এনকাউন্টার
চত্বারিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
ঘরটা লোডশেডিং-এর দরুন অন্ধকারে ঢেকে গিয়েছিল।অভ্র ঘরে ঢুকেই দেখে,ঝুমকো কোত্থাও নেই,তার জায়গায় বিছানায় বসে আছে সাগরিকা,পরনে তার নীল শাড়ি,একরাশ খোলা চুল,আর হাতে মোমবাতি।সাগরিকা অভ্রর দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসছে।
আর সহ্য করতে পারল না অভ্র।চিৎকার করার ক্ষমতাটুকুও চলে গিয়েছিল ওর,অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ও।
অভ্রর জ্ঞান ফিরল যখন,ও দেখল,ও বিছানায় শুয়ে আছে,মাথার কাছে বসে আছে ঝুমকো,আর অভ্রর মা-বাবা।কারেন্টও এসে গেছে ততক্ষণে।
— 'কি হয়েছিল তোর বাবা?হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলি কেন?'
— 'মা আসলে...'
— 'এই তুমি থামো তো,আমায় বলতে দাও', বলেই ঝুমকো বলে যেতে লাগল, 'একটু আগে লোডশেডিং হয়েছিল না আন্টি, তখন আমি মোমবাতিটা জ্বালিয়েছিলাম, আর আমায় দেখেই ও কেমন একটা করল, আর তারপরেই সেন্সলেস হয়ে গেল।'
— 'এ তুমি কি বলছ ঝুমকো?'
— 'নয়ত আর বলছি কি আন্টি! আমায় দেখে ও কিনা অজ্ঞান হয়ে গেল! ভাবুন তো!'
— 'না মা, আমি ঝুমকোকে দেখিনি বিশ্বাস করো, ঝুমকো সেই সময় ঘরে ছিল না!'
— 'মানেটা কি অভ্র? তোমাদের ফুলসজ্জা, এখানে ঝুমকো ছাড়া আর কে থাকবে?'
— 'বাবা আমি সাগরিকাকে দেখেছি। ও নীল শাড়ি পরে হাতে মোমবাতি নিয়ে এই বিছানাতেই বসে ছিল, আমি স্পষ্ট দেখেছি বাবা...'
— 'অভ্র শাট আপ! যাস্ট শাট আপ! এনাফ ইজ এনাফ!' গর্জে উঠলেন অভিজিৎবাবু, 'কাল থেকে এই পাগলামি শুরু হয়েছে তোমার, কাল বললে সাগরিকার ছবি দেখেছ, কি কানের দুল না কিসব ছাইপাশ পেয়েছ বাগানে, আজ আবার বলছ জলজ্যান্ত সাগরিকাকেই দেখেছ!'
— 'তুমি কি আজও সাগরিকাকে ভুলতে পারোনি?এতটাই মনে আছে ওকে যে হ্যালুসিনেট করছ?' শ্লেষের হেসে ঝুমকো বলল।
— 'তুমি কিছু মনে কোরোনা ঝুমকো মা, অভ্রর মাথাটাই মনে হয় খারাপ হয়ে গেছে পুরোপুরি, ভুল বকছে সমানে!' তনিমাদেবী রাগীস্বরে বললেন, 'অভ্র ব্যাস!অনেক হয়ে গেছে, এবার ক্ষান্ত দাও দয়া করে! মেয়েটা সবে বিয়ে হয়ে এসেছে বাড়িতে, ওর মাথাটা খেয়োনা এভাবে!'
— 'হ্যাঁ,আর যদি দ্বিতীয়বার দেখি তোমায় এধরণের কথা বলতে, টানতে টানতে মেন্টাল অ্যাসাইলামে ফেলে আসব বলে দিলাম, সেই দুবছর আগে সাগরিকাকে যেমন....'
— 'বাবা প্লিজ! তুমি আর ওই নামটা আমার সামনে বোলো না! আমি আর পারছি না!' অভ্র কাতরস্বরে বলল।
— 'আমরা কেউই ওই নাম মুখে নিতে চাইনা, সেজন্যই নতুন সংসার সাজিয়ে দিয়েছি তোমার। আজ দু'বছর হল ওই নামটা এ বাড়ি থেকে হারিয়ে গেছে, তুমিই আবার নামটা বিস্মৃতির অতল থেকে টেনে আনছ!'
— 'আর দ্বিতীয়বার ওই নাম মুখে নিলে আমি জানব, যে তুমি আজও ওই ঘুঁটেকুড়ুনি সাগরিকাকেই নিজের ওয়াইফ বলে মানো, আমায় না!' ঝুমকো কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে লাগল, 'বারবার শুধু তাকে দেখছ সব জায়গায়!'
— 'এভাবে কষ্ট পেও না ঝুমকো মা', অভিজিৎবাবু বললেন, 'নেক্সট টাইম অভ্র ওই নাম যদি মুখে আনে আবার, আমি কড়া ব্যবস্থা নেব, তোমায় কথা দিলাম মা।'
অভিজিৎবাবুরা চলে গেলেন।
ঝুমকো ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে বলল, 'কি আনরোম্যান্টিক তুমি মাইরি! ফুলসজ্জার রাতে বর সেন্সলেস হয়ে গেল! ধুর রাতটাই মাটি করে দিলে তুমি!'
— 'কিচ্ছু মাটি হয়নি ম্যাডাম,এই যে এখন আমি পুরোপুরি সুস্থ।'
সেই রাতটা নির্বিঘ্নেই কাটল। কিন্তু প্রতিদিনই রাতে কিছু না কিছু আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে লাগল। এক একদিন রাতে অভ্র নুপুরের শব্দ শুনতে পেত, তারপর আলো জ্বালালেই দেখত কেউ নেই। এক একদিন রাতে দুই নারী-পুরুষের হাসির শব্দ, নীচুস্বরে কথা বলার শব্দ শুনতে পেত, এই শব্দ অভ্রর চেনা, এই গলা হল রবি-সাগরিকার। তারপর তাড়াতাড়ি ঝুমকোকে ডাকত, কিন্তু ঝুমকো কিছুই শুনতে পেত না, 'ডিসগাস্টিং!' বলে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ত। কোনো কোনোদিন ওর নাকে একটা তীব্র পারফিউমের গন্ধ আসত, এই পারফিউমের গন্ধও ওর চেনা, সাগরিকা ব্যবহার করত এই পারফিউম। কখনো কখনো পিস্তল থেকে গুলি বের হওয়ার তীব্র শব্দ আসত অভ্রর কানে, কিন্তু আলো জ্বাললেই সব শব্দ বন্ধ হয়ে যেত।
সব মিলিয়ে একটা ভীষণ ভয়ের সঞ্চার হয়েছিল অভ্রর মনে। দিবারাত্রি সর্বক্ষণ একটা ভয় কাজ করত ওর মনে, এই বুঝি আবার কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে ওকে। সেই সাথে ভীষণ অসহায়ও বোধ করে অভ্র, কারণ মা-বাবা থেকে শুরু করে ঝুমকো কেউ ওর কোনো কথা বিশ্বাস তো করেই না, উলটে বিরক্ত হয়, তাই অভ্র কাউকে কিচ্ছু বলতে পারে না। আর বন্ধুমহলে তো এসব কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না, ওরাও বিশ্বাস করবে না, বরং হাসাহাসি করবে সবটা জানার পর।
সবদিক দিয়ে যখন অভ্র মুষড়ে পড়েছে, তখন হঠাৎই একদিন স্নান করে ঘরে ঢুকে দেখে, বিছানায় একটা ভূতের গল্পের বই রাখা আছে। অভ্র বেশ ভয় পেয়ে গেল বইটা দেখে, তাই তাড়াতাড়ি বইটা বিছানা থেকে সরিয়ে রাখতে গেল যেই, অমনি বইয়ের ভেতর থেকে একটা কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল। কাগজে লাল কালিতে লেখা আছে, 'যখন সত্যি কথা চিৎকার করে বললেও কেউ বিশ্বাস করে না, উলটে তোমায় নিয়েই হাসে,তখন কেমন লাগে বুঝতে পারছ তো?'
লেখাটা দেখেই চমকে উঠল অভ্র, এই হাতের লেখা ওর খুব চেনা। এই হাতের লেখা রবির। কিন্তু ও ভাবল এই লেখাটা ও সবাইকে দেখাবে, তাহলে সবাই বিশ্বাস করলেও করতে পারে, ভেবেই অভ্র তাড়াতাড়ি কাগজটা বুকপকেটে ভরে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে চলল।
0 মন্তব্যসমূহ