একবিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'এইবার বল সাগর,যে মজার কথাটা বলছিলি।'
— 'হ্যাঁ,এদিকে অভ্র তো আমার কথামতো ওদের ফোনে হুমকি দিল,ওরা যথেষ্ট আশঙ্কিতও হল,কিন্তু এত্ত ধূর্ত আর লোভী ওরা যে কি বলব!মাথায় মৃত্যুভয় নিয়েও টাকা নিতেই হবে ওদের।অভ্র যেদিন ওদের হুমকি দিল,তার পরের দিনই ওদের টাকাটা আনতে যাওয়ার কথা ওই বটতলায়,তাই ওরা অভ্রকে রিকোয়েস্ট করল,আগামীকালটা যেন ওদের সময় দেওয়া হয়,আগামী পরশুই ওরা শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবে।অভ্র তাতে রাজি হল।এদিকে আমি একটু চাপে ছিলাম,যে টাকার বাক্স হাতে ফেক ভিডিও তো দেখিয়েছি ওদের,কিন্তু সত্যি পঞ্চাশ লাখ টাকা কোথা থেকে জোগাড় করব!পঞ্চাশ হাজার টাকাটা তবু আমার মা বাবা আমার জন্য অ্যাকাউন্টে যে টাকা রেখে গিয়েছিলেন সেখান থেকে পেয়েছি,কিন্তু পঞ্চাশ লাখ টাকা জোগাড় করা তো ইমপসিবল!তখনই একটা দারুণ বুদ্ধি এল!'
— 'কি বুদ্ধি?'
— 'পরের দিন কলেজ থেকে ফিরেই ছুটলাম অভ্রর ফ্ল্যাটে,ওইদিনই সন্ধ্যেবেলায় মেনকাদের টাকা নিতে আসার কথা বটতলায়।অভ্রর ফ্ল্যাটে গিয়েই এমন রাগারাগি শুরু করলাম যে অভ্র হকচকিয়ে গেল,বলল,'রিকা কি হয়েছে?এত রেগে আছো কেন বেবি?' আমি বললাম,'আর বোলোনা অভ্র,আমি যখন কলেজ থেকে ফিরছিলাম,গেটে দেখি লাবণ্যদি দাঁড়িয়ে আছে,আর কার সাথে একটা ফোনে কথা বলছে টাকা নিয়ে!ওই যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওরা রবির সম্পর্কে অত ভালো ভালো কথা বলল!যাস্ট ভাবো অভ্র!' অভ্র অবাক হয়ে বলল,'লাবণ্য?কিন্তু ওদের যে কলেজে আসতে বারণ করেছি আজ,আর আজ কিন্তু লাবণ্য আসেনি সত্যিই,আমি দেখলাম তো!'
— 'তুমি ভুল জানো অভ্র ডিয়ার,লাবণ্যদি আজ কোনো ক্লাস করেনি,কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাসে এসেছিল,সম্ভবত যে বা যারা ওদের টাকা দিতে চাইছে তাদের কথা শুনেই!' যদিও লাবণ্যদি সেদিন কলেজ সত্যিই যায়নি,আমি বানিয়ে বললাম সবটা।দেখলাম ওষুধ ধরেছে।
অভ্র রেগে আগুন হয়ে গেল,বলল,'বিশ্বাসঘাতকগুলো হয়ত কোথায় গিয়ে উঠবে সেটা ডিসাইড করার জন্য টাইম চেয়েছে ভাবলাম,এখন দেখি টাকা নেওয়ার জন্য!আবার এতবার হুমকি দেওয়ার পরও কলেজেও এসেছে এত বড়ো সাহস!'
— 'হ্যাঁ বেবি,কি আর বলি বলো,এত লোভ ওদের যে মরার ভয়কে পর্যন্ত গ্রাহ্য করে না!'
— 'বেশ,আমার নামও অভ্র শিকদার!আমার নুন খেয়ে আমার সাথেই বেইমানি!ওদের আমি খতম করে ফেলব!' বলেই অভ্র কাদের যেন ফোন করল,আমার সামনে কথা বলেনি অবশ্য,বাইরে গিয়ে কথা বলল।সেই সুযোগে আমি সেই আননোন নাম্বারটা থেকে মেনকাদের মেসেজ করলাম,'বললাম,আজ সন্ধ্যে ঠিক সাতটায় আপনারা বটতলায় আসুন,পাঁচজনে একসাথে আসবেন অবশ্যই,এসে দেখবেন গাছের নীচে পাঁচটা সাদা কাগজের খাম রাখা আছে,প্রত্যেকটা খামে দশ লাখ টাকা রাখা আছে।তবে সাবধান,খামগুলো খবরদার রাস্তায় খুলবেন না,বাড়ি এসে খুলবেন,রাস্তায় যা চোর-ছ্যাঁচোর ঘুরে বেড়ায়,বলা তো যায় না,কেউ হ্যাঁচকা টানে হাত থেকে কেড়ে নিতে পারে!' মেসেজটা করার একটু পরেই অভ্র ফিরে এল ঘরে,এসেই আমার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,বলল,'রিকা বেবি,একটু মনে করার চেষ্টা করো তো,লাবণ্যকে যখন তুমি কলেজের গেটে কথা বলতে শুনলে,তখন ও কোথায় বা কবে যাবে টাকাটা আনতে,কিছু শুনেছ?' আমি যেন ভীষণভাবে কিছু মনে করার চেষ্টা করছি এরকম ভাব করে বললাম,'হ্যাঁ হ্যাঁ,মনে পড়েছে,লাবণ্যদি বলছিল,আজ সন্ধ্যে সাতটায় যাবে ওরা টাকা আনতে,' তারপর যে ঠিকানায় আসতে বলেছি ওদের,সেই ঠিকানাটার কথা উল্লেখ করে বটতলার কথাটাও বললাম অভ্রকে।অভ্র তো শুনেই জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি,বলল,'আজ এমন ভয় দেখাব ওদের,যে এই জন্মে আর এই শহরে মুখ দেখাবে না কোনোদিন ওরা!নেহাত তুই বারণ করেছিস সেজন্য রিকা,নইলে আজ ওদের খালাস করে দিতাম!'
তখন বিকেল পাঁচটা বাজে।ঝুমকো আমার কথামতো সাদা খামগুলো বটতলায় রেখে এল।'
— 'সে কি রে সাগর?পঞ্চাশ লাখ টাকা জোগাড় করলি কিভাবে?'
— 'আহা শোনোই না তারপর,ওখানেই তো আসল মজা!ওদিকে তো লাবণ্য-মেনকাদের এত টাকার লোভ,পৌনে সাতটা বাজতে না বাজতেই ওখানে হাজির,তারপর প্রত্যেকে একটা করে খাম নিয়ে নিজেদের ব্যাগে ভরে যেই চম্পট দিতে গেল,অমনি কালো পোশাক পরিহিত কিছু গুন্ডা হাজির,ওরা অভ্রদের পরিবারের পোষা গুন্ডা আর কি,প্রত্যেকের হাতে পিস্তল।ওরা গিয়েই পাঁচজনের মাথায় পিস্তল ঠেকাল,বলল,'আর যদি এই চত্বরে কোনোদিন দেখি,খুলি ফুটো করে দেব!যা,দূর হ!' ওরা পড়ি কি মরি করে পালিয়ে গেল স্টেশনে,তারপর সেখান থেকে দূরের কোনো ট্রেন ধরে ওরা পালিয়ে গেল দূরের কোনো শহরে!আর আমি ততক্ষণে তো যে আননোন নাম্বার থেকে ওদের ফোন-মেসেজ করেছিলাম সেই সিমকার্ডটা ফোন থেকে বের করে পুড়িয়ে দিলাম!'
— 'উরিব্বাস,এ তো একদম কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা রে!অভ্রকে দিয়ে কত সুন্দরভাবে সবটা করিয়ে নিলি উফ!'
— 'হ্যাঁ গো রবি,একদমই তাই।তবে এখনো গল্পটা শেষ হয়নি বুঝলে!মেনকা-লাবণ্যদের আরও এক দফা চমকানো বাকি এখনো!'
— 'তাই?শুনি শুনি?'
— 'মোটেও না,ঘুগনি আর ঝালমুড়ি খেয়ে আমার খুব ঝাল লেগেছে,আগে আইসক্রিম খাওয়াও,তারপর বাকি গল্প!'
— 'আচ্ছা বাবা আনছি,না আনলে তো থ্রিলার মুভির বাকি গল্পটা শোনা বাকি থেকে যাবে!'
— 'এই তো লক্ষ্মীছেলের মতো কথা,এখন যাও,আইসক্রিম নিয়ে এসো!'
— 'বউয়ের সামনে সব ছেলেই লক্ষ্মীছেলে হয়ে যায়,এটাই তো জগতের সারসত্য!' রবি নীচু গলায় বিড়বিড় করল।
— 'এই কি বিড়বিড় করছ তুমি হ্যাঁ?নিয়ে এস আইসক্রিমটা!'
— 'এই যে যাই!এক্ষুণি যাই!'
0 মন্তব্যসমূহ