দ্বিচত্বারিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ডাক্তারবাবু অভিজিৎবাবু আর তনিমাদেবীকে ডাকলেন ঘরের বাইরে,ডেকে বললেন,'অভ্রর খুব শিগগির মেন্টাল ট্রিটমেন্ট দরকার,মানসিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছে ওর,এই সমস্যা ঠিক না হলে আজকের মতো এরকম অ্যাক্সিডেন্ট আবার হতে পারে,এর চেয়েও বেশি ডেঞ্জারাস অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে ওর,তাই দেরি না করে সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন অভ্রকে।'
সবটা শুনে অভ্র কিছুতেই সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে যেতে রাজি হল না,এমনকি অভিজিৎবাবু আর তনিমাদেবী ভীষণ বকাবকি করার পরেও না।শেষ পর্যন্ত ঝুমকো বলল,অভ্র সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে না গেলে আর অভ্রর সাথে সংসার করবে না ও,এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।ঝুমকোর কান্নাকাটিতেই শেষ পর্যন্ত সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে যেতে রাজি হয় অভ্র।ঝুমকো বলল,'আমার একজন চেনা খুব নামকরা সাইক্রিয়াটিস্ট আছেন,নাম অলোক নস্কর।ওনার কাছেই আমি নিয়ে যাব অভ্রকে,দেখবেন এসব ভুলভাল বকা বন্ধ হয়ে যাবে ওর,একদম সুস্থ হয়ে যাবে!'
— 'তুমি আমাদের নিশ্চিন্ত করলে ঝুমকো মা',অভিজিৎবাবু বললেন,'কালই অভ্রকে ডাক্তারবাবুর চেম্বারে নিয়ে যেও।'
— 'সিওর আঙ্কেল!'
পরেরদিনই অভ্রকে নিয়ে ঝুমকো গেল সাইক্রিয়াটিস্ট অলোক নস্করের কাছে।অলোকবাবু অভ্রকে জিজ্ঞেস করলেন সমস্যার কথা।অভ্র সমস্যার কথা বলতে যাবে হঠাৎ মৃদু পুরুষকন্ঠে কে যেন ডাকল,'অভ্র!'
অভ্র যে চেয়ারটায় বসেছিল সেই চেয়ারের পেছন থেকেই ডাকটা শুনল অভ্র,আর শুনেই পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে রবি দাঁড়িয়ে আছে,তার বুকটা রক্তাক্ত,আর ওর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সাগরিকা,ওর চুল উস্কোখুস্কো,পরনের শাড়িটা ছেঁড়া,আর কপাল-মুখ-গলায় লেগে আছে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত,দুজনে একে অপরের হাত ধরে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অভ্রর দিকে।ওই দৃষ্টি দেখে অভ্রর বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল,ও চেঁচিয়ে উঠল,'ঝুম!'
অভ্রর চিৎকারে ঝুমকো আর অলোকবাবু দুজনেই চমকে উঠলেন,অলোকবাবু জিজ্ঞেস করলেন,'এনি প্রবলেম অভ্র?'
রবি-সাগরিকা তখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়েছিল একে অপরের হাত ধরে,অভ্র ওদের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,'দেখুন,দেখুন আপনারা ওইদিকে দেখুন!এখনো বলবেন হ্যালুসিনেশন?'
— 'কি আছে ওদিকে অভ্র?আমি তো কিছু দেখতে পাচ্ছিনা!' ঝুমকো অবাক হয়ে বলল।
— 'আমিও পাচ্ছিনা,ওদিকে শুধুই দেওয়াল দেখতে পাচ্ছি আমি।' অলোকবাবু বললেন।
— 'আরে কি বলছেনটা কি আপনারা?ওই তো রবি আর সাগরিকা দাঁড়িয়ে আছে,আর কি বীভৎস দৃষ্টিতে দেখছে আমায় দেখতে পাচ্ছেন না?ওরা আমায় বাঁচতে দেবে না আর,আমি বুঝতে পেরেছি!'
_________________________
Subscribe my YouTube channel : Suchandra Chakrabarti
_________________________
— 'দেখেছেন ডাক্তারবাবু দেখেছেন তো,কিরকম দিনে দুপুরে যেখানে সেখানে ভূত দেখছে ও!এতদিন নিজের ঘরে পাগলামো করত,এখন আপনার চেম্বারে এসেও আগের বৌ আর তার প্রেমিককে দেখছে!ডিসগাস্টিং যাস্ট,মাঝে মাঝে মনে হয় তোমায় বিয়ে করাটাই ভুল হয়েছে আমার অভ্র!যে ছেলে পুরোনো মরা বৌকে ভুলতে পারেনি আজও,তাকে যে কি কুক্ষনে বিয়ে করেছিলাম আমি,ধ্যাৎ!' বলেই ঝুমকো বিরক্ত হয়ে চলে যাচ্ছিল,ডাক্তারবাবু বললেন,'রাগ কোরোনা মা,ও কি ইচ্ছে করে এসব করছে?ওর একটা অসুখ হয়েছে,এসময় তুমি ওর পাশে না থাকলে,ওকে না বুঝলে আর কে বুঝবে মা?'
— 'কিন্তু ডাক্তারবাবু আমিও তো মানুষ বলুন,সহ্যের সীমা তো আমারও আছে,সেই বিয়ের পর থেকে সুখী দাম্পত্যজীবনের পরিবর্তে আমি কি পেয়েছি?পেয়েছি শুধু ওর পাগলামি,চেঁচামেচি আর হ্যালুসিনেশন!এইজন্যই কি বাবা-মা এত আশা করে আমার বিয়ে দিয়েছিলেন অভ্রর সাথে?' ঝুমকো চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলল।
— 'ঝুম,ঝুম লিসন,আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি ঝুম!' অভ্র ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল চেয়ার ছেড়ে।হঠাৎ অভ্র যেদিকের দেওয়ালে রবি-সাগরিকা দাঁড়িয়ে ছিল,সেদিকে তাকাল,আর তাকিয়েই ও অবাক হয়ে গেল,দেখল রবি-সাগরিকা কেউ নেই ওখানে,ওরা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।অভ্রর মনে রবিদের নিয়ে একটা ভয় কাজ করছিল ভীষণ,কিন্তু সেই ভয়টা যতটা সম্ভব লুকোনোর চেষ্টা করল ঝুমকোর সামনে,ওর হাতদুটো ধরে অভ্র বলল,'লক্ষ্মীটি,রাগ করেনা সোনা,আমি আর এরকমটা করব না কখনো,প্রমিস করলাম আজ।'
— 'বেশ,তাহলে ডাক্তারবাবু যা বলবেন,তুমি তাই করবে তো?'
— 'কথা দিলাম ঝুম!'
— 'এই তো গুড বয়ের মতো কথা,চলো', বলে ঝুমকো আর অভ্র আবার চেয়ারে গিয়ে বসল,তারপর এতদিন যা যা হয়েছে অভ্রর সাথে,সবটা খুলে বলল অভ্র অলোকবাবুকে।
সবটা শুনে ডাক্তারবাবু অভ্রর বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে চাইলেন।
পরেরদিনই ডাক্তারবাবুর চেম্বারে এলেন অভিজিৎবাবু আর তনিমাদেবী।ডাক্তারবাবু বললেন, 'অভ্রকে বাড়ি থেকে দূরে কোথাও পাঠানোর ব্যবস্থা করুন বেশ কিছুদিনের জন্য,আর খেয়াল রাখবেন যেখানে ওকে পাঠাবেন জায়গাটা যেন শহরের মতো এত ঘিঞ্জি না হয়।শান্ত আর ঘনবসতি কম সেরকম জায়গায় ওর বেশ কিছুদিন থাকা জরুরি,তাহলেই ও অনেকটা ইম্প্রুভ করবে,আর ওকে যেখানে পাঠাবেন সেখানে শুধু ঝুমকো যাবে ওর সাথে,আপনারা যাবেন না।'
— 'সে কি ডাক্তারবাবু?অসুস্থ ছেলেটা বাড়ি থেকে দূরে থাকবে,আর আমরা....'
— 'আপনারা কেন বুঝছেন না ম্যাডাম,অভ্রর এখন বেশি লোকজন,বেশি হইচই,বেশি শব্দ-ভিড় একদম ভালো নয়,ওর এসব থেকে দূরে থাকা উচিত।'
0 মন্তব্যসমূহ