Advertisement

এনকাউন্টার (ষষ্ঠ পর্ব)

এনকাউন্টার 
ষষ্ঠ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


দেখতে দেখতে কেটে গেল একবছর।হেনা আর রাণীর কোনো খোঁজ রবি পায়নি।তবে কলেজ ডিপার্টমেন্ট ভীষণ খুশি,কারণ প্রথম বর্ষের ফাইনাল এক্সামে রবি ইউনিভার্সিটিতে প্রথম হয়েছে।অভ্র এসে জড়িয়ে ধরে কংগ্র‍্যাচুলেট করেছিল রবিকে ফলপ্রকাশের দিন,বলেছিল, 'আমি আজ বড্ড খুশি রে!যারা তোকে টোন করে,তাদের মুখে একদম ঝামা ঘষে দিয়েছিস তুই,এভাবেই আরও এগিয়ে যা তুই জীবনে।'
 এরপর কলেজে এল রবির জুনিয়ররা।প্রথম বর্ষের একজন মেয়েকে বড্ড মনে ধরল রবির।মেয়েটার চোখের নীল মণি,মাথায় লালচে কালো কোঁকড়ানো চুল,আর একমুখ উজ্জ্বল হাসি।প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়েছিল রবি,যাকে বলে লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট।খোঁজ নিয়ে রবি জেনেছিল,মেয়েটার নাম সাগরিকা।রবি মনে মনে তাকে সাগর বলে ডাকে,আর ভাবে,সত্যিই সার্থক ওর নাম,সাগরের মতোই গভীর নীল দুটো চোখ,আর অনন্ত মায়াময় হাসি।মাঝে মাঝেই রবির স্বপ্নে সে ধরা দেয়,আর ঘুম ভাঙার পরেই রবি লজ্জায় লাল হয়ে যায়।মাঝে মাঝে রবির কাছে পড়াও বুঝতে আসে সাগরিকা।রবি একটু যেন লজ্জা পায় ওর সাথে কথা বলতে,চোখে চোখ রেখে বেশিক্ষণ কথাই বলতে পারেনা,কারণ মেয়েটার চোখে কি যে মায়া আছে,বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই কেমন খেই হারিয়ে ফেলে রবি।আর ওর গলাটাও বড্ড মিষ্টি,পাগল করা।মেয়েটা রবির কাছে পড়া বুঝে চলে যাওয়ার পর রবি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে,মেয়েটার চলে যাওয়া দেখে মন্ত্রমুগ্ধের মতো।মনে হয়,মেয়েটা বুঝি হিপনোটাইজ করেছে ওকে।

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________

   কথাটা কাউকে জানায়নি রবি,অভ্রকেও না।এমনিতেই তাকে নিয়ে ক্লাসে কম হাসিঠাট্টা হয়না,সুযোগ খোঁজা হয় যে কিভাবে রবিকে অপদস্থ করা হবে,তাই ভালোবাসাকে শুধু নিজের মনে রেখেছিল রবি সযত্নে,ভেবেছিল কখনো সাহস যুগিয়ে উঠলে সাগরকে জানাবে তার মনের কথা একান্তে।
    এরপর চলে এল ফ্রেসার্সের দিন,নবীনবরণ করা হবে জুনিয়রদের।রবি ভেবেছিল সাধারণ সাজগোজ করেই সে যাবে,যেভাবে ও প্রতিদিন কলেজ যায়,কিন্তু অভ্র তাতে ঘোরতর আপত্তি জানাল,বলল, 'অন্যদিন তুই সাদামাটা হয়ে কলেজ যাস,আমি কিচ্ছু বলি না,কিন্তু আজ তা হবে না,আজ তোকে আমি ড্রেস চয়েস করে দেব,সেটাই তোকে পরতে হবে,কোনো না শুনব না আমি!'
   রবি প্রথমে আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত অভ্রর একটা পোশাক পরল ও,অভ্রর পছন্দে।এমনকি রবির হেয়ারস্টাইলটাও অভ্রই করে দিল।

— 'এইবার দেখ তো নিজেকে আয়নায়!কোনো মেয়ে আজ আর চোখই ফেরাতে পারবে না তোর দিক থেকে!'

_________________________

Subscribe my YouTube channel : Suchandra's Gaming

_________________________


— 'ধুস কি যে বলিস!' মনে মনে রবি ভাবল, 'আজ সাগর কিভাবে আসবে কে জানে!' ভেবেই ওর মনটা এক অজানা খুশিতে ভরে উঠল।
 ক্লাসে রবি আর অভ্র আজ যখন একসাথে ঢুকছিল,সবাই বেশ চমকে গেল রবিকে নতুন সাজে দেখে,যদিও মুখে কেউ কিছু বলল না,অভ্রকে দেখে প্রায় সব ছেলেই বলল, 'ওয়াও ব্রো,ইউ আর লুকিং সো হ্যান্ডসাম!আজ তো সব মেয়ে শুধু তোকেই দেখবে বস!'
 অভ্র শুধু হালকাভাবে 'থ্যাংকস' বলে এগিয়ে গেল সামনের দিকে।ও আর রবি গিয়ে পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসল,সামনেই স্টেজ।এখানেই হবে নবীনবরণের অনুষ্ঠান।
হঠাৎই একজন এসে অভ্রকে ডাকল,অভ্র রবিকে, 'তুই একটু বোস,আমি এক মিনিট আসছি' বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে কোথায় যেন চলে গেল।
  কিন্তু দশ পনেরো মিনিট হয়ে গেল,অভ্রর আর দেখা নেই।রবি ভাবল,একটু এগিয়ে দেখে আসবে সে যে অভ্র কোথায় গেল।এই ভেবে যেই রবি উঠতে যাবে,হঠাৎই সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মন্ত্রমুগ্ধের মতো,নড়াচড়ার ক্ষমতা যেন ওর নেই।রবির চোখ দুটো আটকে আছে একজোড়া নীল গভীর চোখে,যার মালকিনকে মনের অন্দরে রবি সাগর বলে ডাকে।সাগরিকা আসছে এদিকেই,সেই সাথে সব জুনিয়ররা,যাদের জন্য আজ এত আয়োজন।সাগরিকা আজ নীল শাড়ি পরেছে,সেই সাথে খোঁপা করা চুলে নীল গোলাপ,যদিও গোলাপটা নকল,আর সেই সাথে চোখে কাজল,কানে নীল পাথর বসানো দুল।রবি বারবার চেষ্টা করছে প্রিয়তমার দিক থেকে চোখটা ফেরাতে,তার মন বারবার বলছে এভাবে হলভর্তি ছাত্রছাত্রীর সামনে একদৃষ্টে একজন মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকাটা দৃষ্টিকটু,কিন্তু রবির চোখ তাতে সায় দিচ্ছে না।তার চোখ চাইছে মনের মানুষটির অপরিসীম সৌন্দর্য পান করতে।হঠাৎই এক মৃদু কন্ঠের ডাকে সম্বিৎ ফেরে রবির।সাগরিকা রবির সামনে গিয়ে দাঁড়াল,আর বলল, 'ইউ আর লুকিং সো হ্যান্ডসাম রবিদা!'
  রবি একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে উত্তর দিল, 'তোকেও রে সাগর,ইয়ে মানে সাগরিকা!'
  রবি বড্ড লজ্জা পেল নিজের আচরণে।ছি ছি,সাগরিকাকে মনের কথা জানানোর আগেই তাকে সাগর বলে ডাকছে!
 
— 'থ্যাংক ইউ সো মাচ রবিদা!' বলেই সাগরিকা চলে যাচ্ছিল,রবি বলল, 'সাগরিকা শোন্!'
 
— 'বলো রবিদা।'
 
— 'চুলে খোঁপা করে তোকে যথেষ্ট সুন্দর লাগছে,তবে চুলটা খুললে তোকে আরও সুন্দর দেখাবে।'
 
— 'বলছ?আমিও তাই ভেবেছিলাম,কিন্তু আসার সময় মামীমা বলল,শাড়ির সাথে নাকি খোঁপাটাই চলে,বলে একরকম জোর করেই খোঁপা বেঁধে দিল!তবে তুমি যখন বলছ,খুলছি চুলটা!' বলেই খোঁপার কাঁটাটা খুলে দিল সে,আর একরাশ চুলটা ছড়িয়ে পড়ল পিঠের ওপর।
 
— 'অসাধারণ লাগছে সাগর!' মুগ্ধ বিস্মিত রবির মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কথাটা।

 — 'থ্যাংকস এগেইন!' বলেই একরাশ হাসি ছড়িয়ে চলে গেল সাগরিকা।
 রবির মুগ্ধতা তখনও কাটেনি,সে একদৃষ্টে দেখছে সাগরিকার চলে যাওয়া।হঠাৎই একটা কাশির শব্দে রবি পিছন ফিরে দেখে,প্রীতম দাঁড়িয়ে আছে।
  প্রীতম বলল, 'কাক হয়ে পালক গুঁজেছিস বলেই নিজেকে ময়ূর ভাবছিস নাকি যে ময়ূরীর পিছন পিছন ঘুরছিস!'
  
— 'মানে?কি বলতে চাইছিস তুই প্রীতম?'
  
— 'আমি সবটাই নোটিস করেছি আজ,তুই কিভাবে হাঁ করে সাগরিকার দিকে তাকিয়েছিলি হ্যাংলার মতো,আবার রোমিও সেজে বলতে গেছিস যে চুল খুলে নাকি তাকে বেশি সুন্দর লাগে!হুঃ! নিজেকে আয়নায় দেখেছিস?তোর মতো গেঁয়ো বনমানুষকে ওর মতো সুন্দরীর পাশে মানায়?আর ওর মামা শহরের অন্যতম নামী ধনী ব্যবসায়ী,মিনিমাম হাতখরচটাও দিতে পারবি ওকে মাসের শেষে?ডিসগাস্টিং!' বলেই কোথায় যেন চলে গেল প্রীতম।
   প্রীতমসহ ক্লাসের অনেকেই রবিকে যখন তখন নানা অছিলায় অপমান করে,কিন্তু রবি সেসব গায়ে মাখে না তেমন,কিন্তু আজ অপমানটা রবির মনে গিয়ে লাগল।অজান্তেই চোখের কোণ ভিজে গেল ওর।ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ও এগিয়ে গেল হলের দরজাটার কাছে,আজকের এই অনুষ্ঠানে থাকবে না ও।ওর বারবার মনে হচ্ছিল,সাগরিকাকে ভালোবাসাটা অনেকটা বামন হয়ে চাঁদে হাত দেওয়ার মতোই স্বপ্ন দেখা,যা কোনোদিনও সত্যি হবে না।
   কিন্তু দরজাটার কাছাকাছি আসতেই অভ্রর সাথে দেখা হয়ে গেল ওর।অভ্র হলের ভেতর আসছিল,রবিকে দেখেই বলল, 'কি রে কোথায় যাচ্ছিস তুই?চল চল,ভেতরে চল্!' বলেই রবির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ও হলের ভেতরে,বলল, 'আজ তোর জন্য একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে রবি,যাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!'
  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ