Advertisement

এনকাউন্টার (সপ্তত্রিংশ পর্ব)

এনকাউন্টার 
সপ্তত্রিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


কেটে গেছে দু'বছর।আজ ঝুমকো অভ্রর স্ত্রী।
সাগরিকাকে মাঠে ছেড়ে দিয়ে আসার পর অভ্র মিডিয়া থেকে শুরু করে সাগরিকার মামা-মামীমা সকলের কাছে রটিয়ে দিয়েছে,যে সাগরিকা সুস্থ হওয়ার পরেই রবির তাকে ধর্ষণ করার ঘটনাটা মনে পড়ে যায়,আর লজ্জায়-অপমানে সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।অভ্ররা সকলে মিলে অনেক চেষ্টা করেছে ওকে সুস্থ করে তোলার,কিন্তু দিন দিন ওর পাগলামি এতটাই বেড়েছে যে মেন্টাল অ্যাসাইলামে ভর্তি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।ওকে অ্যাসাইলামে নিয়ে যাওয়ার সময়েই হঠাৎ কিভাবে যেন ও অভ্রর হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে যায়,সেই থেকে সাগরিকাকে খুঁজছে পুলিশ তন্নতন্ন করে,কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে।সাগরিকার মামা-মামীমাকে অবশ্য সাগরিকার হারিয়ে যাওয়ায় ঘটনায় বিশেষ দুঃখিত হতে দেখা যায়নি,বরং ওঁরা ভেবেছেন,এই তো সুবর্ণ সুযোগ!এমনিতেই সাগরিকার ধর্ষণের পর ওঁরা ভয়ে ছিলেন যে ঝুমকোর জন্য ভালো পাত্র পাবেন কিনা,কিন্তু সাগরিকা রাস্তা থেকে সরে যাওয়ায় আর কোনো সমস্যাই রইল না,ওঁরা অভ্রকেই বাছলেন একমাত্র মেয়ের হবু বর হিসেবে,কারণ জামাই হিসেবে অভ্রর চেয়ে যোগ্য পাত্র আর কেই বা আছে ওঁদের চোখে?

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________

অন্যদিকে কলেজপড়ুয়া ঝুমকোকে বিয়ের কথা বলতেই সে এক কথায় রাজি হয়ে গেল অভ্রকে বিয়ে করতে।অভ্র আর ওর মা-বাবা যদিও অবাক হলেন ঝুমকো এত সহজে রাজি হল শুনে,কারণ ঝুমকো আর সাগরিকার মিষ্টি সম্পর্ক সম্বন্ধে অবগত ছিলেন সকলেই।

অভ্র সেজন্য ঝুমকোর সাথে কথাও বলেছিল,কিন্তু ঝুমকো যা বলল তাতে অভ্র হকচকিয়ে গেল।ঝুমকো বলল,এতকাল সাগরিকার সাথে সে মিষ্টি ব্যবহারের অভিনয় করত মাত্র,আসলে সাগরিকাকে সে বাড়ির একটা বার্ডেন ছাড়া কিছুই ভাবত না।আর রবির সাথে সাগরিকার প্রেমের ক্ষেত্রে সে এত সাহায্য করেছে শুধুমাত্র এই কারণে যে অভ্রর মতো একজন বড়ো ঘরের রাজপুত্র সাগরিকার মতো বাপ-মা মরা এক ভিখারিকে ডিসার্ভ করে না,সাগরিকা রবির মতো একটা রাস্তার ছেলেকেই ডিসার্ভ করে,আর অভ্রকে ডিসার্ভ করে একমাত্র ঝুমকো,সাগরিকা নয়,তাই সে বিয়ের দিন সাগরিকাকে রবির সঙ্গে পালাতে সহায়তা করেছিল।
সবটা শুনে অভ্র অবাক,ওর মুখে কথাই সরছিল এরকম অপ্রত্যাশিত কথা শুনে।অভ্র বলেছিল,'কিন্তু লাবণ্য,টিয়া,মুস্কান এদের কথা......'

— 'উফ অভ্র,যাস্ট চিল!' ঝুমকো হেসে বলল,'রিচ ছেলেমেয়েদের ওরকম ছোটখাটো ব্যাপার তো একটু থাকেই,আমারও তিন চারটে ছেলেবন্ধু ছিল ওরকম,ওতে কি যায় আসে?এসব ম্যাটারই করেনা আমার কাছে,আমার কাছে অনলি ম্যাটার করে তুমি প্রত্যেক মাসে আমায় হাতখরচ কত টাকা দিচ্ছ,বা সপ্তাহে ক'দিন শপিংয়ে নিয়ে যাবে,বা অকেশনে কত এক্সপেন্সিভ গিফট দেবে,দ্যাটস ইট!'

— 'ওয়ান্ডারফুল!' অভিজিৎবাবু সবটা শুনে হেসে বলেছিলেন,'হীরে ছেড়ে কেন যে কাচের পেছনে ছুটেছিলি তাই ভাবি!'

— 'তাই না তাই!' তনিমাদেবী বললেন,'তাছাড়া ঝুমকো দেখতেও সাগরিকার চেয়ে সুন্দর ঢের,ওর বাবা বড়োলোক ব্যবসায়ী,ওকে বিয়ে করা মানে তো অতুল সম্পত্তির মালিক হওয়া!'

— 'যাক গে,যা হয়ে গেছে সেটা ভেবে আর কি হবে!শোন অভ্র,জীবন সবাইকে সেকেন্ড চান্স দেয়না,তুই পেয়েছিস যখন,সদ্ব্যবহার কর,বুঝলি!' অভিজিৎবাবু বললেন।


_________________________

Subscribe my YouTube channel : Suchandra Chakrabarti

_________________________



এরপর ধুমধাম করে বিয়ে হল অভ্র-ঝুমকোর।সাগরিকার মিথ্যে ডেথ সার্টিফিকেট তৈরি করেছে অভ্র আর ঝুমকো।পৃথিবীর সকলে জানে,অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে সাগরিকা,আর অভ্রও মনে মনে বিশ্বাস করে যে,সাগরিকা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।

সাগরিকা হারিয়ে যাওয়ার দু'বছর পর ঝুমকো সাবালিকা হল,আর তারপরেই বিয়েটা হল দুজনের।কিন্তু বিয়েটা হওয়ার পর থেকেই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে লাগল।বিয়ের পরের দিন কালরাত্রি,তাই ঝুমকো আর অভ্রর আলাদা ঘরে শোয়ার ব্যবস্থা করা হল।অভ্রর ঘরের জানালাটা দিয়ে বাড়ির বাগানটা সম্পূর্ণ দেখা যায়,মাঝে মাঝেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে অভ্র।বিয়ের পরের রাতেও একটু ড্রিংক করে অভ্র জানালার দিকে গিয়েছিল একটু বাইরেটা দেখবে বলে,কিন্তু বাইরে তাকিয়েই ও চমকে গেল,দেখল বাগানে দাঁড়িয়ে আছে নীল শাড়ি পরা একটা মেয়ে,তার লালচে কালো কোঁকড়ানো চুল।কিন্তু মেয়েটা জানালার উল্টোদিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিল,তাই অভ্র মেয়েটার মুখ দেখতে পেল না,ভাবল আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেই কেউ হবে,ভেবে জানালা থেকে সরে এসে আবার টেবিলে এসে বসে গ্লাসে মাদক ঢালল।হঠাৎই বিদ্যুৎচমকের মতো অভ্রর মাথায় খেলে গেল,এরকম চুল সাগরিকার ছিল,আর নীল শাড়ি খুব প্রিয় ছিল ওর।ভেবেই একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল অভ্রর শিরদাঁড়া বেয়ে।তাড়াতাড়ি ও আবার ছুটে গেল জানালার দিকে,মুখ বাড়াল জানালা দিয়ে,কিন্তু ও দেখল বাগানে কেউ নেই।অভ্র ভীষণ অবাক হয়ে তাড়াতাড়ি বাগানের দিকে ছুটল।বাগানে গিয়ে ও কাউকে দেখতে পেল না,চারিদিক তন্নতন্ন করে খুঁজেও।হঠাৎই একটা কানের দুল দেখতে পেল ও,যেখানে মেয়েটা দাঁড়িয়ে ছিল।তাড়াতাড়ি দুলটা কুড়িয়ে নিল অভ্র,আর দুলটা দেখেই অভ্রর যেটুকু শক্তি ছিল শরীরে,সেটুকুও চলে গেল।
হীরের দুলটা অভ্র সাগরিকাকে গিফট করেছিল বিয়ের আগে।দুলটায় রক্ত লেগে আছে,তাজা রক্ত নয়,বহুদিনের শুকনো রক্ত লেগে আছে ওটায়।অভ্র ভীষণ ভয় পেয়ে গেল,দুলটা ছুড়ে ফেলেই তাড়াতাড়ি ও বাগান থেকে বাড়িতে চলে এল,তারপর বাড়িতে এসেই ও হাঁকডাক করে গোটা বাড়ি মাথায় তুলল।

— 'কি হয়েছেটা কি অভ্র?এত চেঁচামেচি করছিস কেন?'

— 'মা আমি শুধু জানতে চাই যে একটু আগে কি কেউ বাগানে গিয়েছিল নীল শাড়ি পড়ে?'

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ