Advertisement

এনকাউন্টার (অষ্টাদশ পর্ব)

এনকাউন্টার 
অষ্টাদশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 



— 'এসব কি বলছিস রে তুই সাগর?ওঁরা এরকম ব্যবহার করেন তোর সাথে?'

— 'হ্যাঁ রবিদা,উঠতে বসতে আমার পড়ার খরচ,খাওয়ার খরচ নিয়ে কথা শোনায়।মাঝে মাঝে আমি আর পারিনা জানো রবিদা,দম বন্ধ হয়ে আসে আমার।তারপর মা-বাবার ছবিটা দেখি,আস্তে আস্তে মন শান্ত হয়।'

— 'সাগর আমি ভেবেছিলাম হয়ত তোর মামা-মামীমা তোকে...'

— 'হ্যাঁ রবিদা,শুধু তুমি কেন,আমার প্রত্যেক বন্ধুবান্ধবও ভাবে আমার মামা-মামীমা বুঝি আমার মা-বাবারই মতো আমায় ভালোবাসে।আসলে পরিবারের ভেতরের কেচ্ছা আর বাইরের মানুষদের সামনে আনতে চাইনা গো,সবাই মুখেই সিমপ্যাথি দেখাবে,আড়ালে সবাই রসালো গল্পের টপিক পেয়ে যাবে।আমার এই দুঃখের কথাটা শুধু অভ্রর কাছেই প্রকাশ করেছিলাম,কিন্তু এখন দেখছি অনেক বড়ো ভুল করে ফেলেছি আমি।ও আমার ওই উইক পয়েন্টটাকেই কাজে লাগাতে চায়,অবশ্য ওর মতো জানোয়ারের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কি আশা করা যায়?'

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________

— 'সাগর! এত কষ্ট বুকে চেপে ঘুরে বেড়াস তুই হাসিমুখে?' রবির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।

— 'রবিদা,কেঁদোনা।'

রবি চোখের জলটা মুছে ফেলে প্রশ্ন করে,'কিন্তু অভ্র তোর দুর্বল পয়েন্টকে কাজে লাগাতে চায় বলছিলি...'

— 'হ্যাঁ রবিদা,আমি ওকে মামারবাড়ির সকলের আচরণ খুলে বলার পর ও আমায় বলেছিল,আমার ফার্স্ট ইয়ারের ফাইনাল এক্সামটা হওয়ার পরেই ও আমায় ওর ঘরের লক্ষ্মী করে নিয়ে যাবে,তারপর ও ই আমার পড়াশোনা,আমার কেরিয়ারের দায়িত্ব নেবে।জানো রবিদা,সেদিন আমি এত বোকা ছিলাম,ওর কথাগুলো বিশ্বাস করে জড়িয়ে ধরেছিলাম ওকে,ভেবেছিলাম,একজন আছে এই দুনিয়ায়,যে আমাকে সত্যি ভালোবাসে!'

— 'সাগর নিজেকে বোকা বলিস না রে,কাউকে ভালোবাসা বোকামি নয়।তবে হ্যাঁ আমরা দুজনেই মানুষ চিনতে ভুল করেছি,তুই অভ্রকে ভালোবেসেছিস প্রেমিক হিসেবে,আর আমি বন্ধু হিসেবে,আর দুজনেই ঠকেছি।'

— 'হ্যাঁ,প্রথম সম্পর্কে আমি ঠকেছি ঠিকই,কিন্তু দ্বিতীয় সম্পর্কে ঠকব না,সে আমি জানি।আর তুমিও ঠকবে না আর।'

— 'মানে?কি বলতে চাইছিস তুই সাগর?'

— 'রবিদা প্লিজ!আর নিজের ফিলিংস লুকিয়ো না।রবিদা,মনে আছে,সেদিন তোমার ফার্স্ট ইয়ারের একটা খাতা আমায় দিয়েছিলে তুমি?আর সেই খাতার ভিতরে রাখা চিঠিটা আমি পেয়েছিলাম রবিদা,যেটা আমায় উদ্দেশ্য করে তুমি লিখেছিলে,কিন্তু দিয়ে উঠতে পারোনি আমায়।আমি অভ্রর মুখে শুনেছিলাম কিছুটা,যে তুমি পছন্দ করো আমায় মনে মনে,প্রীতমদা নাকি ওকে বলেছিল একথা।আর সিওর হলাম চিঠিটা হাতে পাওয়ার পর।একসময় তোমায় কত ছোট ভেবেছি আমি রবিদা,ভেবেছি তুমি আমাকে চাও বলেই অভ্রর নামে মিথ্যে রটাতে এসেছ আমার কাছে,যাতে আমি ওর থেকে দূরে সরে যাই!নিজের প্রতি নিজেরই লজ্জা হয় গো রবিদা।' সাগরিকাই ড্রাইভ করছিল গাড়িটা,সাইড করে দাঁড় করিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল ও,দুহাতে মুখ ঢাকল নিজের।রবি ওকে বুকে টেনে নিল,বলল,'আই লাভ ইউ সাগর!'

_________________________

Subscribe my YouTube channel : Suchandra's Gaming

_________________________

সাগরিকাও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রবিকে,বলল,'আই লাভ ইউ টু।'তারপর কিছুক্ষণ থেমে সাগরিকা বলল,'আই অ্যাম সরি রবিদা,আমায় ক্ষমা করো তুমি!'
রবি সাগরিকার চোখের জল মুছিয়ে বলল,'দূর পাগলি,ক্ষমা কিসের?তোর জায়গায় আমি থাকলেও যে সেম বিহেভ করতাম রে!'

সাগরিকার কান্না থামে,কিন্তু ও মাথা নিচু করে থাকে।রবি ওর মুখটা তুলে কপালে আলতো চুম্বন করে,তারপর নাকটা নেড়ে দিয়ে বলে,'ধুস পাগলি,প্রেমিককে কেউ দাদা বলে ডাকে?সবাই শুনলে যে হাসবে,বলবে,ছি ছি ছি,বউ যে বরকে দাদা বলে ডাকে গো!'

— 'রবিদা!' সাগরিকা লাজুক মুখে রবির বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
 
বেশ কিছুক্ষণ এইভাবেই কেটে গেল।তারপর সাগরিকা বলল,'কিন্তু রবিদা,তোমার ওপর যে অন্যায়টা হল,বিনাদোষে তোমায় কলেজে ঢুকতে দেওয়া হল না,তার তো একটা প্রতিকার হওয়া দরকার!'

— 'শুধু আমার উপর হওয়া অন্যায়ই না,তোর উপরও যে অন্যায়টা হতে চলেছে সেটাও বন্ধ হওয়া দরকার রে,'রবি উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,'তোর ফাইনাল পরীক্ষার আর মাত্র তিনমাস বাকি,পরীক্ষা শেষ হলেই অভ্রর সাথে তোর বিয়ে,কিন্তু এই বিয়েটা তো আমি হতে দেব না!হ্যাঁ রে সাগর,' সাগরিকার হাতদুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে রবি বলল,'তুই যদি আর একটিবার তোর মামা-মামীমাকে বুঝিয়ে বলিস সবটা,ওঁরা তাও এই বিয়েটা ভেঙে দেবেন না রে?দেখ না আর একবার যদি বোঝাতে পারিস ওঁদের....' 

— 'তোমার কি মনে হয় রবিদা,আমি বোঝাইনি ওদের?মামা মামীমা সবাইকে বুঝিয়েছি বারবার,কিন্তু ওদের যুক্তি হল যে এসব আমি বানিয়ে বলছি,কারণ আমি নাকি বিয়ে করতে চাই না সেইজন্য এসব অজুহাত দিচ্ছি!এদিকে অভ্রও এমন একটা ভালোমানুষের মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায় ওদের সামনে যে ওরা অভ্রকেই বিশ্বাস করে অন্ধের মতো,আমার কথাকে পাত্তাই দেয়না!মামীমা তো কথায় কথায় বলে,'মা-বাপ মরা মেয়েকে কোন্ ছেলে বিয়ে করবে শুনি?সবসময় শুধু রূপ দিয়েই সব হয়না!' জানো রবিদা,আমার যখন তিনবছর বয়স,শুনেছি মা আর বাবা কোন্ একটা অনুষ্ঠান বাড়িতে যাচ্ছিল এক সন্ধ্যেবেলায় নিজেদের গাড়িতে,বাবা ড্রাইভ করছিল গাড়িটা।আমাকে মামার বাড়িতে রেখে গিয়েছিল।জানো রবিদা,এক মর্মান্তিক অ্যাক্সিডেন্ট হয় সেই রাতে,মা বাবা দুজনেই স্পট ডেড হয়!' এই পর্যন্ত বলার পর গলা বুজে আসে সাগরিকার,'জানো রবিদা,আমার মাঝেমাঝেই মনে হয়,কেন যে সেদিন আমাকে ওরা নিয়ে গেল না ওদের সাথে,তাহলে তো আর উঠতে বসতে মামা মামীমার কাছে এত কথা শুনতে হত না!' বলেই কেঁদে ফেলল সাগরিকা।রবি ওকে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ