর তোর ফ্যামিলি আমায় শেষ করে দিতে চেয়েছিলি,চেয়েছিলি আমায় আর আমার সাগরকে চিরতরে আলাদা করে দিতে,সর্বোপরি ন্যায়কে খুন করে অন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে।আর আমরা?আমরা এনকাউন্টারের অভিনয় করে,মৃত্যুর অভিনয় করে অন্যায়কে এনকাউন্টার করে দিলাম,এনকাউন্টার করে দিলাম তোর আর তোর ফ্যামিলি,বন্ধুবান্ধব আর পোষা গুন্ডাদের সব অপকর্মকে,ভালোবাসা আর ন্যায়কে জয়ী করলাম।আমি আর সাগরিকা দু'বছর আগেই ধামুয়াতে বিয়ে করেছি একে অপরকে,সংসার সামলেও দিব্যি পড়াশুনা করছি আমরা।সাগরের স্বপ্ন ও পুলিশ অফিসার হবে,যাতে তোর মতো হাজার হাজার অভ্রকে ও শাস্তি দিতে পারে।আর অভ্র,এতকিছু শুনে নিশ্চয়ই তোর মাথায় প্রতিশোধের আগুন চেপে গেছে,ভাবছিস এখান থেকে কোনোমতে বেরিয়েই আবার সর্বনাশ করবি আমাদের,তাই না?কিন্তু সে গুড়ে বালি অভ্র!আজ তোর,তোর বাবার আর কিচ্ছু বাকি নেই,যাস্ট কিচ্ছু না!আঙ্কেলকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে,চাকরিটাও আর নেই ওঁর,আর ওনার প্রায় সব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেই ব্ল্যাক মানি ছিল,সেসবও বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ।সো অভ্র,তোর না আছে কোনো পলিটিকাল পাওয়ার,আর না আছে হাতে কোনো টাকাপয়সা!আন্টির হাতে যেটুকু টাকা ছিল ওটুকুও উনি তোদের কেস লড়ার উকিল রাখতে গিয়ে,জরিমানা দিতে গিয়ে খরচ করে ফেলেছেন,সো অভ্র,ইউ আর টোটালি ফিনিশড নাও!তুই যতই রাগে ফুঁসিস না কেন,এই জেল থেকে বেরোতেও পারবি না,আর কোনো বন্ধুবান্ধব,গুন্ডাবাহিনীকেও পাশে পাবিনা,আর আমাদের ক্ষতিও করতে পারবি না,সো এই জেলেই মানিয়ে নে!' রবি হাসতে লাগল,হাসিতে সঙ্গ দিল সাগরিকা আর ঝুমকোও।
— 'রবি তুই ভুল করছিস!' স্মিত হেসে অভ্র বলল,'হয়ত একসময় আমি হিংস্র এক সিংহ ছিলাম,যার ইচ্ছেপূরণ না হলেই দাঁত নখ বেরিয়ে আসত,কিন্তু আজ সেই সিংহটা বুড়ো হয়ে গেছে,দাঁত-নখও ভেঙে গেছে,আর সেই নখ-দাঁত আজ নয়,অনেকদিন আগেই ভেঙে গেছে,নইলে যে অভ্রকে তোরা চিনতিস,তোরা কল্পনা করতে পারতিস,যে অভ্রদীপ শিকদার সুইসাইড করতে পারে?তাও দু দুবার?রবি,জানিনা তোরা আজ আমার কথা বিশ্বাস করবি কিনা,কিন্তু এই কথাটা সত্যি,যে সেদিনের অভ্র আর আজকের অভ্রর মধ্যে অনেকটা তফাত,হয়ত এই মিথ্যে এনকাউন্টারটাই শেষ করে দিয়েছে পুরোনো অভ্রকে।তাই আজ আর তোদের আমাকে নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই,আজ আমি নিজের দোষেই সর্বহারা এক মানুষ,যে নিজেই জানেনা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সে কোথায় যাবে,কারণ শুনেছি মা নাকি বাড়িটা বন্ধক রেখেছে,মার হাতে যা টাকা আছে আমার মনে হয়না ওই বাড়ি মা ছাড়াতে পারবে,এছাড়াও শহরের ফ্ল্যাটটা সমেত আরও অনেকগুলো বাড়ি,বাংলো বাবার কালো টাকায় কেনা,ওগুলোও সব বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ।দশতলার ছাদ থেকে একদম নীচে পড়ে রক্তাক্ত ক্ষয়িষ্ণু এক মানুষ আজ আমি,তাই আমায় নিয়ে ভেবে আর সময় নষ্ট করিস না তোরা,তোদের জীবন আছে,পড়াশুনা আছে,সংসার আছে,আর ঝুম,তুমিও অন্য কোনো ভালো ছেলেকে বিয়ে করে সুখী হও।আমার আয়ু শেষ হয়ে এসেছে,মৃতপ্রায় মানুষকে নিয়ে এত টেনশন কেউ করে?' বলেই শ্লেষের হাসি হাসল অভ্র।
এই ঘটনার মাসখানেকের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল অভ্র।মেডিকেল রিপোর্টে জানা গেল,বহুদিন ধরেই প্রায় কিছুই খাওয়াদাওয়া করত না অভ্র,কাটাত ঘুমহীন রাত।বাঁচার ইচ্ছেটুকু চলে গিয়েছিল ওর,এর ওপর ছিল সকলের ওর প্রতি ঘৃণাবর্ষণ,সেই সাথে অপরাধবোধে দগ্ধ হচ্ছিল ও।তাই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুই শেষ ঠিকানা হল অভ্রর।

অন্যদিকে কেটে গেল আরও বেশ কয়েকটা বছর।রবি আজ শহরের এক কলেজে পড়ায়,আর সাগরিকা পুলিশ অফিসার।অভ্রর মতো অনেক অপরাধীর হাতে হাতকড়া পরায় সে,শাস্তির ব্যবস্থা করে আইন মেনে।

(সমাপ্ত) 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ