চতুর্বিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
বাথরুম থেকে যারা বেরিয়ে এল,তাদের মধ্যে ছিল লাবণ্য,টিয়া,কলেজের বেশ কিছু ক্লাসমেট যারা রবিকে নানা অছিলায় অপমান করত,সেই সাথে বরের সাজে অভ্র।লাবণ্য-টিয়াদের দেখে রবি-সাগরিকা আগেই অবাক হয়েছিল,তবে অভ্রকে দেখে ওদের যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল।কোনোরকমে সামলে নিয়ে সাগরিকা বলল,'অভ্র তুমি?'
— 'কি যে বোকার মতো প্রশ্ন করো তুমি রিকা ডার্লিং,' ক্রূর হেসে অভ্র বলল,'তোমাকে কত্তটা ভালোবাসি আমি তুমি তো জানো সোনা,তুমি যেখানে যাবে আমিও তো সেখানেই যাব তাই না বলো ডিয়ার?'
রবি আর সাগরিকা তাড়াতাড়ি দরজা খুলে পালাতে গেল,কিন্তু অভ্রর গ্যাংটা ওদের ধরে ফেলল।অভ্র দরজার ছিটকিনি তুলে দিয়ে বলল,'সে কি ডার্লিং?আমি তোমার ভালোবাসার জন্য তোমার এত কাছে চলে এলাম,তা কিভাবে এলাম সেই গল্প না শুনেই চলে যাচ্ছ?'
রবিকে এরপর ওরা যে চেয়ারে প্রীতম বসেছিল সেই চেয়ারে বসিয়ে ওর হাত পা শক্ত করে বাঁধল,তারপর সাগরিকাকে ঠেলে ফেলে দিল বিছানায়।অভ্র সাগরিকার দিকে এগোতে লাগল,বলল,'এসো সোনা,তোমায় বলি,আর তোমার পেয়ারের রবিকেও বলি,কিভাবে আমি তুমি পর্যন্ত পৌঁছলাম।'
— 'সেই সাথে আমাদের কেসটাও বলো অভ্র!' টিয়া ব্যঙ্গ করে বলল।
— 'আহা সব বলব,অত ব্যস্ত হতে হয় না টিয়াপাখি!রিকা,রবি তোমরা দুজনেই নিজেদের বড্ড চালাক ভাবো তাই না!কিন্তু প্রবাদটা জানো তো,যে অতি চালাকের গলায় দড়ি!তোমাদের ক্ষেত্রেও তাই হল।তোমরা যদি চলো ডালে ডালে,আমি চলি পাতায় পাতায়।রিকা,তুই যে আমায় বিয়ে করতে চাসনা সেটা আমি প্রথম জানতে পারি আন্টির কাছে,অর্থাৎ তোর মামীমার কাছে।তুই আমার সামনে এমন অভিনয় করতিস যে আমিও ধরতে পারিনি তোর চালাকি,ভেবেছিলাম সত্যিই তুই আমায় অন্ধের মতো বিশ্বাস করিস,ভালোবাসিস,আর রবিকে চরম ঘৃণা করিস!অভ্রদীপ শিকদারকেও তুই ঘোল খাইয়েছিস রিকা,ভাবা যায়!তোর অভিনয়ের প্রশংসা না করে সত্যিই পারা যায় না!আমি যখনই তোদের বাড়ি যেতাম রিকা,আগে থেকে তোকে জানিয়ে যেতাম,তাই তুই সাবধান হয়ে যেতিস,বাড়িতেই থাকতিস লক্ষ্মী মেয়েটি সেজে,আমি ধরতেই পারতাম না।একদিন হঠাৎ আমার ইচ্ছা হল,তোকে সারপ্রাইজ গিফট দেব।তোর জন্য একটা ডায়মন্ড রিং কিনেছিলাম আমি,ভেবেছিলাম তোকে আগে থেকে না জানিয়েই চলে যাব এক সন্ধ্যেবেলা তোর বাড়ি,তারপর তোর আঙুলে রিংটা পরিয়ে দেব আঙ্কেল-আন্টির সামনে।সেদিন ছিল বুধবার,যথারীতি প্ল্যান মতো গেলাম তোদের বাড়ি,আঙ্কেল আন্টি আমায় বসতে বলেই মুখ ভার করে বললেন,'সাগরিকার আক্কেল দেখো তো বাবা!তুমি আসবে,এদিকে কোথায় যেন বেরিয়েছে,বাড়ি নেই সে!' আমি তখনও ব্যাপারটা ধরতে পারিনি,জিজ্ঞেস করলাম,'কোথায় গেছে?শপিং করতে?' তখন তোর মামীমা বললেন,'হ্যাঁ বাবা আর বোলোনা,প্রত্যেক বুধবার আর শুক্রবার সন্ধ্যে হলেই ও বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে,বলে কোন্ এক বান্ধবী তিয়াশার সাথে শপিংয়ে যাবে,আমি আর ওর মামা চাইনা,কিন্তু ঝুমকোটাও দিদিভাই বলতে এমন অজ্ঞান যে ওর সামনে বেশি বকাঝকা করাও যায় না সাগরিকাকে,আর সামনেই তো বিয়ে,এবাড়িতে আর ক'টা দিনই বা আছে,তাই আর বেশি বকাঝকা করিনা!' আমি তখন ভাবছি তোর সব বন্ধুবান্ধবীকেই তো আমি চিনি,সবার কথাই তুই বলেছিস আমায়,কিন্তু তিয়াশা?উঁহু,এই নামে তোর কোনো বান্ধবী আছে বলে তো শুনিনি!জানিস রিকা,হঠাৎ করেই আমার মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল,মনে পড়ে গেল এই দুটো দিনেই তো সন্ধ্যেবেলা রবির টিউশন থাকে,সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর এই দুটো টিউশন নিয়েছে ও বুধ আর শুক্রবার,বিকেল পাঁচটায় যায় পড়াতে,তারপর শেষ হয় সাতটা সাড়ে সাতটার দিকে।তখন ঘড়িতে দেখলাম আটটা বাজে।জিজ্ঞেস করলাম,'আন্টি,এই দুদিন সন্ধ্যেবেলায় কখন বেরোয় বলতে পারবেন?আসলে জানতে চাইছি কারণ আমি সেই সময়টায় ওকে মেসেজ বা ফোন করে ডিস্টার্ব করব না।' আন্টি গদগদ হয়ে বললেন,'দেখছ কি ভদ্র ভালোমানুষ ছেলে,আর আমাদের মেয়েটাকে দেখো!ওকে কেয়ারই করেনা,এখনও বিয়েতে পুরোপুরি মত নেই ওর...' আঙ্কেল আন্টিকে তাড়াতাড়ি থামালেন ব্যস্ত হয়ে,কিন্তু আমি বুঝে নিয়েছি যে আমার আন্দাজই সত্যি।আন্টি বললেন,'ওই ধরো সাতটার দিকে বেরোয় বাবা।' আমি তখন একদম সিওর হয়ে গেলাম,যে তুই রবির সাথেই দেখা করিস এই দুদিন,আমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করছিস মাত্র!' সিওর হওয়ার জন্য আমার এক চ্যালাকে পাঠালাম তোদের বাড়িতে নজর রাখার জন্য,কি বলব সাগর সেও বুঝতে পারেনি তোর কেরামতি!সে এসে আমায় বলল,' না তো বস,তোমার হবু বৌকে তো বুধবার বা শুক্রবার সন্ধ্যেতে বেরোতে দেখলাম না বাড়ি থেকে!' আমি তো পুরো অবাক!তারপর ভাবলাম,নাহ এসব অকর্মাকে দিয়ে কোনো কাজ হবার নয়,তাই নিজেই এবার তোর বাড়ির ওপর নজরদারি শুরু করলাম।কিন্তু অভ্রদীপ শিকদারের চোখে আর ধুলো দিতে পারলে না তুমি ডার্লিং,তোমার সুন্দর চোখদুটো বেইমানি করল তোমার সাথে!'
— 'ম মানে!' ভীত সাগরিকা পিছোতে লাগল।
— 'সব বলব ডার্লিং,বলার জন্যই তো এসেছি আজ!কিন্তু তুমি এত দূরে দূরে সরে থাকলে আমার ভালো লাগে বলো?তুমি তো জানো আমি কতটা মুডি,আর একবার মুড অফ হয়ে গেলে আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারি,তোমার পেয়ারের রবিকে খুনও করতে পারি!জানোই তো আমি কতটা ভয়ানক!'
— 'না তুমি ওর কোনো ক্ষতি করবে না অভ্র!' শঙ্কিত হতে পড়ে সাগরিকা।
— 'তুমি দূরে সরে না গেলে নিশ্চয়ই করব না ডার্লিং!এসো আরেকটু কাছে এসো!'
সাগরিকার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলে অভ্র।সাগরিকাও রবির প্রাণনাশের ভয়ে বাধা দেয় না।
0 মন্তব্যসমূহ