এনকাউন্টার
অষ্টত্রিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
কিন্তু সকলকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল,কেউই ওই সময় বাগানে যায়নি।ঝুমকো বিরক্ত হয়ে বলল,'সবে চোখটা বুজেছিলাম,ওমনি তুমি চিৎকার শুরু করলে অভ্র!ধুর ঘুমটাই চটকে গেল!'
— 'ঝুমকো আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি,আসলে একটা মেয়েকে দেখলাম বাগানে,মেয়েটা জানো নীল শাড়ি...'
— 'দূর,এত রাতে কে নীল শাড়ি পরে বাগানে যাবে?ড্রিংক করছ করো অভ্র,কিন্তু প্লিজ এত বেশি খেও না যাতে হ্যালুসিনেশন হয়!'
— 'আমি হ্যালুসিনেট করিনি ঝুমকো,বিশ্বাস করো,মেয়েটার লালচে কালো চুল ছিল,আর একটা হীরের দুল ছিল যেটা আমি গিফট করেছিলাম...'
— 'অভ্র!' অভিজিৎবাবু ধমক দিয়েই ওকে ঘরে নিয়ে গেলেন,তারপর ঘরে নিয়ে গিয়েই দরজা বন্ধ করে দিলেন ভেতর থেকে।তারপর বললেন,'তুমি তো দেখছি একবাড়ি লোকজনের সামনে আমাদের সবাইকে ফাঁসাবে!তুমি কি বাই এনি চান্স এটা বলতে চাইছ যে তুমি সাগরিকাকে দেখেছ বাগানে?'
— 'না বাবা আমি সেটা কখন বললাম?কিন্তু বাগানে গিয়ে আমি একটা দুল পেলাম,যেটা সাগরিকাকে আমি গিফট করেছিলাম!'
— 'ঝুমকো ঠিকই বলেছে জানিস তো,আজ ড্রিংকটা বেশিই করে ফেলেছিস তুই,তাই যত আবোলতাবোল বকছিস!মানে সেই দু'বছর আগে দেওয়া দুলটা পরে মরা সাগরিকার ভূত এসেছিল তোর ঘাড় মটকাতে,তাই তো?'
— 'বাবা আমি তো...'
— 'থাক,অনেক সিনক্রিয়েট করেছিস তুই,এবার দয়া করে নিজের ঘরে যা,ঘরে গিয়ে ঘুমো এবার,আর আমাদেরও ঘুমোতে দে,খুব টায়ার্ড আমরা সবাই।'
অভ্র শুতে গেল নিজের ঘরে।আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল ও,বিছানার পাশের জানালাটা খোলা রইল।অভ্র গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল একটু পরেই।এইভাবে কতক্ষণ অভ্র ঘুমিয়েছিল তা সে নিজেই বুঝতে পারেনি,কিন্তু হঠাৎই ওর ঘুম ভেঙে গেল।কে যেন ওকে খুব আস্তে আস্তে ডাকছে,'অভ্র!অভ্র!' অভ্রর মনে হল ডাকটা যেন ওর মাথাটা যেদিকে বিছানার,সেই দিক থেকে আসছে।
তাড়াতাড়ি অভ্র উঠে বসল।সেদিন ছিল পূর্ণিমা,বিছানা লাগোয়া জানালাটা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছিল বিছানায়,অভ্র সেই বিছানায় এসে পড়া আলোর দিকে তাকিয়েই চমকে গেল,দেখল একটা ছবি পড়ে আছে বিছানায়।তাড়াতাড়ি ছবিটা চাঁদের আলোয় নিয়ে গিয়ে দেখে,ওটা সাগরিকার ছবি।'না' বলে চিৎকার করে উঠেই ছবিটা ফেলে দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘরের আলোটা জ্বালাতে গেল অভ্র,কিন্তু ঘরের আলো জ্বলল না কিছুতেই।তাড়াতাড়ি মোবাইলটা খুঁজতে গেল অভ্র মোবাইলের টর্চ জ্বালাবে বলে,কিন্তু মোবাইল সে পেল না বিছানায়।তন্নতন্ন করে গোটা বিছানা খুঁজেও সে মোবাইলটা পেল না।এবার ভীষণ ভয় গ্রাস করল অভ্রকে,কারণ মোবাইলটা ও বিছানায় নিয়েই শুয়েছিল,স্পষ্ট মনে আছে ওর।অভ্র তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল বাইরে,কিন্তু বেরোতে গিয়ে ও দেখল ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ।অভ্র এইবার কেঁদে ফেলল,মেঝেতে বসে পড়ে ককিয়ে উঠল ও।হঠাৎই দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।অভ্র তাড়াতাড়ি ছুটে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে মা-বাবার ঘরের দিকে চলে গেল,আর গিয়েই তাদের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করতে লাগল,'মা!বাবা!প্লিজ দরজাটা খোলো!'
— 'কি হয়েছেটা কি অভ্র?' অভিজিৎবাবু দরজাটা খুলে বললেন।
— 'বাবা,আজ আমি তোমাদের ঘরে শোবো!'
— 'অ্যাঁ?কেন?তোমার ঘরে কোনো প্রবলেম হয়েছে?'
— 'হ্যাঁ বাবা,আমি আর ওই ঘরে শুতে পারব না,প্লিজ!'
— 'কিন্তু তোর ঘরে প্রবলেমটা হয়েছে কি?সেটা তো বল!' তনিমাদেবী বললেন।
— 'বেশ,তাহলে এসো তোমরা,নিজেরাই দেখে যাও কি হয়েছে!'
— 'চল!'
অভ্র মা-বাবাকে নিয়ে এল নিজের ঘরে,তারপর সব ঘটনা খুলে বলল।অভিজিৎবাবু আর তনিমাদেবী কিছুই বিশ্বাস করলেন না,বরং হেসে উড়িয়ে দিলেন সব কথা।
— 'তোর ঘরের কোনো লাইটই জ্বলছিল না?তাই?' বলেই অভিজিৎবাবু অভ্রর ঘরের আলোর সুইচ টিপলেন,আর আলোটা স্বাভাবিকভাবেই জ্বলে উঠল।
_________________________
Subscribe my YouTube channel : Suchandra Chakrabarti
_________________________
— 'আর অভ্র,তোর মোবাইল তো বিছানাতেই রয়েছে,ওই দেখ', বলেই তনিমাদেবী আঙুল দেখালেন ওর বিছানার দিকে,অভ্র সেদিকে তাকিয়ে দেখে সত্যিই মোবাইলটা ওর বালিশের পাশেই রয়েছে।
— 'আর যেন কি বললি?সাগরিকার ছবি?কোথায় ওর ছবি দেখা তো!'
— 'ওই তো,বিছানাতেই ছিল আমার পাশে,ওই জানালার দিকে',বলেই অভ্র বিছানায় খুঁজতে গেল ছবিটা,কিন্তু খুঁজে পেল না ছবিটা।গোটা ঘর তিনজনে মিলে খুঁজলেন,কিন্তু কোথাও সাগরিকার কোনো ছবি নেই।
— 'হল তো অভ্র?তোর কি হয়েছেটা কি বল্ তো!মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি,রাতবিরেতে আমাদের ডেকে এনে যতসব আষাড়ে গল্প শোনাচ্ছিস!' বিরক্ত তনিমাদেবী বললেন।
— 'তাই না তাই!একটা ভালো মেয়ের সাথে বিয়ে দিলাম,আর বিয়ের পরের দিন থেকেই শুরু হল ওনার পাগলামো!যত্তসব!তুই এরকম পাগলামি করতে থাকলে ঝুমকো তোকে ছেড়ে পালাবে,আর ওর বাবার বিশাল সম্পত্তি হাতছাড়া হবে আমাদের!' অভিজিৎবাবু রাগীস্বরে বললেন।
— 'তোমরা কেন আমার কথা বিশ্বাস করছ না!' কাতরস্বরে অভ্র বলল,'আমি কিছু বানিয়ে বলছি না,আমি সবটা নিজের চোখে দেখেছি!'
— 'থাক অভ্র,অনেক পাগলামো করেছ তুমি,এবার রেহাই দাও!আর শোনো,তুমি তো জানোই আমি অনেক রাত পর্যন্ত বই পড়ি,আমাদের ঘরের নাইট ল্যাম্পটা আজ সমানে জ্বলছিল,একবারও লোডশেডিং হয়নি আজ,তাই শুয়ে পড়ো চুপচাপ,আর বাড়াবাড়ি কোরোনা,বাড়িতে অনেক লোকজন আছে এখন,ভুলে যেওনা!'
0 মন্তব্যসমূহ