Advertisement

এনকাউন্টার (ষটত্রিংশ পর্ব)

এনকাউন্টার 
ষটত্রিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 



বন্ডে সাইন করিয়ে অভ্র আর অভিজিৎবাবু সাগরিকাকে ছাড়িয়ে নিয়ে চলে এলেন বাড়ি।ওঁরা ঠিক করলেন,সাগরিকা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার আগেই ওর সাথে অভ্রর বিয়েটা দেবেন অনুষ্ঠান করে,যাতে মিডিয়া জানে,সাগরিকার সাথে অভ্রর বিয়েটা হয়ে গেছে।সামনেই ভোট,নারীদের প্রতি তাঁর এহেন সম্মানীয় মানসিকতা তাঁকে ভোটে জিততে যথেষ্ট সহায়তা করবে,তা জানেন অভিজিৎ বাবু।
যেমন ভাবা তেমন কাজ।হসপিটাল থেকে ছাড়ার দু'দিনের মধ্যেই মিডিয়া-আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব সকলকে আমন্ত্রণ করে ধুমধাম করে অভিজিৎবাবু আনুষ্ঠানিক বিয়ে দিলেন অভ্র-সাগরিকার।সাগরিকা যেহেতু চোখে ঝাপসা দেখছে এখনও,তাই রবিকে বিয়ে করছে ভেবে সে মালাবদল,সিঁদুরদান,সাতপাক কোনো নিয়মপালনেই আপত্তি জানাল না।সাগরিকা যেহেতু খুব দুর্বল ছিল,হাঁটার ক্ষমতাটুকু ছিল না তার,তাই অভ্র তাকে কোলে তুলেই সাতপাক ঘুরল সকলের সামনে,মিডিয়া সম্পূর্ণ বিয়েটাই কভার করল।সাগরিকাকে কোলে তুলে অভ্রর সাতপাকে ঘোরার ছবি-ভিডিও তুমুল ভাইরাল হল সোশ্যাল মিডিয়ায়,অভ্রর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হল সকলে।উঠতি থেকে শুরু করে নামীদামী লেখক-লেখিকারাও সোশ্যাল মিডিয়ায় অভ্রর গুণকীর্তন করে লেখালেখি করলেন বিস্তর,হ্যাসটাগ রিয়েল লাভ,হ্যাসটাগ প্রকৃত ভালোবাসা ট্রেন্ডিং ওয়ানে চলে গেল সোশ্যাল মিডিয়াগুলোয়।সেই সাথে ছুটল শিবপ্রসাদবাবুর তুমুল প্রশংসার ফোয়ারা।
কেটে গেল বেশ কিছুদিন।সাগরিকা এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি,একটা ঘোরের মধ্যে থাকে এখনও,আর খুব আস্তে আস্তে হাঁটতে পারে ধরে ধরে।অভ্রর মা বাবাকেই সাগরিকা রবির মা-বাবা ভাবে।

— 'হ্যাঁ রে অভ্র',চিন্তিত মুখে অভ্রর মা বলেন,'সাগরিকা যখন সুস্থ হয়ে উঠবে,আর দেখবে রবি নয়,তোর সাথে ওর বিয়ে হয়েছে,তখন কি হবে?'

— 'কি আবার হবে মা!' অভ্র বলল,'আমি ওকে ঘরের এক কোণে ফেলে রাখব বন্দি করে,কারণ ছেড়ে দিলেই তো ও মিডিয়ার কাছে গিয়ে সব ফাঁস করে দেবে,তারপর আমায় গরাদের পেছনে ঢুকিয়ে দেবে!'

— 'যা বলেছিস অভ্র,ওই মেয়েকে কিছুতেই রাস্তায় ছাড়া যাবে না,ও ই সবচেয়ে বড়ো এভিডেন্স সেই রাতের ঘটনার।' অভিজিৎবাবু বললেন।

কেটে গেল বেশ কিছুদিন।সাগরিকা ঘুমোচ্ছিল,আর অভ্র ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।বিয়ের পর থেকে অভ্রই ওকে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়,মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়,ওষুধও খাইয়ে দেয়।এসব করতে ভীষণ বিরক্ত লাগে অভ্রর,ফালতু ন্যাকামি ছাড়া আর কিছুই মনে হয়না ওর,তবুও রবির অভিনয়টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনিচ্ছাসত্ত্বেও এসব করে।
সেদিন যখন সাগরিকা ঘুমোচ্ছিল,আর অভ্র ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল,হঠাৎ সাগরিকার ঘুম ভেঙে গেল আচমকা,আর ঘুম ভেঙেই ও ভীষণ অবাক হয়ে বলল,'একি!অভ্র তুমি!তুমি কেন?রবি কোথায়?'
সাগরিকা আচমকা সবটা স্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়ায় অভ্র ভীষণ হকচকিয়ে গেল,তারপর ক্রূর হেসে বলল,'তোর রবি ওপরে চলে গেছে!'

— 'মানে?'

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________

— 'মানে তোর রবি মরে ভূত হয়ে গেছে,আর কোনোদিনই সে তোর কাছে আসবে না,বুঝলি?'

— 'আমি বিশ্বাস করি না,আমার রবির এত বড়ো ক্ষতি কোনোদিন হতে পারে!নিশ্চয়ই তুমিই রবিকে কোথাও লুকিয়ে রেখেছ,না?'

— 'আমি তোর রবিকে কোথাও লুকিয়ে রাখিনি,যে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেছে,তাকে আবার কি লুকিয়ে রাখব?' বলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল অভ্র,বলল,'চল সাগর,তোকে একটা জিনিস দেখাই।'

অভ্র সাগরিকাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে এল,তারপর ওকে সোফায় বসতে বলে টিভিটা চালাল,তারপর টিভিতে রবির এনকাউন্টারের ভিডিওটা চালাল।

সাগরিকা ভিডিওটা দেখেই চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়ল।এরপর অভ্র বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলের ভিডিও,শিবপ্রসাদবাবুর বয়ান,খবরের কাগজের হেডলাইন সবগুলো দেখিয়ে সাগরিকাকে বিশ্বাস করিয়েই ছাড়ল যে রবি সত্যিই মারা গেছে এনকাউন্টারে।

সবটা শুনে সাগরিকা পাথরের মতো চুপ করে পড়ে থাকে মেঝেতে।ওর চোখে এতটুকু জল নেই,মুখেও কোনো কথা নেই।ওই অবস্থাতেই অভ্র টানতে টানতে ওকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল,সাগরিকা কোনো আপত্তি করল না,যেন একটা জড়বস্তু হয়ে গেছে ও।

প্রায় দু'তিন ঘন্টা পর অভ্ররা দরজা খুলতে গিয়ে দরজার বাইরে থেকে শোনে,সাগরিকা হাসছে,আর কথা বলছে যেন কার সাথে।দরজাটা খুলেই ওরা দেখে,সাগরিকা হাওয়ার সাথেই কথা বলছে,বারবার রবি রবি বলছে আর হাসছে ভীষণ।

— 'মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে বুঝলি অভ্র!' অভিজিৎবাবু বললেন,'রবি মারা যাওয়ার শোকটা ও নিতে পারেনি,তাই পাগল হয়ে গেছে।'

— 'হুম তাই তো দেখছি,মেয়েটা তো বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে!' তনিমাদেবী বললেন।

_________________________

Subscribe my YouTube channel : Suchandra's Gaming

_________________________

— 'তাহলে তো ভালোই হল!' অভ্র হাসল,'আরও একটা শত্রু এবার হটে যাবে রাস্তা থেকে!'

— 'মানে?কি করবি তুই অভ্র?'

— 'মা,দাঁড়াও ক'টা দিন ওকে দেখি,তারপর রাস্তায় ছেড়ে দেব,পাগলের মতো এরাস্তা সে রাস্তা ঘুরবে,তারপর হয় না খেতে পেয়ে মরবে,নয়তো অ্যাক্সিডেন্টে মরবে,আর ও তো মেয়েমানুষ,রাস্তার শেয়াল-কুকুররা ছিঁড়েও খেয়ে নিতে পারে!' বলেই বাঁকা হাসি হাসল অভ্র।

যেমন ভাবা তেমন কাজ।বেশ কয়েকদিন খেয়াল করে অভ্র দেখল,সাগরিকা সত্যিই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে,খাবার-জল ঠিক করে খেতে পারছে না,ছড়িয়ে ফেলছে সব,আর যখন তখন হেসে উঠছে আর হাওয়ার সাথে কথা বলছে।

অভ্র ভাবল, মোক্ষম সময় এসেছে, আর সেই মতো একদিন অভ্ররা ওকে গাড়িতে করে শহর থেকে অনেকটা দূরে এক নির্জন খোলা মাঠে নিয়ে গিয়ে সেখানেই রেখে চলে এল, যাতে কেউ ওকে খুঁজে না পায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ