এনকাউন্টার
একত্রিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সূর্যদেববাবু আর চিন্ময়ী দেবী থানার বাইরে এসে দেখেন অভিজিৎবাবু দাঁড়িয়ে আছেন।সূর্যদেববাবুরা ভীষণ বিরক্ত হয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলেন,অভিজিৎবাবুই ডাকলেন তাঁদের,'কিসের এত তাড়া সূর্যদেববাবু,একটু দাঁড়ান না!'
— 'আপনার সাথে কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও আমার নেই।' সূর্যদেববাবু বললেন।
— 'সে আমি জানি,কিন্তু আজ আমি এখানে এসেছি রবির শুভাকাঙ্ক্ষী হয়েই,আর শুভাকাঙ্ক্ষীকে কি ফিরিয়ে দেওয়া উচিত বলুন?'
— ' শুভাকাঙ্ক্ষী?আপনি?' চিন্ময়ী দেবী বললেন,'অনেক নাটক করেছেন এতদিন আপনি আর আপনার ছেলে,আমরাও কিচ্ছুটি টের পাইনি এমন সুন্দর অভিনয় করেছেন আপনারা!কিন্তু আর নয়,আর আপনার অভিনয় দিয়ে আমাদের ভোলাতে আসবেন না!রবিকে একবার নয়,দু' দুবার লকাপে ঢুকিয়েছেন বিনা দোষে!'
— 'তাতে কি হয়েছে বৌদি?রবিকে লকাপে ঢুকিয়েছি আমরা,বের করবও আমরাই!বৌদি একটা জিনিস খেয়াল করে দেখবেন রবিকে কিন্তু এমনি এমনি ফাঁসায়নি অভ্র।আগেরবার রবি শুধু শুধু অভ্রর পেছনে পড়েছিল,সাগরিকা মার সামনে ওকে খারাপ প্রমাণ করতে চেয়েছিল,তাই তো ও রেগে গিয়ে ওরকম করল!একটু মাথা গরম আমার ছেলেটার,কি আর করা যাবে বলুন!' বাঁকা হাসলেন অভিজিৎ বাবু, 'আর এইবার রবি যেটা করল তাতে আরও বেশি রেগে গেল আমার ছেলেটা।কি দরকার ছিল রবির বিয়ের কনেকে নিয়ে পালানোর?মুখের গ্রাস কেড়ে নিলে কার ভালো লাগে বলুন তো?তাই অভ্র রেগে গেল,ব্যস!এতো সহজ হিসেব!'
— 'ভালো বললেন আপনি অভিজিৎ বাবু! সাগরিকা মাকে মা বলে ডাকছেন,এদিকে তাকে মুখের গ্রাসও বলছেন! তাই তো ভাবি,এরকম যার বাবা,তার ছেলে আর...'
— 'শুনুন না সূর্যদেববাবু,নিজের ছেলেটা জেলে পচছে,এই সময় অন্যদের দিকে আঙুল তোলাটা কি বুদ্ধিমানের কাজ বলুন তো?আগে তো ছেলেটাকে বের করুন লকাপ থেকে!'
— 'সেটা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।'
— 'ওমা,আমি ভাবব না তো আর কে ভাববে?আপনাদের ফিনানশিয়াল কন্ডিশন কি আমি জানিনা বলুন?শুনুন,আমিই রবিকে আগেরবারের মতো লকাপ থেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করব,আর ভবিষ্যতে অভ্র বা ওর বন্ধুবান্ধবরা আর ঘুরেও তাকাবে না ওর দিকে,আবার রবি আগের মতো পড়াশোনা করবে,কলেজ যাবে,শুধু রবিকে একটা কথা দিতে হবে আমাকে,যে ও সাগরিকাকে ভুলে যাবে,সাগরিকার জীবন থেকে সরে যাবে।দেখুন সাগরিকা মজুমদার আমার ছেলের হবু বৌ,অভ্র ওকে ভালোবাসে,রবি ওদের দুজনের মাঝখানে কেন আসবে বলুন?আর এলে আমরাই বা কেন মেনে নেব?সাগরিকা শুধু অভ্রর,আর কারোর না!'
— 'হাসালেন অভিজিৎ বাবু',সূর্যদেববাবু বললেন,'অভ্র সাগরিকা মাকে ভালোবাসে?অভ্রর মতো মানুষরা কোনোদিন কাউকে ভালোবাসতে পারে?আর সাগরিকা অভ্রর মানে?ও কি খেলার পুতুল নাকি যে টাকা দিয়ে কিনে নিলেই ও কারোর ব্যক্তিগত প্রপার্টি হয়ে যাবে?'
— 'তাই না তাই!' চিন্ময়ী দেবী বললেন,'আর সাগর মাকে আপনারা কত সম্মানে-আদরে আপনাদের বাড়িতে রাখবেন তার আর আমাদের বুঝতে বাকি নেই বুঝলেন!বৌ নয়,বলুন ছেলের জন্য খেলার পুতুল নিয়ে যাচ্ছেন,যার সাথে যখন যা ইচ্ছে তাই করবেন তারপর ছুড়ে ফেলে দেবেন!'
— 'তাছাড়া ভুলে যাবেন না অভিজিৎ বাবু,আমার ছেলে সাগরিকা মায়ের জীবন থেকে সরেই এসেছিল প্রথমে,যখন ও জেনেছিল অভ্র ওকে ভালোবাসে।কিন্তু আপনার ছেলের আসল মুখোশটা খসে গেল বলেই তো...'
সূর্যদেববাবুর কথা শেষ করতে না দিয়েই রাগীস্বরে অভিজিৎ বাবু বলে উঠলেন,'তাহলে রবি সাগরিকার জীবন থেকে যাবে না তাই তো?'
— 'না যাবে না!' চিন্ময়ী দেবী বলে উঠলেন,'ভুলে যাবেন না সাগর মা আমায় মা বলে ডাকে।অনাথ মেয়েটা আমাদের বিশ্বাস করে ভরসা করে কাছে টেনে নিয়েছে,বাবা মায়ের আসনে বসিয়েছে আমাদের,তাই প্রাণ থাকতে আমাদের মেয়েটাকে আপনাদের মতো পাষণ্ডদের হাতে কিছুতেই তুলে দেব না!'
— 'বেশ,তাহলে রবিরও আর লকাপ থেকে বেরোনো হল না!' বাঁকা হেসে অভিজিৎ বাবু বললেন।
— 'সেটা নিয়ে আপনাকে না ভাবলেও হবে অভিজিৎ বাবু,ছেলেকে শহরে পড়তে পাঠাতে পেরেছি যখন,লকাপ থেকে বেরও নিশ্চয়ই করতে পারব।আপনি বরং আমাদের নিয়ে এত মাথা না ঘামিয়ে নিজের ছেলেকে একটু সুশিক্ষা দিন,কাজে দেবে।চলি।' সূর্যদেববাবুরা চলে এলেন।
সূর্যদেববাবু আর চিন্ময়ী দেবী রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগলেন।সূর্যদেববাবু বললেন,'বাড়ি বিক্রির টাকায় হাত দেব না ভেবেছিলাম,কিন্তু আর উপায় নেই।ছেলেটাকে আগে ছাড়াতে হবে,তারপর অন্য কথা।'
— 'সত্যিই তাই গো।'
টাকা তুলতে সূর্যদেববাবু ব্যাঙ্কে গেলেন।কিন্তু ব্যাঙ্কে ঢোকার মুখেই বিপদে পড়লেন।হঠাৎ কিছু ছেলে এসে সূর্যদেববাবুর মাথায় বন্দুক ধরল,বলল,'আপনি বয়স্ক মানুষ স্যার,আপনার গায়ে হাত দিতে চাইনা আমরা,চলে যান!'
সেই মুহূর্তেই সূর্যদেববাবুর মোবাইলে কল এল।তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরতেই ওপার থেকে অভ্রর গলা ভেসে এল,'কি কাকু,টাকা তুলতে পারলেন না তো?'
— 'মানে?এসব তুমি করাচ্ছ?'
— 'হ্যাঁ কাকু,নয়ত আর কে করবে বলুন?শুনুন কাকু,আপনি যে ব্যাঙ্কে যান,যে ব্রাঞ্চে যান,আর যে এটিএমেই যান,আমার লোক সব জায়গায় ফিট করা আছে।তাই আপনি টাকাটা তুলতে পারবেন না কোনো মতেই,আর রবিকে ছাড়াতেও পারবেন না।আপনার সামনে এখন দুটো রাস্তা,এক,বাবার শর্তে রাজি হওয়া,দুই,রবিকে জেলে পচতে দেখা।এবার আপনিই ঠিক করুন কি করবেন!'
0 মন্তব্যসমূহ