ঊনত্রিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'যাস্ট শাট আপ!আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা,তাই বলে আমার ছেলেকে আপনি নোংরা বলবেন?হাউ ডেয়ার ইউ!আর শুনুন,আপনি যদি শুধু সোশ্যাল স্ট্যাটাস আর টাকা না দেখে মেয়েটার মন বোঝার চেষ্টা করতেন একটু,তাহলে আর রবি সাগরিকাকে এই কাজ করতে হত না,পালাতে হত না বিয়ের আসর ছেড়ে!'
— 'হুম সেই,যাতে সাগরিকার গায়ে নষ্ট মেয়ের তকমাটা আরও আগে লাগিয়ে দিতে পারত আপনার ছেলে,আর তারপর ভিডিও দেখিয়ে ওকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করতে পারত!ওর মতো ভিখিরি ছেলেদের তো ওই ধান্দা,আর তো কিছু করার মুরোদ নেই!'
— 'ডোন্ট ক্রশ ইয়োর লিমিট ওকে!হ্যাঁ হতে পারি আমরা গরীব,বড়োলোক নই আপনাদের মতো কিন্তু আমাদের ফ্যামিলিতে শিক্ষা আছে,মনুষ্যত্ব আছে,যেটা আপনাদের চোখের মণি অভ্রর ফ্যামিলিতে নেই!'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝতেই পারছি সব কার কত শিক্ষা!ছেলেকে ভালোই ট্রেনিং দিয়েছেন তো দেখছি!কিভাবে ইমোশনাল ফুল বানাতে হয় বড়ো ঘরের মেয়েদের তা রবি তো আপনার কাছেই শিখেছে!আর লিমিট ক্রশ করার কথা আপনি কোন্ মুখে বলেন?আপনাদের ছেলে রবি আমাদের মেয়েটাকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে ওর ওপর এমন নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছে যে মেয়েটা আধমরা হয়ে আছে,জ্ঞান ফেরেনি ওর,হসপিটালে নিয়ে যেতে হয়েছে,আদৌ বাঁচবে কিনা জানিনা!আর বেঁচেই বা কি লাভ?এই সমাজে তো আর মুখই দেখাতে পারবে না ও!নিজে তো ডুবলই,সেই সাথে হতভাগিনী আমাদের মানসম্মানটাও ডোবালো!ঘরে আর একটা মেয়ে আছে,তার কিভাবে বিয়ে দেব কে জানে!আর এইসব হয়েছে রবির জন্য!ইচ্ছে করছে মার্ডার করে ফেলি!নেহাত পুলিশ ওকে লকাপে নিয়ে গেল তাই,নইলে আজ আমিই ওকে খুন করতাম!'
— 'আপনি কি বলছেন কিছুই বুঝতে পারছি না!সাগরিকাকে রেপ করা হয়েছে,আবার এর জন্য রবিকে লকাপে নিয়ে যাওয়া হয়েছে,এসব কি বলছেন টা কি আপনি?যাই হোক ছাড়ুন,বাদ দিন,আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই,যা গালিগালাজ করছেন সন্তানের বয়সী একটা ছেলেকে!' বলেই ফোন নামিয়ে রাখলেন সূর্যদেব বাবু।চিন্ময়ী দেবীকে বললেন,'রেডি হয়ে নাও,শহরে যেতে হবে!'
— 'এক্ষুণি এত রাতে?'
— 'হ্যাঁ দরকার আছে।আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস কোরোনা,কারণ আমিও কিছু বুঝতে পারছিনা এদিকে বসে।ওখানে না গেলে কিছুই বোঝার উপায় নেই।'
অন্যদিকে রবি লকাপে কিছুতেই স্থির থাকতে পারছে না,বারবার ব্যস্ত হয়ে পুলিশদের ডাকাডাকি করে জানতে চাইছে সাগরিকা কেমন আছে।হঠাৎ ও দেখে,হেনা এসেছে ওর সাথে দেখা করতে।
— 'হেনাদি তুমি?'
— 'হ্যাঁ ভাই রবি,টিভিতে খবরটা শুনেই ছুটে এলাম।'
— 'টিভিতে?'
— 'হ্যাঁ রে ভাই,এখন যে বাড়িতে ঠিকে কাজ করি আমি,ওই বাড়িতে টিভিতে খবরে দেখাচ্ছিল 'অভিজিৎ শিকদারের হবু পুত্রবধূকে হোটেলে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে,অভিযোগের তীর অভিজিৎ শিকদারের ছেলে অভ্র শিকদারের সহপাঠী রবি মিত্রর দিকে।' আবার হসপিটালে গিয়ে অভ্ররও নাকি বয়ান নেওয়া হয়েছে,আর সে যে কি বলবে সেটা আশাকরি তোকে বলে দিতে হবে না আর!'
— 'হেনাদি বিশ্বাস করো...'
— 'রবি তোকে কিচ্ছু বলতে হবেনা রে ভাই,কিচ্ছু বলতে হবে না।আমার বুঝতে বাকি নেই এই কাজ কে করেছে!এই কাজ অভ্র আর ওর চ্যালারাই করেছে তা আর আমায় বলে দিতে হবে না!'
— 'হেনাদি জানো তো আমি এখন একদমই নিজেকে নিয়ে চিন্তিত নই,আমি শুধু সাগরের কথা ভাবছি!ও কেমন আছে কিছু বলেছে নিউজে?'
— 'অবস্থা ভালো নয় রে রবি,জ্ঞান ফেরেনি এখনো,ডাক্তাররা বলতে পারছে না কখন জ্ঞান ফিরবে!'
— 'হেনাদি ওর কি হবে এখন?' অসহায় রবি কাঁদতে লাগল,'সাগরের ওপর কি অত্যাচারটাই করল সবাই মিলে,আর আমি কিচ্ছু করতে পারলাম না,শুধু দেখলাম,কি যে ঘেন্না হচ্ছে নিজের প্রতি কি বলব!'
— 'কি?তোর চোখের সামনে হয়েছে সবটা?হ্যাঁ রে জানোয়ার গুলো আর কত নীচে নামবে?আর তুই কিছু করতে পারিসনি কেন রে রবি?'
— 'আমায় বেঁধে রেখেছিল ওরা চেয়ারের সাথে হেনাদি!'
— 'এত নোংরা ওরা?'
— 'ওদের কথা ছাড়ো হেনাদি,ওদের মানুষ বলেই ভাবিনা আমি,আর ভয়টা তো সেখানেই!এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে একমাত্র সাগরই পারে কেসটা একদম ঘুরিয়ে দিতে,ওরা সাগরের কোনো ক্ষতি না করে!আমার আর কি হবে,বড়োজোর জেল হবে,সে হোক ও কিছুনা,কিন্তু আমার সাগরের কি হবে হেনাদি!'
— 'না রে রবি এইভাবে বলিস না।তোর সাগরের জন্যই তোকে গরাদ থেকে বেরোতে হবে,নইলে বুঝতে পারছিস কি করবে ওরা মেয়েটাকে একা পেয়ে!'
— 'আমি তো রুমে ছিলাম সবটা যখন ঘটল,কি করতে পেরেছিলাম আমি বলো?পারিনি,কিচ্ছু পারিনি আমি,কিচ্ছু করতে পারিনি সাগরের জন্য!' রবির চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে,'হেনাদি তুমি যাই বলো,সাগরকে আমি বাঁচাতে পারিনি ওদের হাত থেকে,এর জন্য আমারও কিছু শাস্তি প্রাপ্য গো!'
— 'এটা পাগলামো করার সময় নয় রবি,কেন বুঝতে চাইছিস না!এখন তোকে শক্ত থাকতে হবে,লড়তে হবে,এখান থেকে বেরোতে হবে!'
— 'আর শক্ত!যার জন্য এই সবকিছু সেই তো বাঁচবে কিনা আমি জানিনা!আর বাঁচলেও অভ্র বাঁচতে দেবে কিনা....'
— 'ভগবান আছে রবি,কিচ্ছু হবেনা তোর সাগরের।আর তুই চিন্তা করিস না,কোর্টে কেসটা যখন উঠবে,আমি কোর্টে যাব সাক্ষী দিতে,আমার ওপর যেটা হয়েছে সেটাও বলব আমি।অনেক ভয় পেয়েছি,ভয় পেলে এই রাক্ষসগুলোর সাহস আরও বেড়ে যায় জানিস তো রবি!'
হঠাৎই এক কনস্টেবল এসে হেনাকে বলল,'সময় হয়ে গেছে,আপনি এখন আসুন!'
হেনা রবিকে বলল,'আমি আসি রে ভাই,আবার আসব আমি,' বলে হেনা চলে গেল।
0 মন্তব্যসমূহ