এনকাউন্টার
একচত্বারিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
তখন সকাল দশটা।নীচে সকলে ডাইনিংয়ে ব্রেকফাস্ট করতে বসেছেন,হঠাৎ অভ্র এসে বলল,'তোমাদের সবাইকে আমি একটা জিনিস দেখাতে চাই,যেটা দেখলে তোমরা আর আমায় অবিশ্বাস করবে না',বলেই অভ্র কাগজটা বের করে দেখাতে গেল সকলকে,কিন্তু বের করেই অভ্র হতবাক।ও দেখে,কাগজে আর একটা অক্ষরও লেখা নেই,একটা সাদা কাগজ ও হাতে ধরে রেখেছে।
— 'কি হল অভ্র?কি দেখাবে বলছিলে দেখাও!আর হাতে ওটা কি?'
— 'বাবা এই কাগজে...'
— 'হ্যাঁ কাগজে কি আছে আমাদের দেখা!'
— 'আন্টি দাঁড়াও,আমি দেখছি',বলেই ঝুমকো অভ্রর হাত থেকে কাগজটা নিয়ে বলল,'এটা তো একটা সাদা কাগজ,এতে কি দেখানোর আছে?'
— 'না কিছু না,বাদ দাও!'
অভ্র বুঝতে পারল,ও একটা ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিতে তলিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ,যেখান থেকে ওর মুক্তি নেই।ও জানত এখানে ওর কথা কেউ বিশ্বাস করবে না,তাই চুপচাপ ফিরে গেল নিজের ঘরে।
দিন দিন অভ্র কেমন যেন একটা ডিপ্রেশনের ঘূর্ণিতেও তলিয়ে যাচ্ছিল,ওর দিনরাত শুধু একটাই কথা মাথায় ঘুরত,যে মৃত রবি-সাগরিকার হাত থেকে ও কিভাবে মুক্তি পাবে,কিন্তু অনেক ভেবেও কোনো কূলকিনারা পায় না ও।
হঠাৎই ঝুমকো এল অভ্রর ঘরে,বলল,'কি এত ভাবছ অভ্র?কিছু নিয়ে কি চিন্তায় আছো?শেয়ার করো প্লিজ!'
— 'কোনো লাভ নেই ঝুম',অভ্র হতাশ মুখে বলল,'তুমি বিশ্বাস করবে না আমার কথা!'
— 'এরকম কথা কেউ বলে অভ্র?আমি তোমার ওয়াইফ,আমি তোমার কথা বিশ্বাস করব না তো আর কে করবে?বলোই না কি বলবে তুমি!'
— 'তুমি বিশ্বাস করবে আমার কথা ঝুম?তাহলে আমি সব বলব তোমায়!' অভ্র মনে অনেকটা জোর পায়।
— 'নিশ্চয়ই করব,তুমি সবটা বলেই দেখো না!'ঝুমকো বলল,'তুমি তো ঘামছ অভ্র!একমিনিট দাঁড়াও কেমন,আমি ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল নিয়ে আসি।'
অভ্র মাথা নিচু করে চোখবন্ধ করে বসে ছিল,হঠাৎ কাঁধে হাতের স্পর্শে মুখ তুলল অভ্র।ঝুমকো কাচের গ্লাসটা ওর দিকে বাড়িয়ে বলল,'খেয়ে নাও।'
অভ্র ঝুমকোর দিকে মুখ না ঘুরিয়েই গ্লাসটা হাতে নিল,কিন্তু গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়েই ভীষণ চমকে উঠল অভ্র,'এটা কি এনেছ?'
— 'কেন অভ্র?জল খাওয়ার চেয়ে অসহায় মানুষের রক্ত চুষে খেলে তো বেশি তৃপ্ত হও তুমি,তাই রক্ত নিয়ে এসেছি,খেয়ে নাও!'
ভয়ার্ত অভ্র ঘুরে তাকাল ঝুমকোর দিকে।ঝুমকোর চোখের মণি নীল দেখাচ্ছে,চুলটা লালচে কালো কোঁকড়ানো।অভ্রর মুখে কোনো কথা সরল না,ও পিছোতে লাগল।ঝুমকো রক্তে ভর্তি গ্লাসটা অভ্রর মুখের কাছে নিয়ে যেতে লাগল,বলল,'দেরি কোরো না অভ্র,খেয়ে নাও!' ঝুমকোর গলাটাও কেমন ভারী ভারী শোনাচ্ছিল একটু,স্বাভাবিক গলার চেয়ে একটু অন্যরকম।
অভ্র কোনোরকমে হাত দিয়ে গ্লাসটা সরিয়ে দিতে গেল,আর ওর হাতের ধাক্কায় গ্লাসটা মাটিতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল,গ্লাসের রক্তটা ছড়িয়ে পড়ল মেঝেয়।ঝুমকো রাগীচোখে অভ্রর দিকে তাকাল,আর অভ্র ঘর থেকে পালিয়ে গেল,সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল দ্রুতপায়ে,আর তখনই ঘটল দুর্ঘটনা।পা ফসকে অভ্র পড়ে গেল সিঁড়ি থেকে,কপাল ফেটে রক্ত পড়তে লাগল।
মাথায় ফেটি বেঁধে শুয়ে আছে অভ্র নিজের ঘরের বিছানায়,ডাক্তারবাবু দেখছেন ওকে।
— 'দেখুন না স্যার,ছেলেটার মনে হয় কোনো মেন্টাল প্রবলেম হয়েছে',অভিজিৎবাবু চিন্তিত গলায় বললেন,'ক'দিন হল দেখছি যখন তখন কিসব উল্টোপাল্টা বকছে,আর অকারণে ভয় পাচ্ছে,অস্বাভাবিক আচরণ করছে!'
— 'একদমই তাই!জানেন ডাক্তারবাবু',ঝুমকো বলল,'ওকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল বলে আমি জল এনে দিলাম গ্লাসে,ও জলটা দেখেই কিরকম যেন গোঙাতে লাগল,তারপরেই হাত দিয়ে এমন ধাক্কা মারল যে গ্লাসটা ভেঙে মেঝেতে পড়ে চারিদিকে জল ছড়িয়ে একাকার!ও যে কেন এরকম করে মাঝে মাঝে,কিচ্ছু বুঝতে পারিনা আমরা!'
— 'না ডাক্তারবাবু না,ঝুমকো আমায় জল দেয়নি বিশ্বাস করুন,জল দেয়নি,রক্ত দিয়েছিল!' ক্ষীণকন্ঠে অভ্র বলল।
— 'অভ্র চুপ করো!' তনিমাদেবী বলে উঠলেন,'আর কত আবোলতাবোল বকবে তুমি!তুমি সিঁড়িতে পড়ে যাওয়ার পর আমরা সবাই যখন তোমায় এই ঘরে নিয়ে এলাম,মেঝেতে একটা ভাঙা কাচের গ্লাস পড়েছিল,আর জল ছড়িয়েছিল মেঝেময়,কোথাও এতটুকুও রক্ত দেখিনি আমরা কেউ!'
— 'মা তোমরা কেন এরকম করছ আমার সাথে?তোমরা তো সবাই আমায় ভালোবাসো,তাহলে আমি বিপদের মধ্যে আছি জেনেও কেন আমার প্রতি রুড হচ্ছ?কেন আমার একটাও কথা বিশ্বাস করছ না?' কাতর কন্ঠে বলল অভ্র।
— 'তোমাকে বিপদ থেকে বের করে আনব বলেই বারবার আমরা তোমায় বোঝানোর চেষ্টা করছি যে তুমি যা বলছ সব ভুল বলছ,হ্যালুসিনেট করছ!অভ্র তুমি যা যা বলছ সব যদি সত্যিই হবে,তাহলে আমরা কেন দেখছিনা কিচ্ছু?সব ঘটনা বারবার তোমার সাথেই কেন ঘটছে?'
— 'আমি জানিনা মা,আমি শুধু এটুকু জানি যে আমি হ্যালুসিনেট করছি না,আজ যখন ঝুমকো আমায় জল দিতে এল,ওর চোখের মণি নীল হয়ে গিয়েছিল,চুলগুলো লালচে কোঁকড়ানো লাগছিল!'
— 'আর সেই সাথে নীল শাড়ি পরেছিলাম,আর মাথায় এঁটেছিলাম নীল গোলাপ,তাই তো অভ্র?' ঝুমকো বলল,'এগুলোই বা বলতে আর বাকি রাখো কেন?এটাও বলো যে জল দিতে আমি আসিইনি,সাগরিকা এসেছিল!' ঝুমকো বলে যেতে লাগল,'আমার ব্ল্যাক স্ট্রেট হেয়ার,চোখের মণিও ব্ল্যাক,কি পরিমাণ হ্যালুসিনেট করলে আমার চুল লালচে কোঁকড়ানো,চোখের মণি নীল দেখে মানুষ শুধু ভাবুন!'
0 মন্তব্যসমূহ