পঞ্চবিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'এই তো লক্ষ্মী বউটি আমার,এসো এইবার সবটা বলি।' ক্রূর হেসে অভ্র বলতে লাগল,'সপ্তাহের প্রতিটা দিন আমি তোর বাড়ির ওপর নজর রাখতে শুরু করলাম,কিন্তু সন্দেহজনক কোনো কিছুই চোখে পড়ল বুধবারের বিকেল পর্যন্ত।কিন্তু বুধবার দেখলাম কালো বোরখা পরা এক মহিলা বেরোলেন তোদের বাড়ি থেকে,ভাবলাম,'এটা আবার কে?' তুই যে এরকম সাজে বেরোবি সেটা মাথাতেই আসেনি আমার,তারপর সিওর হলাম তোর চোখদুটো দেখে,ওই নীল চোখদুটোই বলে দিল ডার্লিং,যে এটা তুই!'
— 'তু তুমি এইভাবে ফলো করেছ আমায়!'
— 'তোকে নয়,তোদের।আর এতে অন্যায় কি আছে সোনা?তুমি আর তোমার প্রেমিক আমায় ফলো করলে দোষ নয়,আর আমি ফলো ব্যাক করলেই দোষ!এভাবে হয় না যে ডিয়ার!আচ্ছা,তারপর পুরো গল্পটা তো শোন রিকা!এবার আসি লাবণ্য-টিয়াদের প্রসঙ্গে।তুই আর তোর পেয়ারের রবিই যে লাবণ্যদের টাকার লোভ দেখিয়ে সবটা স্বীকার করে নিতে বলেছিলি কলেজ অথরিটির কাছে,তা আমার বুঝতে বাকি নেই!'
— 'না না,বিশ্বাস করো অভ্র,রবি এখানে কিচ্ছু করেনি,যা করার সবটাই আমি করেছি।ও জানতই না ব্যাপারটা!' কাতরস্বরে সাগরিকা বলল।
— 'ও হ্যাঁ তাই তো,ও তো একটা ভিখিরি,কলেজের আর হোস্টেলের ফিস জোগাড় করতেই হিমসিম খায়,ও আবার পঞ্চাশ হাজার টাকা কোথা থেকে আনবে?তা তুই ওদের আননোন নাম্বার থেকে ফোন মেসেজ করে টাকা দেবার কথা বললি,পঞ্চাশ লাখ টাকা মোট।আর ওরাও নাচতে নাচতে অভ্রদীপ শিকদারের বিরোধিতা করল,রবি আবার সবার চোখে মহান হয়ে উঠল,কলেজে আসতে শুরু করল।বিশ্বাস কর রিকা,ওকে দেখে গা রি রি করে জ্বলত আমার,কি করে জানব এসবের পেছনে তুই আছিস!আমি তো তোর নাটকে মুগ্ধ হয়ে ভাবছি তুইও ওকে দেখে আমার মতোই জ্বলছিস!এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল জানিস রিকা,কিন্তু রবির অপমানের জ্বালায় তুমি বেশি ইমোশনাল হয়ে পড়লে,আর লাবণ্য-মুস্কানদের পাঠানো কাগজগুলোতে লিখে দিলে কিসব যেন নীতিকথা টথা!ব্যস,লাবণ্যরা বুঝে গেল,রবির কাছের কোনো মানুষই এই কাজটা করেছে!ওরা আমার কাছে এসে হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল,কান্নাকাটি করল,বলল,দ্বিতীয়বার এই ভুল আর করবে না।হাজার হোক মেয়েমানুষ তো,তুমি তো জানোই রিকা ডার্লিং,মেয়েমানুষদের প্রতি আমার আলাদাই দুর্বলতা আছে,তার ওপর যাদের সাথে আমি কত স্পেশাল মোমেন্ট কাটিয়েছি,তাদের কি আর ক্ষমা না করে পারি বলো?ক্ষমা করে আবারও কাছে টেনে নিলাম ওদের!'
— 'ছিঃ অভ্র ছিঃ!তোমার নোংরামির কথা তুমি এভাবে বলছ নির্লজ্জের মতো!লজ্জা-ঘৃণা বলে কি সত্যিই কিছু নেই তোমার?'
— 'একদম ঠিক ধরেছ প্রিয়তমা।ওই যে কথায় বলে না,লজ্জা ঘৃণা ভয় তিন থাকতে নয়,তাই আমার তিনটের কোনোটাই নেই!তাছাড়া সোনা,তোমার সামনে বিয়ে ঠিক হওয়া সত্ত্বেও তুমি গোপন প্রেমিকের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছ রাস্তাঘাটে,আজ আবার বিয়ের মন্ডপ ছেড়ে পালিয়ে এলে,এগুলো বুঝি নির্লজ্জতা নয়,ব্যাভিচারিতা নয় সোনা?'
— 'বেশ তো,আমি যখন নির্লজ্জ বেহায়া জানোই,তাহলে কেন আমায় বিয়ে করতে চাইছ তুমি?ছেড়ে দাও না আমায়,অন্য কাউকে বিয়ে করো না গিয়ে!'
— 'কি যে সব এক একটা জোকস বলো না তুমি ডার্লিং,' অভ্র হাসিতে ফেটে পড়ে,' আমার বাবা কত বড়ো রাজনীতিবিদ তুমি জানো?তাঁকে গোটা রাজ্য চেনে।সবাই জানে,আজ তাঁর একমাত্র ছেলের বিয়ে সাগরিকা মজুমদারের সাথে।সকাল থেকে মিডিয়া আজ এই খবরটাই প্রচার করে যাচ্ছে,এখন যদি মিডিয়া শোনে যে কনে বিয়ের মন্ডপ ছেড়ে পালিয়েছে,বাবার মানসম্মান আর থাকবে?তাই বিয়ে তো তোমায় করতেই হবে আজ,আমাকেই করতে হবে।'
অভ্র আরও এগিয়ে যায় সাগরিকার দিকে।ভয়ে সিঁটিয়ে যায় সাগরিকা।অভ্রর নিশ্বাস পড়তে লাগল সাগরিকার কপালে।
অভ্র বলে যায়,'তারপর বাকি গল্পটা বলি আয়।আমি তো তারপর বুঝেই গেলাম আন্টির কথা শুনে যে সবটাই তোর অভিনয়।এটাও বুঝে গেলাম তুই আমায় বিয়ে করতে চাস না।ওদিকে রবি বুধবার আর শুক্রবার যে বাড়িতে টিউশন পড়াতে যেত সেই বাড়িতে আমার লোক লাগালাম নজর রাখার জন্য,দেখলাম ওদিকেও সেম কেস।ঢুকছে রবি,আর বেরোচ্ছে কালো বোরখা পরনে এক মহিলা!উফ কি আইডিয়াই বার করেছিলি তোরা মাইরি আমায় ধোঁকা দেওয়ার জন্য!তোদের ফলোও করত আমার লোক,কিন্তু এত চাপা গলায় ডিসকাস করতিস তোরা রাস্তায়,শুনতে পাওয়া দুঃসাধ্য ছিল।তুই বিয়ে যে আমায় করবিনা কিছুতেই,তা আমার বুঝতে বাকি ছিল না,কিন্তু তোদের প্ল্যানটা কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না।ভাবলাম এভাবে হবে না,তাই নতুন আইডিয়া বের করলাম এবার!আচ্ছা রবি,মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড,তোদের মফস্বলের বাড়িতে যে মাসি কাজ করত তার যেন কি নাম?'
— 'বিনীতামাসি।' বিরক্তির সুরে রবি বলল।
— 'হ্যাঁ।তা রবি,একমাস আগেই হঠাৎ কি যেন একটা রোগে পড়ল মাসি?'
— 'হ্যাঁ,টাইফয়েড হয়েছিল।'
— 'হুম,সেইজন্যই বিনীতামাসি ফোনে তোদের জানাল,যে বিনীতামাসির মেয়ে রুমিতা কাজে আসবে যতদিন না মাসি সুস্থ হচ্ছে,কি তাই তো?'
— 'সবই তো জানিস অভ্র,অন্যের ওপর নজর রাখা ছাড়া আর কিই বা করতে পারিস তুই?যখন জানিস সবই আর জিজ্ঞেস করছিস কেন শুধু শুধু?' রবি ঘৃণার সুরে বলল।
— 'কারণ আছে বস,অভ্র শিকদার কারণ ছাড়া একটা শব্দও খরচ করে না মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড!' বাঁকা হেসে অভ্র বলল।
— 'কি কারণ?'
0 মন্তব্যসমূহ