ত্রয়োবিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
প্রথম বর্ষ,দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা মিটে গেল।এগিয়ে এল অভ্র-সাগরিকার বিয়ের দিন।ধামুয়ার ভাড়া বাড়িতে যে বিয়ের অনুষ্ঠানটা হবে,তার জন্য রবির মা-বাবা সাগরিকার জন্য নীল বেনারসি আর রবির জন্য ধুতি-পাঞ্জাবি কিনেছেন।
— 'উফ,আমার নীল চোখের বৌটাকে নীল শাড়িতে কি যে অপূর্ব লাগবে সেটা ভেবেই তো আমার ঘুম আসছে না!বিয়ের মন্ডপে তোমার রূপের ছটায় আমি মাথা ঘুরে না পড়ে যাই তাই ভাবি!'
— 'পড়ে যাওয়াচ্ছি আমি!পড়লেই মাথায় একবালতি জল ঢেলে দেব,এক ন্যানোসেকেন্ডে জ্ঞান চলে আসবে!'
— 'ছি ছি ছি,বিয়ের কনে কিনা বরের মাথায় জল ঢেলে দেবে,উফ কি দস্যি রে বাবা!'
— 'হুঁঃ,দস্যিপনার কি দেখলে তুমি?একবার শুধু বিয়েটা হোক,তারপর হাড়ে হাড়ে টের পাবে যে কাকে বিয়ে করেছ তুমি!'
— 'হ্যাঁ,সে আর আমার বুঝতে বাকি নেই!'
রবি আর সাগরিকা হাসতে থাকে ফোনের দুই পারে।পাশ থেকে গলা খাঁকরি দেয় ঝুমকো,'নিজে তো দিব্যি বিয়ে করে চলে যাবি,তারপর আমার কি হবে শুনি?আমার জন্য একটা বর জুটিয়ে দে না রবিদার মতো!'
— 'তবে রে!' বলেই ঝুমকোর কান মলে দেয় সাগরিকা,'এতটুকু মেয়ে,সে করবে বিয়ে!তোর মজা দেখাচ্ছি আজ দাঁড়া!'
— 'আহ দিদিভাই,ছাড় না,লাগছে তো!'
সাগরিকা ওর কানটা ছেড়ে ওকে বুকে টেনে নেয়,'সময় আসুক,আমি আর রবিদাই তোর বিয়ে দেব দাঁড়িয়ে থেকে,কেমন?'
এইভাবেই খুনসুটিতে,আর হাসিমজায় দিন কাটছিল সাগরিকা-ঝুমকো আর রবিদের পরিবারের।এরপর এসে গেল সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন,যেদিনটিকে পৃথিবী সাগরিকা-অভ্রর বিয়ের দিন বলেই জানে,শুধু কতিপয় মানুষ জানে,আসলে বিয়েটা রবি-সাগরিকার।যথারীতি বিয়ের সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অভ্র আর সাগরিকা দুজনের পরিবারেই সব নিয়মকানুন পালন করা হল।এরপর বিকেল গড়িয়ে নেমে এল সন্ধ্যে।যত সময় গড়াচ্ছে ততই দুশ্চিন্তা বাড়ছে সাগরিকার,ভাবছে ও সাবধানে পালিয়ে যেতে পারবে তো বিয়েবাড়ি ছেড়ে?কোনোভাবে ধরা পড়বে না তো?
সাগরিকা-অভ্রর বিয়ের লগ্ন রাত ন'টায়।সন্ধ্যে ছ'টা থেকেই সাগরিকার মামা-মামীমা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন সাগরিকাকে কনে সাজানোর জন্য।সাগরিকার মায়ের লাল টুকটুকে বেনারসিতে,আর গয়নায় সাজানো হল তাকে।কনে সাজানো শেষ হওয়ার পর সবাই সাগরিকার ঘর ছেড়ে চলে গেল,রইল শুধু ঝুমকো।
— 'দিদিভাই,এই সুযোগ!'
— 'হ্যাঁ রে ঝুমকো,আমি রবিকে মেসেজ করে দিয়েছি,ও গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে।'
এরপর সাগরিকা কনের সব সাজ-গয়না খুলে ফেলে সাধারণ একটা শাড়ি পড়ল,আর গায়ে জড়াল কালো চাদর,যাতে মুখটা আড়াল হয়।তারপর সকলের অলক্ষ্যে বেরিয়ে এল বিয়েবাড়ি থেকে।রবি ছদ্মবেশে বাইরে অপেক্ষা করছিল,সাগরিকা বেরিয়ে আসতেই রবি বলল,'চল সাগর!'
গাড়িতে উঠে পড়ল ওরা।সাগরিকা পরম নিশ্চিন্তে প্রেমিকের বুকে মাথা রাখল,'উফ রবি,কি যে টেনশন হচ্ছিল কি বলব,ভাবছিলাম বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় কেউ সন্দেহ করবে না তো!তারপর দেখলাম,সবাই খুব ব্যস্ত বিয়ের কাজকর্মে,আর মামা-মামীমার তো কোনোদিকে তাকানোর ফুরসতই নেই,তাই খুব সহজেই বেরিয়ে চলে এলাম।'
রবি বলল,'আমাদের দুজনের এতদিন ধরে দেখা সব স্বপ্ন,আশা পূরণ হতে চলেছে রে,যাস্ট কয়েকটা ঘন্টার অপেক্ষা।'
— 'হ্যাঁ গো,মনোরমা হোটেল তো কয়েক ঘন্টার রাস্তা,ওখানে একবার পৌঁছে গেলেই নিশ্চিন্ত,আর অভ্র আমাদের খুঁজে পাবে না।'
— 'একদম রে!আর এখন বাজে পৌনে সাতটা,অভ্রদের বিয়েবাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে আটটা হবে,আর ততক্ষণে....'
— 'ততক্ষণে বিয়ের কনে ঘর বেঁধেছে অন্য কারো সনে!'
— 'উফ,তুই যে ছন্দ মিলিয়ে কথা বলছিস দেখছি!'
— 'আসলে এত খুশি আমি আজ যে কি বলব তোমায় রবি!'
— 'ওদিকে আমাদের রেজিস্ট্রি ম্যারেজের জন্য আসছেন যে উকিলবাবু,তিনিও বেরিয়ে পড়েছেন অনেকক্ষণ,আর পনেরো-কুড়ি মিনিটের মাথায় পৌঁছে যাবেন।'
— 'যাক বাবা,নিশ্চিন্ত।'
— 'ওদিকে অভ্রর পরিবার বেরিয়ে পড়েছে সাড়ে পাঁচটার দিকে,আর ওরা বেরোনোর পরেই মা-বাবাও বেরিয়ে পড়েছে ধামুয়ার পথে।'
— 'ব্যস,তাহলে তো একদম নিশ্চিন্ত!'
ঘন্টাখানেক পর গাড়িটা এসে থামল মনোরমা হোটেলের সামনে।রবি আর সাগরিকা গাড়ি থেকে নামল,তারপর হোটেলের ম্যানেজারের কাছ থেকে ওরা রুমের চাবিটা নিয়ে এগিয়ে গেল রুমের দিকে,একে অপরের হাত ধরে।ওদের রুমটা তিনতলায়।রুমের দরজাটা খুলে ভেতরে এগিয়ে গেল ওরা।দেখল,কালো কোট পরে একজন লোক চেয়ারে বসে আছে ওদের পিছন হয়ে।লোকটিকে উকিলবাবু ভেবে রবি জিজ্ঞেস করল,'অনেকক্ষণ বসে আছেন স্যার?আর ওয়েট করতে হবে না আপনাকে,আমরা এসে পড়েছি।'
রবির ডাকে ওদের দিকে ফিরে তাকাল লোকটা,আর ওকে দেখেই ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেল রবি-সাগরিকা।এ যে উকিলবাবু নন,এ যে প্রীতম!কলেজে যাকে সকলে অভ্রর ডানহাত বলে চেনে!
— 'প্রী প্রীতম তু তুই এখানে!' রবি কোনোরকমে বলল।আর সাগরিকা কথা বলার অবস্থাতেই নেই।
— 'কি আর বলি,তোরা এতক্ষণ ওয়েট করালি!সেই কখন থেকে আমি,মানে আমরা তোদের জন্য ওয়েট করছি বল তো!'
— 'আমরা বলতে?'
— 'আহ সাগরিকা,অত ব্যস্ততা কিসের?যাস্ট ওয়েট অ্যা মিনিট!' বলেই ঘরের লাগোয়া যে বাথরুমটা ছিল তার দরজাটা খুলে দিল প্রীতম,আর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল বেশ কিছুজন।ওদের দেখে রবি সাগরিকা আরও ভয় পেয়ে গেল,শক্ত করে একে অপরের হাত ধরল ওরা।
0 মন্তব্যসমূহ