ষড়বিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'কারণটা হচ্ছে,বিনীতামাসির রোগটা আমারই সৃষ্টি।'
— 'মানে?'
— 'মানে বিনীতামাসির টাইফয়েড-টয়েড কিছুই হয়নি।আসল গল্পটা হল,একদিন দুপুরবেলা,বিনীতামাসি আর রুমিতা নিজেদের ঘরে আরাম করে খেতে বসেছিল,ঠিক তখনই আমার গুন্ডাবাহিনী সহ আমি হাজির।গুন্ডারা এসেই আমার নির্দেশমতো বিনীতামাসিকে কিডন্যাপ করল,তুলে নিয়ে গেল আমার ডেরায়।রুমিতা এসেছিল বাধা দিতে,ওকে আমি আর প্রীতম আটকালাম।তারপর ওকে বলে এলাম,'তোমার মা এখন আমাদের হেফাজতে রইল।চিন্তা কোরোনা,তোমার মায়ের কোনো অযত্ন হবে না আমাদের কাছে,কোনো ক্ষতিও করব না তোমার মায়ের আমরা,একমাস পরে ছেড়ে দেব তোমার মাকে।কিন্তু তার বিনিময়ে যে একটা কাজ করতে হবে তোমায় রুমিতা রাণী!' রুমিতা তখন ব্যস্ত হয়ে বলল,'কি কাজ?' আমি হেসে বললাম,'তেমন কিছুই না,শুধু তোমায় রবিদের বাড়ি,আই মিন সূর্যদেব মিত্রর বাড়িতে এই একমাস কাজে যেতে হবে,আর ওদের সব আলোচনা,কথাবার্তা শুনবে,শুনে আমাকে জানাতে হবে।চিন্তা নেই,ওদের যা বলার বিনীতামাসিকেই দিয়েই বলিয়ে নেব ফোনে,তাই ওরা কেউ সন্দেহ করবে না তোমায়।একমাস হয়ে গেলে,আই মিন আমার বিয়ের দিন সকালেই তোমার মাকে আমরা ছেড়ে দেব।' মনোরমা হোটেলে রুম বুক করার কথা,রবির মা-বাবার বাড়িটা বিক্রি করে ধামুয়া চলে যাওয়ার কথা,সবটাই রুমিতাই আমায় জানিয়েছে।বিশ্বাসী লোক ভেবে তোমরা ওর উপস্থিতিতেই সব আলোচনা করেছ,আর তাতেই কেল্লাফতে হয়ে গেছে।রিকা যে বিয়ের সন্ধ্যেতেই পালিয়ে যাবে বিয়েবাড়ি থেকে,আর এসে উঠবে এই হোটেলে,আর রবিও আসবে,সবটাই আমি রুমিতার কাছেই জানতে পারি।আমার লোক রিকাদের বাড়িটা সারাদিন ধরে নজরে রাখছিল আজ,রিকা বাড়ি থেকে বেরোতেই ওরা জানাল আমায়,আর আমি?আমি তো বিকেল থেকেই হোটেলের রুমে বসে আছি কপোত-কপোতীর অপেক্ষায়।যে উকিলবাবুর আজ আসার কথা ছিল তোদের রেজিস্ট্রি করানোর জন্য,তিনিও আজ আসবেন না।'
— 'কেন?নিশ্চয়ই তাকেও হুমকি দিয়েছ তুমি!' ঘৃণার সুরে বলে ওঠে সাগরিকা।
— 'ডার্লিং,সবসময় আমায় এত খারাপ কেন ভাবো বলো তো তুমি?আমার কষ্ট হয় না বলো তো?শোনো তাহলে উকিলবাবুর গল্পটা বলি।তোমরা জানো,উকিলবাবুর একটা মেয়ে আছে,সে উত্তরবঙ্গের একটা কলেজে পড়ে,ওখানেই হোস্টেলে থাকে,আর উকিলবাবু তো শহরেই থাকেন।অবাক হচ্ছিস তো রবি,ভাবছিস অভ্রটা কি চামার,সবার নাড়িনক্ষত্র খোঁজ নিয়ে নিয়েছে!কি আর করা যাবে বলো বন্ধু,ভালোবাসার জন্য মানুষ কত কি করতে পারে,আমি এইটুকু পারব না?উকিলবাবুর খোঁজটাও অবশ্য আমি রুমিতার কাছেই পেয়েছি,তিনি রবিদের মফস্বলের বাড়িতে আসতেন মাঝে মাঝেই আলোচনা করতে।রুমিতাকে একটা স্মার্টফোন দিয়েছিলাম আমি,ওই ফোনেই ও উকিলবাবুর ছবি তুলে আমায় সেন্ড করে,তারপর আর কি!আমার যা যোগাযোগ,তাতে ওনার নাড়িনক্ষত্র জানতে আর কতক্ষণ!খোঁজ নিয়ে জানলাম,স্ত্রীকে নিয়ে উনি শহরেই থাকেন,আর একমাত্র মেয়ে উত্তরবঙ্গে হোস্টেলে থাকে।আজ উনি যখন মনোরমাতে আসার জন্য রেডি হচ্ছিলেন, একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এল ওনার মোবাইলে।কলটা রিসিভ করার পরেই ওনাকে বলা হল,ওনার মেয়ের একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে,ও হাসপাতালে ভর্তি।এক্ষুণি যেন উনি চলে আসেন হোস্টেলে।উনি ভাবলেন,ফোনটা করেছেন হোস্টেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট,কিন্তু আসলে তো....'
— 'আসলে ফোনটা তুমি করিয়েছিলে তাই তো?'
— 'একদম সোনা!এইজন্যই তো তোমাকে এত ভালোবাসি আমি!এত্ত ইনটেলিজেন্ট তুমি!ফোনটা করেছিল আমারই লোক,আর খবরটা ফেক।খবরটা শুনেই উনি তড়িঘড়ি বেরিয়ে গেছেন উত্তরবঙ্গের পথে,একমাত্র মেয়ের দুশ্চিন্তায় উনি তোমাদের ফোনে জানাতেও ভুলে গেছেন যে উনি আসতে পারবেন না!ওনার এখন মনে শুধু মেয়ের মুখটা ভাসছে,তোদের কথা উনি ভুলেই গেছেন!এখন উনি রেলগাড়িতে উত্তরবঙ্গ ছুটছেন,আর ঘন ঘন ফোন করছেন হোস্টেল কর্তৃপক্ষকে।কিন্তু আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি,ওই হোস্টেলে একটা নিয়ম আছে,তা হল রাত আটটার পর ওই হোস্টেলে ফোন করলেও তা রিসিভ করা হয় না যদি না ইমার্জেন্সি হয়।আর এখন ঘড়িতে দেখো,রাত আটটা কখন বেজে গেছে,তাই ফোনেও কাউকে পাবেন না উনি,তাই ওখানে না পৌঁছানোর আগে জানতেও পারবেন না খরবটা ফেক।'
— 'অভ্র,তুই আর কত নিচে নামবি আমায় বল তো?শুধু মাত্র আমাদের বিয়েটা আটকানোর জন্য একজন বাবাকে তার মেয়ের সম্পর্কে এতবড়ো মিথ্যে খবরটা দিতে পারলি?একবারও বুক কাঁপল না তোর?' রবি বলল।
— 'হা হা হা,' অট্টহেসে অভ্র বলল,'এতদিন পরেও তুই বুঝলিনা যে আমার কোনো কিছুতেই বুক কাঁপে না!আচ্ছা,এবার আয় গল্পের শেষটুকু বলি।মনোরমাতে তোরা রুম বুক করেছিলি তা তো জানতাম,কিন্তু কোন্ রুম বুক করেছিস সেটা জানতে পারিনি,তাই ম্যানেজারের কাছে এসেছিলাম জানতে।রুম বুক করতে আইডি প্রুফ লাগে,তাই এখানে তোরা নাম ভাঁড়িয়ে রুম বুক করতে পারবিনা,তা আমি জানতাম।কিন্তু ম্যানেজারটা বড্ড একগুঁয়ে,জিজ্ঞেস করতেই বলে,'সরি স্যার,এসব বলার নিয়ম নেই।' যতবার জিজ্ঞেস করি,ফাটা রেকর্ডের মতো একই কথা বারবার বলে যায়!শেষে হাতে মোটা টাকা ধরাতেই গড়গড়িয়ে সব বলে দিল।ব্যস,আর আমরা এখানে চলে এলাম!চিন্তা কোরোনা রিকা সোনা কেমন,আমার মা বাবা সবটাই জানেন,তোমার মামা মামীমাকে ওঁরা সবটাই বলবেন,যে তুমি রবির সাথে পালাতে চেয়েছিলে,কিন্তু রবি তো একটা খারাপ ছেলে,রেপিস্ট,মলেস্টার,আমি তেমনটাই বুঝিয়েছি ওঁদের।ওঁরা জানবেন,একটা চরিত্রহীন বাজে ছেলের হাত থেকে আমি বাঁচিয়ে আনতে গেছি তোমায়,শুনে ওঁরা আরও বেশি প্রসন্ন হবেন আমার ওপর,বুঝলে ডিয়ার?'
0 মন্তব্যসমূহ