দ্বাবিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'এই নে সাগর,আইসক্রিম নে!আমার হয়েছে যত জ্বালা, সব জায়গায় যত খাবারদাবার আমায় কিনতে পাঠাচ্ছিস!'
— 'কেন?জ্বালা কিসের শুনি?'
— 'জ্বালা নয়?এই যে আমি মেয়ে সেজে ঘুরছি রাস্তাঘাটে,তো কারোর সাথে কথা বলতে হলে তো আর নর্ম্যালি বলতে পারছি না,সরু গলায় কথা বলতে হচ্ছে,যাতে শুনে নারীকন্ঠ বলে মনে হয়!'
— 'হাউ সুইট!এই শোনো না,একটু আমাকেও তোমায় নারীকন্ঠটা শোনাও না গো!'
— 'ধ্যাৎ দুষ্টু!এরকম কিন্তু কথা ছিল না আমাদের মধ্যে!আমি এখন গল্পের শেষটা শুনব ব্যস,এটাই ফাইনাল!'
— 'আচ্ছা বেশ বাপু,এসো বলি।আসলে মেনকা-লাবণ্যরা যখন দূরের কোনো শহরের হোটেলে বা মেসে বা ভাড়া বাড়িতে উঠে খাম খুলবে,দেখবে ওর ভেতরে কোনো টাকা নেই,শুধু অনেকগুলো কাগজ আছে,যাতে খাম খোলার আগে মনে হয় ওতে প্রচুর নোট আছে।'
— 'আচ্ছা,তারপর?'
— 'তারপর ওরা খামটা মহানন্দে খুলে দেখবে,ওতে দশটাকার নোটও নেই,শুধু সাদা কাগজ,আর প্রত্যেকটা কাগজে কালো কালিতে লেখা,'এইজন্যই কথায় বলে,সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস আর অসৎ সঙ্গে নরকবাস!খারাপ লোকের সাথে হাত যদি না মেলাতে,তাহলেই আর আজ এই দশা হত না!কেমন লাগছে পালিয়ে বেড়াতে?'
— 'আর এই লেখা দেখে ওরা কি করবে তাও আমি জানি,'রবি হেসে বলল,'ওরা সব কাগজগুলো ছড়িয়ে ফেলবে আর রাগে মাথার চুল ছিঁড়বে,কিন্তু সাগর,ওরা কোনোভাবে সন্দেহ করবে না তো যে এর পেছনে তুই আছিস?'
— 'আজ্ঞে না রবিবাবু,করবে না।'
— 'এতটা সিওর তুই সাগর?'
— 'নয়তো বলছি কি!আমি অভ্র,ওর বন্ধুবান্ধবদের সামনে এমন অভিনয় করেছি,এমন বাজে বাজে কথা বলেছি তোমার সম্পর্কে যে ওরা সিওর যে আমি অভ্রকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করি,আর তোমাকে ঘৃণা করি।তাই আমাকে ওরা সন্দেহ করবে না কোনোভাবেই।' একটু থেমে সাগরিকা বলল,'যেভাবে মেনকাদের সরিয়েছি আমাদের জীবন থেকে,ঠিক সেইভাবেই অভ্রদীপ শিকদারকেও সরাব দেখো রবি আর সাগরের জীবন থেকে,তোমায় প্রমিস করলাম আমি।'
অন্যদিকে সাগরিকার প্রথম বর্ষের আর রবি-অভ্রদের দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা এগিয়ে এল।আর একমাস বাকি পরীক্ষার।রবি আর সাগরিকা পড়াশুনা করার সাথে সাথে বিয়েটা কিভাবে আটকানো যায় সেই চেষ্টা করছে,ঝুমকোও আছে ওদের পাশে।মেনকা-লাবণ্যরা নেই বলে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছে ওরা।অন্যদিকে বারবার বোঝানোর পরেও সাগরিকার মামা-মামীমা কিছুতেই অভ্রর সাথে বিয়েটা ভেঙে দিতে চাইছেন না।
অন্যদিকে রবির মা-বাবা সূর্যদেববাবু আর চিন্ময়ী দেবীর কাছে সব সত্যিটা খুলে বলেছে রবি।এতদিন যা যা অন্যায় করেছে অভ্র,আর তাতে সায় দিয়েছেন ওর পরিবার,আর সেই সাথে সাগরিকার কথাও।সাগরিকা মাঝে মাঝেই আসে রবিদের মফস্বলের বাড়িতে,তবে ছদ্মবেশে।সূর্যদেববাবু আর চিন্ময়ী দেবী সাগরিকাকে সন্তানের মতোই স্নেহ করেন,তাঁরা চান সাগরিকাই পুত্রবধূ হোক তাঁদের।রবি-সাগর-ঝুমকো-সূর্যদেববাবু-চিন্ময়ীদেবী সকলে মিলে প্ল্যান করেছেন,অভ্রর সাথে বিয়ের রাতেই সকলের অলক্ষ্যে সাগরিকা কনের সাজ ছেড়ে সাধারণ একটা পোশাকে কালো চাদরে নিজেকে মুড়ে পালাবে বিয়েবাড়ি ছেড়ে,বিয়েবাড়ির একটু দূরেই রবি রেডি থাকবে একটা গাড়ি নিয়ে,পালিয়ে যাবে সে সাগরিকাকে নিয়ে।গিয়ে উঠবে শহর থেকে কিছুটা দূরের এক হোটেলে,হোটেলটার নাম 'মনোরমা'।হোটেলে বিয়ের রাতের জন্য একটা রুম বুক করা হয়েছে,সেখানেই রবি আর সাগরের রেজিস্ট্রি ম্যারেজটা হবে,তারপর পরিস্থিতি ঠান্ডা হলে খুব সাবধানে সূর্যদেববাবু আর চিন্ময়ী দেবীর সাথে দেখা করবে ওরা।রবি প্রায়শই হেসে বলে,'বাহ রে,যে হোটেলে আমার সুন্দরী সদ্যবিবাহিতা মনোরমাকে নিয়ে উঠব,সেই হোটেলের নাম মনোরমা হবে না তো আর কি হবে?'
— 'ধুস,তোমার সবসময় খালি ইয়ার্কি আর ফাজলামি!'সাগরিকা সলজ্জ হেসে বলে।
অভ্রর পরিবার যেহেতু রবির পরিবার যে মফস্বলে থাকে সেখানেই থাকে,তাই সূর্যদেববাবুরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই মফস্বলের বাড়িটা বিক্রি করে অনেক দূরের কোনো শহরে গিয়ে উঠবেন পুত্র আর পুত্রবধূকে নিয়ে,যেখানে অভ্রর কালো হাত আর পৌঁছবে না।তারপর সেখানে গিয়ে রবি আর সাগরিকা দুজনেই নতুন কোনো কলেজে ভর্তি হবে,শুরু হবে তাদের জীবনের এক স্বর্ণালী অধ্যায়।সাগরিকা প্রতিটা মুহূর্তে ভবিষ্যতের সেই সুন্দর মুহূর্তগুলোকে স্বপ্নের আলোয় সাজায়,মনের অন্দরে গাঁথে ভালোবাসায় ভরা আগামীদিনগুলোয় আসন্ন ঘটনার মালা।রবিকে বিয়ে করলে যে সাগরিকা তার ভালোবাসার মানুষটিকে কাছে পাবে তাই নয়,সেই সাথে সে পাবে মা-বাবার স্নেহও,যে স্নেহ থেকে সারাজীবন বঞ্চিত হয়েছে ও।সাগরিকাকে এতটা খুশি দেখে ঝুমকোও খুব খুশি,ওর দিদিভাইকে যে বড্ড ভালোবাসে ও।
অভ্রর পরিবারের সকলের চোখ এড়িয়ে নিজেদের বাড়িটা বিক্রির তোড়জোড় করছেন সূর্যদেববাবু।অন্যদিকে শহর-মফস্বল ছাড়িয়ে অনেক দূরে,উত্তরবঙ্গের এক অখ্যাত গ্রাম ধামুয়ায় এক ভাড়া বাড়ির ব্যবস্থা করেছেন তিনি।অভ্রর বিয়ের রাতে অভ্রর পরিবার যখন শহরে চলে যাবে মফস্বল ছেড়ে,তখনই চুপিসারে সূর্যদেববাবু আর চিন্ময়ী দেবী রওনা দেবেন ধামুয়ার পথে।
অন্যদিকে রবি আর সাগর যখন ধামুয়ায় আসবে,তখন সেই বাড়িতে ধুমধাম করে তাদের অনুষ্ঠান করে বিয়ে দেবেন ঠিক করেছেন,অনুষ্ঠানে সাগরিকার মামা-মামীমাকেও আসতে অনুরোধ করবেন তাঁরা,যদি তাঁরা আসতে না চান,ঝুমকো কথা দিয়েছে,যেমন করেই হোক ও আসবেই অনুষ্ঠানে।
0 মন্তব্যসমূহ